IBG NEWS বিশ্লেষণ ডেস্ক
একটা সময় ছিল, যখন কলকাতার ধোঁয়াভরা আকাশ, কারখানার সাইরেন আর নদীর ধারে জাহাজের ভিড়-এই সবই ছিল পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির পরিচয়। হাওড়া ব্রিজের নিচ দিয়ে পণ্যবাহী নৌকা যেত, বন্দরে সারি সারি কনটেইনার উঠত-নামত, আর শহরের আশেপাশে শিল্পাঞ্চলগুলো ছিল কর্মচঞ্চল।
সেই সময় রাজ্যের রাজস্বের গল্পও ছিল অন্যরকম।
সরকারের আয় আসত কারখানা, উৎপাদন আর বাণিজ্য থেকে।
কিন্তু আজ, ৫০ বছর পরে, সেই গল্প বদলে গেছে।
সংখ্যা বেড়েছে, রাজস্ব বেড়েছে-কিন্তু প্রশ্ন হলো:
এই বৃদ্ধি কি সত্যিই শক্তির প্রতীক, নাকি শুধু সংখ্যার খেলা?
ধরা যাক, ১৯৯০ সালে একটি পরিবারের মাসিক আয় ছিল ₹১,০০০। আজ তা বেড়ে ₹৫০,০০০ হয়েছে। শুনতে অসাধারণ লাগছে।
কিন্তু যদি দেখা যায়-
তাহলে কি পরিবারটি সত্যিই ৫০ গুণ উন্নত হয়েছে?
ঠিক একই প্রশ্ন পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
গত কয়েক দশকে রাজ্যের রাজস্ব ৬০-৭০ গুণ বেড়েছে।
কিন্তু সেই সময়ে দামও বেড়েছে ১০-১২ গুণ।
অর্থাৎ বাস্তবে বৃদ্ধি অনেক কম-মাত্র ৫-৬ গুণ।
👉 তাই বলা যায়,
সংখ্যা বড় হয়েছে, কিন্তু সেই সংখ্যার শক্তি ততটা বাড়েনি।
এক সময় পশ্চিমবঙ্গ ছিল ভারতের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি। দেশের মোট অর্থনীতির প্রায় ১০% ছিল এই রাজ্যের অংশ।
আজ তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫-৬%।
এটা হঠাৎ করে হয়নি। ধীরে ধীরে, বছরের পর বছর ধরে, অন্য রাজ্যগুলো এগিয়ে গেছে-আর পশ্চিমবঙ্গ সেই গতিতে এগোতে পারেনি।
মহারাষ্ট্র শিল্পে এগিয়েছে,
তামিলনাড়ু উৎপাদনে শক্তিশালী হয়েছে,
কর্ণাটক আইটি-র রাজধানী হয়ে উঠেছে।
আর পশ্চিমবঙ্গ?
সে এগিয়েছে, কিন্তু ধীরে-এবং অনেক ক্ষেত্রেই দেরিতে।
পুরনো দিনের পশ্চিমবঙ্গ ছিল শিল্পের উপর নির্ভরশীল।
এসব থেকেই আসত রাজস্ব।
আজ সেই জায়গায় এসেছে:
এখন রাজস্বের বড় অংশ আসে:
এই পরিবর্তনটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ:
👉 ফলে রাজস্বের ভিত্তি দুর্বল হয়েছে।
ধরা যাক, দুটি দোকান আছে।
একটি দোকান ₹১০০ বিক্রি করে ₹১০ লাভ করছে।
অন্যটি ₹১০০ বিক্রি করে ₹৭ লাভ করছে।
দুটি দোকানই কাজ করছে, কিন্তু একটির দক্ষতা বেশি।
পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা।
রাজ্যের অর্থনীতি যত বড়, তার তুলনায় সরকার কম কর তুলছে।
এই ছোট পার্থক্যই বড় সমস্যা তৈরি করছে।
আজকের পশ্চিমবঙ্গের আর্থিক অবস্থাকে যদি একটি পরিবারের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে চিত্রটা এমন:
সরকারের ক্ষেত্রেও:
এই সব খরচ মেটানোর পর উন্নয়নের জন্য খুব কম টাকা থাকে।
ফলে:
এই পরিস্থিতি একটি চক্র তৈরি করেছে:
কম শিল্প → কম রাজস্ব
কম রাজস্ব → কম বিনিয়োগ
কম বিনিয়োগ → কম বৃদ্ধি
কম বৃদ্ধি → আবার কম রাজস্ব
এই চক্র ভাঙা খুব কঠিন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন:
যদি পশ্চিমবঙ্গ আরও দক্ষ হতো, তাহলে কী হতে পারত?
উত্তর:
প্রতি বছর ₹৩০,০০০-₹৪০,০০০ কোটি বেশি আয় সম্ভব ছিল।
ভাবুন-
এই টাকা দিয়ে:
সবই সম্ভব ছিল।
GST চালুর পরে রাজ্যের কর ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এসেছে।
আগে রাজ্য নিজেই অনেক সিদ্ধান্ত নিতে পারত।
এখন অনেক কিছু নির্ভর করে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার উপর।
ফলে:
যে সরকারই আসুক, তাকে এই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে।
এটা সহজ সমীকরণ নয়।
পশ্চিমবঙ্গের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন:
রাজ্য কি আবার তার অর্থনৈতিক শক্তি ফিরে পেতে পারবে?
উত্তর নির্ভর করবে:
এই ৫০ বছরের গল্প আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়:
শুধু বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়-সেই বৃদ্ধির মান ও শক্তি গুরুত্বপূর্ণ।
পশ্চিমবঙ্গ বেড়েছে, কিন্তু সেই বৃদ্ধি পুরোপুরি শক্তিশালী হয়ে ওঠেনি।
একটি রাজ্যের গল্প,
যেখানে সংখ্যা বড় হয়েছে-
কিন্তু সেই সংখ্যার ভিত এখনও মজবুত হওয়া বাকি।
(© IBG NEWS | অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ)

