By Suman Munshi, Editor Desk
পশ্চিমবঙ্গ একসময় ভারতের চিকিৎসা ব্যবস্থার একটি শক্তিশালী কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। Kolkata-কে ঘিরে গড়ে ওঠা সরকারি হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজগুলি শুধু রাজ্যের মানুষের জন্য নয়, গোটা পূর্ব ভারতের রোগীদের জন্যও নির্ভরতার প্রতীক ছিল। Calcutta Medical College, NRS Medical College এবং SSKM Hospital-এই প্রতিষ্ঠানগুলির ইতিহাসে রয়েছে চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা এবং সেবার দীর্ঘ ঐতিহ্য।
কিন্তু বর্তমান সময়ে সেই ধারাবাহিকতা স্পষ্টভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে। চিকিৎসা পরিষেবার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, রোগীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতালগুলি, এবং সাধারণ মানুষের আস্থা ধীরে ধীরে কমছে। এই পরিস্থিতি কোনো একদিনে তৈরি হয়নি; এটি বহু বছরের নীতিগত ঘাটতি, বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা এবং ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার সম্মিলিত ফল।
চিকিৎসা ব্যবস্থার সমস্যাগুলি শুধু পরিকাঠামোগত নয়, বরং একটি বৃহত্তর সিস্টেমিক সংকটের অংশ। প্রথমত, মানবসম্পদের ঘাটতি এই সংকটের অন্যতম বড় কারণ। সরকারি হাসপাতালগুলিতে চিকিৎসক, নার্স এবং টেকনিশিয়ানের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম হওয়ায় প্রতিটি কর্মীর উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ-এই সব মিলিয়ে চিকিৎসকদের মধ্যে ক্লান্তি ও হতাশা বাড়ছে, যা পরিষেবার মানে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
দ্বিতীয়ত, পরিকাঠামোর সঙ্গে রোগীর চাহিদার সামঞ্জস্য নেই। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, রোগের ধরনে পরিবর্তন এবং স্বাস্থ্য সচেতনতার বৃদ্ধির ফলে হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুযায়ী বেড, আইসিইউ, ডায়াগনস্টিক সুবিধা বাড়েনি। ফলে জেলা হাসপাতালগুলি থেকে রোগীরা বাধ্য হয়ে কলকাতামুখী হন, এবং তৃতীয় স্তরের হাসপাতালগুলির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়।
তৃতীয়ত, প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা একটি বড় বাধা। আধুনিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় ডেটা-নির্ভর সিদ্ধান্ত, কার্যকর রেফারাল সিস্টেম এবং দক্ষ সম্পদ ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই ক্ষেত্রগুলিতে এখনও যথেষ্ট উন্নতি হয়নি, ফলে বিদ্যমান সম্পদ থেকেও সর্বোচ্চ ফল পাওয়া যাচ্ছে না।
গত ৫০ বছরে স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বরাদ্দ ধীরে ধীরে বেড়েছে-এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু এই বৃদ্ধিকে যদি মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করে দেখা হয়, তাহলে চিত্রটি ভিন্ন হয়ে ওঠে।
১৯৭০ থেকে ১৯৯০-এর দশকে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ সীমিত ছিল, কিন্তু তখন রোগীর চাপ তুলনামূলক কম থাকায় সিস্টেম কোনোভাবে নিজেকে ধরে রাখতে পেরেছিল। ১৯৯০-এর পর অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্য পরিষেবার চাহিদা দ্রুত বাড়ে, কিন্তু বিনিয়োগ সেই হারে বাড়েনি। ফলে বাস্তবে পরিষেবার মান স্থবির হয়ে পড়ে।
সাম্প্রতিক দশকে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলেও মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব সেই বৃদ্ধির একটি বড় অংশকে নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছে। অর্থাৎ, কাগজে বাজেট বাড়লেও সেই অর্থের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ততটা বাড়েনি। এর ফলে আধুনিক যন্ত্রপাতি, ওষুধ, পরিকাঠামো উন্নয়ন-সব ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধতা থেকে গেছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্যয়ের কাঠামো। বাজেটের বড় অংশই চলে যায় বেতন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং দৈনন্দিন খরচে (revenue expenditure)। পরিকাঠামো উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত বিনিয়োগের জন্য (capital expenditure) তুলনামূলকভাবে কম অর্থ বরাদ্দ হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টি করে।
Below is a simplified, analytical table showing how health budget allocation has evolved over ~50 years and what those values look like when adjusted to year 2000 prices (constant value).
⚠️ Note: These are model-based estimates (trend-aligned, inflation-adjusted using average CPI ranges), meant for policy understanding, not audited budget figures.
👉 ফলে বাস্তবে per capita health investment খুব বেশি বাড়েনি
✔️ বাজেট বৃদ্ধি ≠ বাস্তব উন্নতি
✔️ inflation বড় অংশ "খেয়ে ফেলেছে"
✔️ capital investment যথেষ্ট নয়
✔️ demand supply gap বেড়েছে
নতুন সরকারের জন্য এই টেবিল থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা:
বরং দরকার:
এই ৫০ বছরের ডেটা একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়-
স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সংকট হঠাৎ তৈরি হয়নি, এটি ধীরে ধীরে জমে ওঠা বাস্তব বিনিয়োগের ঘাটতির ফল।
"সংখ্যা নয়, প্রকৃত বিনিয়োগই স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে।"
চিকিৎসা পরিষেবার ক্ষেত্রে শহর ও গ্রামের মধ্যে বৈষম্য এখনও স্পষ্ট। কলকাতার বড় হাসপাতালগুলিতে তুলনামূলক উন্নত পরিষেবা থাকলেও গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং পর্যাপ্ত ওষুধের অভাব রয়েছে। ফলে ছোটখাটো সমস্যাও বড় আকার ধারণ করে এবং রোগীদের শহরে আসতে বাধ্য করে।
এই কেন্দ্রীকরণ শুধু রোগীর কষ্ট বাড়ায় না, বরং পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি করে।
উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রেও সমস্যা রয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠান এখনও মান ধরে রাখলেও সামগ্রিকভাবে ফ্যাকাল্টি ঘাটতি, গবেষণায় কম বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অভাব দেখা যাচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতের চিকিৎসকরা পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও গবেষণার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
বর্তমান পরিস্থিতি পরিবর্তন করা অসম্ভব নয়, তবে এর জন্য প্রয়োজন সুপরিকল্পিত এবং ধারাবাহিক উদ্যোগ।
প্রথমত, স্বাস্থ্যখাতে বাস্তব (inflation-adjusted) বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শুধুমাত্র বাজেট বাড়ালেই হবে না, সেই অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, মানবসম্পদ উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। দ্রুত ও স্বচ্ছ নিয়োগ, গ্রামীণ এলাকায় চিকিৎসকদের জন্য প্রণোদনা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
তৃতীয়ত, জেলা ভিত্তিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। প্রতিটি জেলায় উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা থাকলে কলকাতার ওপর চাপ কমবে এবং রোগীরাও দ্রুত পরিষেবা পাবেন।
চতুর্থত, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। টেলিমেডিসিন, ইলেকট্রনিক হেলথ রেকর্ড এবং রিয়েল-টাইম ডেটা মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিষেবার মান ও দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব।
পঞ্চমত, চিকিৎসা শিক্ষা ও গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যাতে ভবিষ্যতের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হয়।
পশ্চিমবঙ্গের চিকিৎসা ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা একটি সংকটের ইঙ্গিত দিলেও এটি একই সঙ্গে একটি বড় সুযোগও। সঠিক নীতি, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে এই ব্যবস্থাকে আবারও দেশের অন্যতম সেরা ব্যবস্থায় পরিণত করা সম্ভব।
স্বাস্থ্য শুধুমাত্র একটি পরিষেবা নয়-এটি একটি সমাজের সামগ্রিক উন্নয়নের ভিত্তি। তাই আজ নেওয়া সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ।
পশ্চিমবঙ্গ আবারও চিকিৎসা ক্ষেত্রে তার হারানো গৌরব ফিরে পেতে পারে-যদি নতুন সরকার সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং তা বাস্তবে রূপ দিতে সক্ষম হয়।
"সুস্থ সমাজই উন্নত রাষ্ট্রের ভিত্তি।"
© IBG NEWS

