বিয়ের পর কি একজন মহিলার জন্মগত জাতি বদলে যায়? বিশেষ করে তিনি যদি নিজের জাতির বাইরে অন্য সম্প্রদায়ের কাউকে বিয়ে করেন, তা হলে কি তাঁর SC/ST পরিচয় আর বজায় থাকে না? এই প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করল এলাহাবাদ হাই কোর্ট। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, বিয়ের কারণে কোনও ব্যক্তির জাতি বদলে যায় না।
একটি ফৌজদারি মামলার শুনানিতে বিচারপতি অনিল কুমার-X-এর বেঞ্চ অভিযুক্তদের সেই দাবি খারিজ করে দিয়েছে, যেখানে বলা হয়েছিল, SC/ST সম্প্রদায়ের এক মহিলা জাট সম্প্রদায়ের এক পুরুষকে বিয়ে করার পরে আর নিজের জন্মগত জাতির পরিচয় দাবি করতে পারেন না। আদালত সেই যুক্তিকে আইনগত ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
- বিজ্ঞাপন -
ঠিক কী বলেছে হাই কোর্ট?
আদালতের বক্তব্য, একজন ব্যক্তি ধর্ম পরিবর্তন করলেও তাঁর জাতি জন্মগতভাবে যে পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত, তা শুধু ধর্ম পরিবর্তনের কারণে বদলে যায় না। একই যুক্তিতে বিয়ের কারণেও জাতি পরিবর্তিত হয় না।
আদালতের ভাষায়, 'বিয়ে কোনও ব্যক্তির জাতি পরিবর্তন করে না।' এই যুক্তিতে অভিযোগকারিণী জাট সম্প্রদায়ের একজনকে বিয়ে করেছেন বলেই তাঁর জন্মগত SC/ST পরিচয় নষ্ট হয়ে গিয়েছে—অভিযুক্তদের এই দাবি আদালত মানেনি।
কোন মামলায় এই পর্যবেক্ষণ?
আলিগড়ের SC/ST আইনের বিশেষ আদালতে চলা একটি মামলাকে কেন্দ্র করে এই আপিল দায়ের হয়েছিল। ডিনেশ-সহ মোট ন'জন অভিযুক্ত ২০২২ সালের ২৭ জুলাইয়ের সমন জারির নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে হাই কোর্টে যান।
তাঁদের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩২৩, ৫০৬, ৪৫২ এবং ৩৫৪ ধারা এবং SC/ST আইনের ৩(১)(R) ধারায় বিচার চলার জন্য সমন জারি করা হয়েছিল। অভিযুক্তরা সেই নির্দেশ বাতিলের আবেদন জানান।
বিজ্ঞাপন
কেন মামলা হয়েছিল?
অভিযোগকারিণীর দাবি ছিল, একটি বিবাদের সময় তাঁকে মারধর ও গালিগালাজ করা হয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে জাতিগত কটূক্তিও করা হয়েছিল। ঘটনায় অভিযোগকারিণী-সহ তিনজন আহত হন বলেও আদালতে জানানো হয়েছিল।
অন্যদিকে অভিযুক্তদের দাবি ছিল, অভিযোগটি আসলে তাঁদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক মামলা। কারণ, এর আগে তাঁরাই অভিযোগকারিণী ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে একটি FIR দায়ের করেছিলেন।
আগে FIR থাকলে কি পরের অভিযোগ খারিজ হয়ে যাবে?
অভিযুক্তদের এই যুক্তিও আদালত গ্রহণ করেনি।
আদালত জানিয়েছে, একই ঘটনার ক্ষেত্রে দুই পক্ষের আলাদা অভিযোগ বা 'ক্রস-কেস' থাকা অস্বাভাবিক নয়। শুধু একটি পক্ষ আগে FIR করেছে বলেই অপর পক্ষের অভিযোগকে মিথ্যা বা অগ্রহণযোগ্য ধরে নেওয়া যায় না।
হাই কোর্টের মতে, কোনও ঘটনার ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বী বা বিপরীত বয়ানের মামলা থাকাই অভিযোগ খারিজ করার কারণ হতে পারে না। বিশেষ আদালত অভিযোগকারিণী ও তাঁর সাক্ষীদের বক্তব্য এবং আঘাতের রিপোর্ট বিবেচনা করেই অভিযুক্তদের সমন করেছিল। তাই সেই সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই বলে জানায় হাই কোর্ট।
জাতি নিয়ে অভিযুক্তদের যুক্তি কী ছিল?
অভিযুক্তদের বক্তব্য ছিল, অভিযোগকারিণী জন্মসূত্রে SC/ST সম্প্রদায়ের হলেও পরে জাট সম্প্রদায়ের এক পুরুষকে বিয়ে করেন। ফলে তাঁদের দাবি, বিয়ের পর তিনি আর নিজের আগের জাতির পরিচয় দাবি করতে পারেন না।
এই যুক্তির ভিত্তিতে অভিযুক্তরা দাবি করেন, তাঁর অভিযোগের ক্ষেত্রে SC/ST আইনের ধারা প্রয়োগ করা যায় না।
কিন্তু হাই কোর্ট সরাসরি এই যুক্তি খারিজ করে দেয়।
আদালতের পর্যবেক্ষণের গুরুত্ব কোথায়?
এই মামলায় আদালত মূলত স্পষ্ট করেছে যে, শুধুমাত্র আন্তঃজাতি বিবাহের কারণে একজন ব্যক্তির জন্মগত জাতি বদলে যায় না।
অর্থাৎ, কোনও মহিলা নিজের সম্প্রদায়ের বাইরে অন্য জাতির পুরুষকে বিয়ে করলেই স্বামীর জাতি তাঁর জন্মগত জাতির জায়গা নেবে—এমন দাবি আদালত গ্রহণ করেনি। মামলার ক্ষেত্রে অভিযোগকারিণী বিয়ের পরে তাঁর জন্মগত জাতিগত পরিচয় হারিয়েছেন—অভিযুক্তদের এই বক্তব্যকে আদালত 'অসঙ্গত' বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
শেষ পর্যন্ত কী নির্দেশ দিল আদালত?
অভিযুক্তদের দুটি প্রধান যুক্তিই আদালত খারিজ করেছে—প্রথমত, আগের FIR থাকার কারণে পরের অভিযোগটি নিছক 'কাউন্টারব্লাস্ট' বা প্রতিশোধমূলক মামলা; দ্বিতীয়ত, জাট সম্প্রদায়ের পুরুষকে বিয়ে করার পরে অভিযোগকারিণী তাঁর SC/ST পরিচয় হারিয়েছেন।
দুই যুক্তিই গ্রহণ না করে এলাহাবাদ হাই কোর্ট অভিযুক্তদের ক্রিমিনাল আপিল খারিজ করে দিয়েছে। ফলে আলিগড়ের বিশেষ আদালতের সমন জারির নির্দেশ বহাল থাকল।
এক নজরে প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন: বিয়ের পর কি জাতি বদলে যায়?
উত্তর: এই মামলায় আলাহাবাদ হাই কোর্ট স্পষ্ট জানিয়েছে, শুধু বিয়ের কারণে কোনও ব্যক্তির জাতি বদলায় না।
প্রশ্ন: SC/ST সম্প্রদায়ের কোনও মহিলা অন্য জাতির পুরুষকে বিয়ে করলে কি তাঁর জন্মগত জাতি হারিয়ে যাবে?
উত্তর: আদালত এই মামলায় এমন দাবি খারিজ করেছে। জাট সম্প্রদায়ের পুরুষকে বিয়ে করলেও অভিযোগকারিণীর জন্মগত জাতি বদলায়নি বলে আদালত জানিয়েছে।
প্রশ্ন: আগে অন্য পক্ষ FIR করলে পরের অভিযোগ কি খারিজ হয়ে যায়?
উত্তর: না। হাই কোর্ট বলেছে, একই ঘটনায় দুই পক্ষের পৃথক মামলা বা বিপরীত বয়ান থাকাই অভিযোগ খারিজের কারণ নয়।
প্রশ্ন: অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোন আইনে মামলা চলছিল?
উত্তর: ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩২৩, ৫০৬, ৪৫২ ও ৩৫৪ ধারা এবং SC/ST আইনের ৩(১)(R) ধারায় তাঁদের সমন করা হয়েছিল।
প্রশ্ন: আদালত শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে?
উত্তর: অভিযুক্তদের ক্রিমিনাল আপিল খারিজ করে বিশেষ আদালতের সমন জারির নির্দেশ বহাল রাখা হয়েছে।
প্রশ্ন: আদালতের মূল বার্তা কী?
উত্তর: আন্তঃজাতি বিবাহের ফলে কোনও ব্যক্তির জন্মগত জাতিগত পরিচয় স্বয়ংক্রিয় ভাবে বদলে যায় না—এই মামলায় সেটিই স্পষ্ট করেছে এলাহাবাদ হাই কোর্ট।

