পশ্চিমবঙ্গ একসময় শুধু সাংস্কৃতিক নয়, শিক্ষাগত দিক থেকেও ভারতের অন্যতম অগ্রণী রাজ্য ছিল। Kolkata-কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল এমন এক জ্ঞানচর্চার পরিবেশ, যার প্রভাব দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও পড়েছিল। University of Calcutta, Presidency University এবং Jadavpur University-এর মতো প্রতিষ্ঠান শুধু ডিগ্রি প্রদান করত না-তারা চিন্তাবিদ, গবেষক ও নেতৃত্ব তৈরি করত।
কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে এক তীব্র বৈপরীত্য তৈরি করেছে। শিক্ষা ব্যবস্থার ভিতরে জমে থাকা অসংখ্য সমস্যার কারণে আজ সাধারণ মানুষ, ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক ও শিক্ষক-সবাই এক নতুন সূচনার অপেক্ষায়। নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা তাই আর কেবল প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষ চাইছে বাস্তব, কার্যকর এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন।
শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা অনেকাংশে নষ্ট হয়েছে নিয়োগ দুর্নীতি, পরীক্ষার অনিয়ম এবং প্রশাসনিক অস্বচ্ছতার কারণে। বহু প্রতিভাবান প্রার্থী বছরের পর বছর ধরে চাকরির অপেক্ষায় থেকেও হতাশ হয়েছেন। ফলে নতুন সরকারের কাছে প্রথম এবং সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হল-ব্যবস্থার প্রতি বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা।
এর জন্য প্রয়োজন একটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া, যেখানে মেধা ও যোগ্যতাই হবে একমাত্র মানদণ্ড। পরীক্ষার সময়সূচি, ফল প্রকাশ এবং নিয়োগের প্রতিটি ধাপ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা অত্যন্ত জরুরি। কারণ শিক্ষা যদি ক্ষমতার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তাহলে তার মূল উদ্দেশ্য-মানুষ গড়ে তোলা-বিপন্ন হয়ে পড়ে।
বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম বড় সমস্যা হল মুখস্থনির্ভরতা। পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়াই যেখানে প্রধান লক্ষ্য, সেখানে জ্ঞান অর্জনের প্রকৃত উদ্দেশ্য অনেক সময়ই হারিয়ে যায়।
নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা, পাঠ্যক্রমকে এমনভাবে পুনর্গঠন করা হোক যাতে শিক্ষার্থীরা শুধু তথ্য মুখস্থ না করে, বরং বিষয়কে বুঝতে শেখে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (STEM)-এর পাশাপাশি মানবিক বিষয়গুলিকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে এমন একটি ভারসাম্য তৈরি করতে হবে, যা শিক্ষার্থীদের সার্বিক বিকাশে সাহায্য করবে।
বিশ্ব দ্রুত বদলাচ্ছে-কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সায়েন্স, পরিবেশবিদ্যা-এই নতুন ক্ষেত্রগুলিকে শিক্ষার মূল স্রোতে আনতে না পারলে ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের সঙ্গে শিক্ষার যোগসূত্র ভেঙে পড়বে।
একটি শক্তিশালী শিক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্রে থাকেন শিক্ষক। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, শিক্ষক নিয়োগে বিলম্ব, প্রশিক্ষণের অভাব এবং কর্মক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা শিক্ষকদের মনোবল কমিয়ে দেয়।
মানুষ আশা করে, নতুন সরকার শিক্ষকদের জন্য একটি সুসংগঠিত প্রশিক্ষণ কাঠামো তৈরি করবে। নিয়মিত কর্মশালা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নয়ন এবং আধুনিক শিক্ষণ পদ্ধতির সঙ্গে পরিচয় করানো জরুরি। একই সঙ্গে শিক্ষকদের জন্য সম্মানজনক বেতন ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
যখন শিক্ষক আত্মবিশ্বাসী ও দক্ষ হন, তখন তার প্রভাব সরাসরি শিক্ষার্থীদের উপর পড়ে-এটি কোনো তত্ত্ব নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা।
আজকের যুগে প্রযুক্তি শিক্ষা ব্যবস্থার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বহু গ্রামীণ এলাকায় এখনও ইন্টারনেট সংযোগ, স্মার্ট ডিভাইস এবং ডিজিটাল পরিকাঠামোর অভাব রয়েছে।
নতুন সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা, এই ডিজিটাল বিভাজন দ্রুত দূর করা হোক। প্রতিটি স্কুলে ইন্টারনেট সংযোগ, স্মার্ট ক্লাসরুম এবং শিক্ষার্থীদের জন্য সুলভ ডিভাইস নিশ্চিত করতে হবে। শুধু শহরকেন্দ্রিক উন্নয়ন হলে চলবে না-গ্রামের ছাত্রছাত্রীরাও সমান সুযোগ পাবে, সেটাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
অনেক সরকারি স্কুলে এখনও পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, বিজ্ঞান ল্যাব বা লাইব্রেরির অভাব রয়েছে। কোথাও পানীয় জলের সমস্যা, কোথাও আবার স্বাস্থ্যসম্মত শৌচালয়ের অভাব-এই বাস্তবতা শিক্ষার মানকে সরাসরি প্রভাবিত করে।
মানুষ আশা করে, নতুন সরকার শিক্ষা পরিকাঠামোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে। আধুনিক ল্যাবরেটরি, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ-এসব কোনো বিলাসিতা নয়, বরং শিক্ষার মৌলিক প্রয়োজন।
পশ্চিমবঙ্গের উচ্চশিক্ষা একসময় দেশের সেরা ছিল। কিন্তু আজ সেই অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। গবেষণায় বিনিয়োগ কমে যাওয়া, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অভাব এবং শিল্পক্ষেত্রের সঙ্গে সংযোগের ঘাটতি-এই সব কারণে উচ্চশিক্ষা পিছিয়ে পড়ছে।
মানুষের প্রত্যাশা, নতুন সরকার গবেষণাকে নতুন করে গুরুত্ব দেবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে পর্যাপ্ত তহবিল, আধুনিক গবেষণা সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক স্তরের সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। শিল্পক্ষেত্রের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক জোরদার হলে শিক্ষার্থীরা বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাবে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি যদি রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্র হয়ে ওঠে, তাহলে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হয়। অনেক শিক্ষার্থীই আজ নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ ক্যাম্পাসের দাবি করছে, যেখানে তারা নির্ভয়ে পড়াশোনা করতে পারে।
নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা, ক্যাম্পাসকে এমন একটি জায়গা হিসেবে গড়ে তোলা হোক যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু তা যেন শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত না করে।
আজকের সমাজে মানুষ শুধু ঘোষণায় সন্তুষ্ট নয়-তারা ফলাফল দেখতে চায়। তাই শিক্ষা ব্যবস্থায় নিয়মিত মূল্যায়ন, ডেটা-ভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং স্বচ্ছ রিপোর্টিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্কুল ও কলেজগুলির পারফরম্যান্স প্রকাশ করা, শিক্ষার্থীদের শেখার অগ্রগতি নিরীক্ষণ করা এবং স্বাধীন সংস্থার মাধ্যমে মূল্যায়ন করা-এসবের মাধ্যমে একটি জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
নতুন সরকারের সামনে একটি বড় সুযোগ রয়েছে-পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন করে গড়ে তোলার। কিন্তু এই সুযোগ যদি কাজে লাগানো না হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তার মূল্য চুকাবে।
শিক্ষা শুধু একটি খাত নয়-এটি একটি সমাজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। তাই আজ যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তার প্রভাব পড়বে আগামী কয়েক দশক ধরে।
পশ্চিমবঙ্গ আবারও শিক্ষার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে পারে-যদি সঠিক নীতি, দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন একসঙ্গে কাজ করে।
"আজ যদি আমরা শিক্ষা ঠিক করি, আগামীকাল নিজেই ঠিক হয়ে যাবে।"
© IBG NEWS

