নয়াদিল্লি: ব্রিক্স (BRICS) সম্মেলনের যৌথ ঘোষণাপত্রে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও দিল্লির মঞ্চের বাইরে সেই সংঘাত নিয়েই গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা এল মস্কোর কাছ থেকে। ক্রেমলিনের দাবি, ইউক্রেন যুদ্ধের সমাধানে সাহায্য করার প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সেই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন বলে জানিয়েছেন ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেশকভ।
রুশ সংবাদ সংস্থা TASS-এর প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে এই তথ্য জানিয়েছে রয়টার্সও। পেশকভের বক্তব্য অনুযায়ী, ব্রিক্স সম্মেলনের ফাঁকে পুতিনের সঙ্গে আলাদা আলোচনায় ইউক্রেন পরিস্থিতি নিয়ে শান্তির পথ খুঁজতে নিজেদের সহায়তার কথা জানান মোদী ও জিনপিং।
অর্থাৎ, এটি ব্রিক্সের কোনও আনুষ্ঠানিক মধ্যস্থতার সিদ্ধান্ত নয়। বরং রুশ প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার সময়ে ভারত ও চিনের দুই রাষ্ট্রনেতার দেওয়া কূটনৈতিক সহায়তার প্রস্তাব-মস্কোর তরফে আপাতত বিষয়টিকে এ ভাবেই তুলে ধরা হয়েছে।
বিষয়টির গুরুত্ব আরও বেড়েছে কারণ ১২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত নিউ দিল্লি ডিক্লারেশন-এ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সরাসরি কোনও উল্লেখ নেই। ঘোষণাপত্রে আন্তর্জাতিক সংঘাতের ক্ষেত্রে সংলাপ, আলোচনা এবং কূটনীতির মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
এর আগে ৩১ অগস্ট কিরগিজস্তানে পুতিনের সঙ্গে বৈঠকেও ইউক্রেন সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন মোদী। TASS-এর প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী, ভারত যে ইউক্রেনের ক্ষেত্রে সমস্ত শান্তিপূর্ণ উদ্যোগকে সমর্থন করে, সে বার্তাও দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। মোদী বলেছিলেন, ইউক্রেনে লড়াই বন্ধ হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দিল্লিতে ব্রিক্স সম্মেলনের আগে পুতিনের সঙ্গে বৈঠকেও ইউক্রেন ও কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলের সংঘাতের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছিলেন মোদী। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের বিবৃতি অনুযায়ী, এই সংঘাতগুলির প্রভাব সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তার উপর পড়ছে-দুই নেতা সেই বিষয় নিয়েও মত বিনিময় করেন।
অন্যদিকে, চিনও ইউক্রেন যুদ্ধের কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান জানিয়ে আসছে। দিল্লিতে মোদী-জিনপিং বৈঠকে অবশ্য মূলত ভারত-চিন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, সীমান্তে শান্তি এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নত করার বিষয়গুলি গুরুত্ব পেয়েছে।
পেশকভের বক্তব্য অনুযায়ী, মোদী ও জিনপিংয়ের সঙ্গে আলোচনার সময়ে ইউক্রেনের মাটিতে পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁদের বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন পুতিন। একই সঙ্গে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত নিয়ে আমেরিকা, রাশিয়া ও ইউক্রেনকে নিয়ে ত্রিপাক্ষিক আলোচনা ফের শুরু করার সম্ভাবনাও মস্কো উড়িয়ে দিচ্ছে না। TASS-কে উদ্ধৃত করে রয়টার্স জানিয়েছে, অক্টোবরেই এমন আলোচনা ফের শুরু হতে পারে বলে রাশিয়ার তরফে ইঙ্গিত রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ভারতের অবস্থান কিছুটা আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে। মস্কোর সঙ্গে নয়াদিল্লির দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে ভারত ইউক্রেনের সঙ্গেও কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রেখেছে এবং বারবার সংলাপের মাধ্যমে যুদ্ধের অবসানের কথা বলেছে।
তবে ভারতের মধ্যস্থতার সম্ভাবনা নিয়ে অতিরিক্ত কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনও নেই। মোদী শান্তি প্রক্রিয়ায় সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন এবং পুতিন তা স্বাগত জানিয়েছেন-এটি আপাতত ক্রেমলিনের বক্তব্য। ইউক্রেন বা অন্য পক্ষ একই প্রস্তাবকে কী ভাবে দেখছে, সেটিও ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক গতিপথের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হবে।
এর মধ্যেই রাশিয়ায় ১৮ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর সংসদীয় নির্বাচন হওয়ার কথা। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর এটিই প্রথম রাশিয়ান স্টেট ডুমা নির্বাচন। রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুদ্ধ নিয়ে রাশিয়ার অভ্যন্তরে উদ্বেগ বাড়লেও ক্ষমতাসীন United Russia-র সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার সম্ভাবনা রয়েছে।
ফলে মস্কোর জন্যও যুদ্ধ, কূটনীতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সমীকরণ একই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে নির্বাচনকে সামনে রেখে পুতিন শান্তির পথে কতটা এগোবেন, কিংবা মোদী ও জিনপিংয়ের প্রস্তাব বাস্তবে কোনও আলোচনার দরজা খুলবে কি না-তার উত্তর এখনও মেলেনি।

