জাতীয় আইনশিক্ষা ও বিচারব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে স্বামী বিবেকানন্দ বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয় আলোচনাচক্র
কলকাতা, ৩১ মে:
দেশের আইনশিক্ষা ও আইন পেশার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের রূপরেখা নির্ধারণ এবং বিচারব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কার নিয়ে স্বামী বিবেকানন্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব লিগ্যাল স্টাডিজের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হল এক জাতীয় আলোচনাচক্র।
'পলিসি ম্যাপিং ফর লং-টার্ম ডেভেলপমেন্ট অব লিগ্যাল এডুকেশন অ্যান্ড প্রফেশন ইন ইন্ডিয়া' শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে বিচারপতি, শিক্ষাবিদ, আইনজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকেরা অংশ নিয়ে দেশের আইনশিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
আলোচনাচক্রে প্রাতিষ্ঠানিক নীতিগত সংস্কার, বিচারব্যবস্থা ও আইন পেশায় নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎমুখী আইনশিক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়গুলি বিশেষ গুরুত্ব পায়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত বিচারপতি, জাতীয় আইন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং প্রবীণ আইন গবেষকেরা একাধিক অধিবেশনে অংশ নিয়ে আইন পেশার পরিবর্তনশীল বাস্তবতা ও প্রয়োজনীয় সংস্কার নিয়ে মতামত তুলে ধরেন।
স্বামী বিবেকানন্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক (ড.) সুব্রত কুমার দে বলেন, "ভারতের আইনশিক্ষার রূপান্তরকে কেন্দ্র করে অর্থবহ একাডেমিক ও নীতিগত আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড এবং সমাজের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইনশিক্ষা ব্যবস্থায় ধারাবাহিক সংস্কার অপরিহার্য। সেই উদ্দেশ্যেই দেশের বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের একত্রিত করা হয়েছে।"
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব লিগ্যাল স্টাডিজের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক (ড.) নির্মল কান্তি চক্রবর্তী বলেন, "প্রযুক্তি, বিশ্বায়ন এবং নতুন সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে আইন পেশার চরিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একটি প্রগতিশীল ও সমাজমুখী আইনব্যবস্থা গড়ে তুলতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির আরও সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করা প্রয়োজন।" তিনি আরও বলেন, "বর্তমান সময়ের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আইন শিক্ষাকে প্রচলিত বিষয়ভিত্তিক কাঠামোর গণ্ডির বাইরে নিয়ে যেতে হবে। পাঠ্যক্রমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা আইন, তথ্য সুরক্ষা, গোপনীয়তা, এআই নিয়ন্ত্রণ ও শাসনব্যবস্থা-সংক্রান্ত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা সময়ের দাবি।"
কলকাতা হাই কোর্টের বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষ তাঁর বক্তব্যে বলেন, "গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে আরও শক্তিশালী করা এবং বিচারপ্রাপ্তির সুযোগ সম্প্রসারণের জন্য আইনশিক্ষার সংস্কার নিয়ে আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০২০ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিক্ষা কেবল তথ্য আহরণের বিষয় নয়; সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা, সৃজনশীলতা, নৈতিক মূল্যবোধ এবং বহুমাত্রিক জ্ঞানচর্চার বিকাশই শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য। আইনশিক্ষার ক্ষেত্রেও এই দৃষ্টিভঙ্গি সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। আজকের আইন শিক্ষার্থীদের শুধু বিদ্যমান আইন জানলেই চলবে না, ভবিষ্যতের সামাজিক ও প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জের মুখে আইন কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, সে সম্পর্কেও সুস্পষ্ট ধারণা গড়ে তুলতে হবে।"
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশিষ্ট অতিথিদের মধ্যে ছিলেন কলকাতা হাই কোর্টের বিচারপতি সুগত মজুমদার, পশ্চিমবঙ্গ মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ও বিচারিক সদস্য বিচারপতি মধুমতী মিত্র, কলকাতা হাই কোর্টের বিচারপতি অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায়, ন্যাশনাল ল ইউনিভার্সিটি, যোধপুরের উপাচার্য অধ্যাপক হরপ্রীত কৌর এবং ন্যাশনাল ল ইউনিভার্সিটি অ্যান্ড জুডিশিয়াল অ্যাকাডেমি, অসম-এর উপাচার্য অধ্যাপক (ড.) কে. পি. এস. শর্মা। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন আইন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও গবেষকেরা আলোচনায় অংশ নেন।
আলোচনাচক্রের বিভিন্ন অধিবেশনে নারীদের আইনশিক্ষা ও বিচারব্যবস্থায় প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, ভবিষ্যৎ আইনব্যবস্থার নীতিগত সংস্কার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক আইনি কাঠামো গড়ে তোলার কৌশল নিয়ে বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
উল্লেখ্য, স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে প্রতিষ্ঠিত স্বামী বিবেকানন্দ বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে পূর্ব ভারতের অন্যতম দ্রুত বিকাশমান বহুমুখী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। প্রকৌশল, ব্যবস্থাপনা, আইন, মানববিদ্যা, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান ও গবেষণাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পাঠক্রম পরিচালনার পাশাপাশি উদ্ভাবন, শিক্ষার উৎকর্ষ এবং শিল্পমুখী দক্ষতা উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব লিগ্যাল স্টাডিজ সমসাময়িক আইন ও সাংবিধানিক বিষয়ক গবেষণা, শিক্ষা এবং নীতিনির্ধারণী আলোচনাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে চলেছে।

