Dailyhunt Logo
  • Light mode
    Follow system
    Dark mode
    • Play Story
    • App Story
চিনা জে-১০সিই কিনছে বাংলাদেশ, ২৮ হাজার কোটির অস্ত্রচুক্তিতে ড্রাগনের ফাঁসে জড়িয়ে পড়ছে বাংলাদেশ?

চিনা জে-১০সিই কিনছে বাংলাদেশ, ২৮ হাজার কোটির অস্ত্রচুক্তিতে ড্রাগনের ফাঁসে জড়িয়ে পড়ছে বাংলাদেশ?

চিনের তৈরি অত্যাধুনিক জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার পথে আরও এক ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। সূত্রের খবর, বেজিংয়ের কাছ থেকে ২০টি মাল্টিরোল ফাইটার জেট কিনতে প্রায় ২৩০ কোটি ডলারের চুক্তি চূড়ান্ত করার চেষ্টা চলছে। এই বিপুল প্রতিরক্ষা ক্রয়ের মধ্যেই ভারতকে ঘিরে ঢাকার কৌশলগত অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিমানবাহিনীর আধুনিকীকরণের লক্ষ্যেই ২০টি জে-১০সিই কেনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত চুক্তির মূল্য প্রায় ২৩০ কোটি ডলার। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বাংলাদেশের অন্যতম বড় প্রতিরক্ষা ক্রয় হতে চলেছে এটি। বেজিং ও ঢাকার মধ্যে আলোচনা ইতিমধ্যেই চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে সূত্রের দাবি।

এই যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনার সঙ্গে ২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের প্রসঙ্গও জুড়ে রয়েছে। 'অপারেশন সিঁদুর'-এর পর পাকিস্তান জে-১০সিই-এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশংসা করেছিল। তার পরেই বাংলাদেশও এই যুদ্ধবিমান নিজেদের বিমানবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে আগ্রহ দেখায় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত চুক্তিতে শুধু যুদ্ধবিমানের দামই নয়, প্রশিক্ষণ, লজিস্টিক সহায়তা এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত পরিষেবার খরচও যুক্ত রয়েছে। জে-১০সিই-এর বেস প্রাইস প্রায় ৬.২৭ কোটি ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ২০টি বিমানের জন্য ঢাকার মোট খরচ ২৩০ কোটি ডলারের কাছাকাছি পৌঁছতে পারে।

বর্তমান বিনিময় হার বিবেচনায় ২০টি যুদ্ধবিমানের জন্য বাংলাদেশের মোট ব্যয় প্রায় ২৮,৩১৪ কোটি টাকা হতে পারে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহিদ উর রহমানও বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে আলোচনার জন্য আন্তঃমন্ত্রক কমিটি ইতিমধ্যেই খসড়া চুক্তি তৈরি করেছে।

জে-১০সি চিনের চতুর্থ-প্রজন্মের পরবর্তী উন্নত সংস্করণের এক ইঞ্জিন ও এক আসনের বহুমুখী যুদ্ধবিমান। চিনের পিপলস লিবারেশন আর্মি এয়ার ফোর্সে ২০১৮ সালে এই বিমান অন্তর্ভুক্ত হয়। এর নির্মাতা চেংডু এয়ারক্রাফট কর্পোরেশন। আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য তৈরি সংস্করণটির নাম জে-১০সিই এবং বর্তমানে পাকিস্তানই এই রফতানি সংস্করণের ব্যবহারকারী বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই যুদ্ধবিমান বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র বহনে সক্ষম। স্বল্পপাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি মাঝারি পাল্লার অস্ত্র, লেজার-নির্দেশিত বোমা এবং জাহাজ বা ট্যাঙ্ক লক্ষ্য করে ব্যবহারের উপযোগী অস্ত্রও বহন করতে পারে। নির্মাতা সংস্থার দাবি অনুযায়ী, সর্বোচ্চ প্রায় ৫,৬০০ কেজি অস্ত্র নিয়ে উড়তে সক্ষম জে-১০সি।

তবে বাংলাদেশে এই যুদ্ধবিমান কেনার আলোচনা যে বর্তমান সরকারের আমলেই প্রথম শুরু হয়েছে, এমনটা নয়। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০২৫ সালেই তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সময়ে এই প্রক্রিয়ার সূচনা হয়েছিল। ওই সময় যুদ্ধবিমানগুলির আনুমানিক ভিত্তিমূল্য ছিল প্রায় ৬ কোটি ডলার।

২০২৫ সালের মার্চে চিন সফরের সময় জে-১০সিই নিয়ে বেজিংয়ের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা করেছিলেন ইউনূস। পরে যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে ১১ সদস্যের একটি আন্তঃমন্ত্রক কমিটিও গঠন করা হয়। পরবর্তী সময়ে আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যায় বেজিং ও ঢাকা। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও সেই প্রক্রিয়া থামেনি।

ইউনূস-পরবর্তী সময়ে ২০টি যুদ্ধবিমান কেনার জন্য প্রায় ২২০ কোটি ডলারের প্রস্তাবে বাংলাদেশের অর্থ মন্ত্রকের নীতিগত অনুমোদন মিলেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে বিমানের দাম বেড়ে যাওয়ায় সম্ভাব্য চুক্তির মূল্য ২৩০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের চাহিদা ও অতিরিক্ত সরঞ্জামের উপর নির্ভর করে চূড়ান্ত অঙ্ক আরও বাড়তেও পারে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনের উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের মধ্যেই চিনের সঙ্গে জে-১০সিই চুক্তি করতে আগ্রহী ঢাকা। চুক্তি হলে চিনের রফতানি সংস্থা চায়না ন্যাশনাল অ্যারো-টেকনোলজি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট কর্পোরেশন বা ক্যাটিক যুদ্ধবিমান সরবরাহ করবে। ২০টি বিমানের দাম পরিশোধের জন্য বাংলাদেশকে ২০৩৫-৩৬ সাল পর্যন্ত সময় দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

জে-১০সিই বেছে নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বাংলাদেশের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহিদ উর রহমান ২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের প্রসঙ্গ টেনেছেন। তাঁর বক্তব্য, ওই সংঘাতে এই যুদ্ধবিমান ব্যবহার করেই পাকিস্তান ভারতীয় রাফালকে গুলি করে নামিয়েছিল। এই দাবিই জে-১০সিই নিয়ে ঢাকার আগ্রহের অন্যতম কারণ বলে তিনি ইঙ্গিত করেছেন।

তবে রাফাল ধ্বংসের পাকিস্তানি দাবিকে ভারতীয় বিমানবাহিনী খারিজ করেছে। ফরাসি সংস্থা দাসো অ্যাভিয়েশনের তৈরি রাফালও ৪.৫ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান। ২০১৬ সালে ভারত ফ্রান্সের কাছ থেকে ৩৬টি রাফাল কেনার চুক্তি করেছিল। পাকিস্তান 'অপারেশন সিঁদুর'-এর পর ভারতীয় রাফাল-সহ একাধিক যুদ্ধবিমান ধ্বংসের দাবি করলেও ভারত তা প্রত্যাখ্যান করে।

পরবর্তী সময়ে দাসো অ্যাভিয়েশনের সিইও এরিক ট্রাপিয়ারও দাবি করেন, 'অপারেশন সিঁদুর'-এ তাদের কোনও যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়নি। একই সময়ে ভারতীয় বিমানবাহিনীর তরফে রাফাল সংক্রান্ত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নতুন দরপত্র আহ্বান করা হয়, যেখানে ৩৬টি বিমানের উল্লেখ ছিল। অন্যদিকে, বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল এপি সিংহ জানিয়েছিলেন, সংঘর্ষে পাকিস্তানের পাঁচটি যুদ্ধবিমান এবং একটি অ্যাওয়াক্স বিমান ধ্বংস করা হয়েছিল।

এর পাশাপাশি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতির আরও কিছু পরিবর্তনও নজরে এসেছে। চলতি বছরের জুনে মালয়েশিয়া সফরের পর বেজিং সফর করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁর ভারত সফরের কথাও ছিল, যদিও সফরের তারিখ চূড়ান্ত না হওয়ায় বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর মধ্যেই ৭ অগস্ট সৌদি আরবের মক্কায় পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে 'মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট' স্বাক্ষরিত হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের কোনও একটির উপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে অন্য দুই দেশের উপর হামলা হিসেবেও বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে। যৌথ প্রতিরক্ষার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে এই চুক্তিতে।

এই চুক্তিকে পশ্চিমি সংবাদমাধ্যমের একাংশ 'ইসলামিক ন্যাটো' হিসেবে বর্ণনা করেছে। চুক্তির পর বাংলাদেশের দুই মন্ত্রী এতে ঢাকার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। সৌদি যুবরাজ মহম্মদ বিন সলমনের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী তারেকের রিয়াধ সফরের সম্ভাবনাও রয়েছে। সেই সফরে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে। দুই দেশের ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক সম্পর্কের কারণে ঢাকার প্রতিরক্ষা নীতিতে বড় পরিবর্তন হলে তার প্রভাব নয়াদিল্লির নিরাপত্তা হিসাবেও পড়তে পারে। বিশেষ করে চিনা যুদ্ধবিমান কেনা এবং পাকিস্তান-সৌদি-তুরস্কের প্রতিরক্ষা সমীকরণের প্রতি বাংলাদেশের আগ্রহ-দুই বিষয়ই ভারতের নজরে থাকার মতো।

ফলে ২০টি জে-১০সিই কেনার সম্ভাব্য চুক্তি এখন শুধু বাংলাদেশের বিমানবাহিনীর আধুনিকীকরণের বিষয় নয়, দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত সমীকরণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বেজিংয়ের কাছ থেকে ঢাকার এই বড় প্রতিরক্ষা ক্রয় শেষ পর্যন্ত কোন পর্যায়ে পৌঁছয় এবং এর ফলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার সমীকরণে কী প্রভাব পড়ে, সেটাই এখন নজরে।

Dailyhunt
Disclaimer: This content has not been generated, created or edited by Dailyhunt. Publisher: Najarbandi