যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের (Jadavpur University) দেওয়াললিখন ঘিরে বিতর্ক থামছেই না। মঙ্গলবার গভীর রাতে ফের ক্যাম্পাসে ঢুকে পড়ুয়াদের লেখা একাধিক স্লোগান সাদা রঙে ঢেকে দেওয়ার অভিযোগ উঠল। পুরসভার কর্মীরা দেওয়াল পরিষ্কার করতে এসেছিলেন বলে জানা থাকলেও তাঁদের সঙ্গে পুলিশ আসবে, তা জানতেন না বলে দাবি করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য।
আর পুলিশ যদি তাঁর অনুমতি ছাড়াই ক্যাম্পাসে ঢুকে থাকে, তা হলে কী ভাবে এমনটা হল-এখন সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে।
রেভলিউশনারি স্টুডেন্টস ফ্রন্ট (RSF)-এর যাদবপুর ইউনিটের সেক্রেটারি ইন্দ্রানুজ রায়ের দাবি, মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১২টা নাগাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ নম্বর গেট দিয়ে কয়েক জন ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন। তাঁদের তরফে জানানো হয়, পুরসভার কর্মীরা দেওয়াললিখন মুছতে এসেছেন। তাঁদের নিরাপত্তার জন্য পুলিশও সঙ্গে রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
এই ঘটনাকে ঘিরেই প্রশ্ন তুলেছেন পড়ুয়াদের একাংশ। ইন্দ্রানুজের বক্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে পুলিশ প্রবেশের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের আগাম অনুমতি প্রয়োজন। দিনের বেলাতেও যদি অনুমতির প্রয়োজন হয়, তা হলে মাঝরাতে পুলিশ কী ভাবে ক্যাম্পাসে ঢুকল, সেই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
বুধবার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য দাবি করেন, পুলিশকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার অনুমতি তিনি দেননি। তাঁর কথায়, পুলিশকে ঢুকতে বারণ করা হয়েছিল এবং সেই সংক্রান্ত লিখিত ই-মেলও তাঁর কাছে রয়েছে। ফলে পুরসভার কর্মীদের প্রবেশের বিষয়ে জানলেও পুলিশের উপস্থিতি তাঁর কাছে অজানা ছিল বলেই দাবি উপাচার্যের।
দেওয়াললিখন মুছে ফেলার ঘটনাটি অবশ্য হঠাৎ করে শুরু হয়নি। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশের পর শনিবার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বেশ কিছু দেওয়াললিখন সাদা রঙ করে ঢেকে দিয়েছিল বলে জানা যায়। কিন্তু তার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ফের দেওয়ালে নতুন স্লোগান দেখা যায়।
সেই সময় কার্ল মার্ক্সের একটি উদ্ধৃতিও লেখা হয়েছিল-'আমাদের সময় যখন আসবে তখন আমরা বৈপ্লবিক শক্তি প্রয়োগ করতে দ্বিধা করব না'। মঙ্গলবার গভীর রাতে সেই লেখাটিও ফের সাদা রঙে ঢেকে দেওয়া হয়েছে।
ঘটনাটির কয়েক ঘণ্টা আগেই অবশ্য উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত সব পক্ষকে ক্যাম্পাস পরিচ্ছন্ন রাখার আবেদন জানিয়েছিলেন। তিনি স্পষ্ট করেছিলেন, মতপ্রকাশের বিরোধিতা তাঁর নেই। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়ালে লেখালিখি করার পক্ষেও তিনি নন।
উপাচার্যের বক্তব্য অনুযায়ী, ক্যাম্পাসে ফের নতুন করে দেওয়াললিখন হয়েছে জানতে পেরে সরকারের পক্ষ থেকে তাঁকে সেগুলি মুছে দেওয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু বারবার দেওয়াল পরিষ্কার করার মতো পরিকাঠামো বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে নেই বলে তিনি জানিয়েছিলেন। এরপরই পুরসভা দেওয়াল পরিষ্কারের দায়িত্ব নেয়।
চিরঞ্জীবের দাবি, মঙ্গলবার রাতেই পুরসভার তরফে তাঁকে জানানো হয়েছিল যে বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়াল পরিষ্কার করা হবে এবং সেই কাজ রাতেই করা হবে। তবে পুরসভার কর্মীরা ক্যাম্পাসে ঢুকে দেওয়াললিখন মুছতে পারবেন কি না, সে বিষয়ে তাঁর কোনও স্পষ্ট ধারণা ছিল না বলেও জানিয়েছেন তিনি।
এর মধ্যেই উঠেছে আরও একটি প্রশ্ন-কার্ল মার্ক্সের উদ্ধৃতিটিই বা কেন মুছে ফেলতে হল? এই প্রশ্নের জবাবে উপাচার্য বিষয়টিকে দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁর পাল্টা প্রশ্ন, প্যালেস্তাইনকে মুক্ত করার স্লোগানও কি একই অর্থে 'দেশবিরোধী' বলা হবে?
ফলে যাদবপুরের দেওয়াল এখন শুধু রাজনৈতিক স্লোগান কিংবা মতপ্রকাশের জায়গা নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বশাসন, প্রশাসনিক অনুমতি এবং ক্যাম্পাসে পুলিশের প্রবেশাধিকার নিয়েও নতুন বিতর্কের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। দেওয়াললিখন মুছে ফেলার পাশাপাশি মাঝরাতে পুলিশের উপস্থিতির অভিযোগের বিষয়টিও এখন কতটা স্পষ্ট হয়, সেদিকেই নজর থাকবে।

