নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ধসের পর ষষ্ঠ দিনেও কাটেনি বিপর্যয়ের অন্ধকার। বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধারকাজ চললেও বহু দুর্গম অঞ্চলে এখনও পৌঁছতে পারেনি উদ্ধারকারী দল। সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ত্রিশূলী নদী ঘিরে থাকা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলির সুড়ঙ্গ নিয়ে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, টানেলগুলিতে আটকে বা নিখোঁজ কর্মীর সংখ্যা এখনও ৯০০-র বেশি।
এ দিকে নেপাল ও চিন মিলিয়ে নিখোঁজের সংখ্যা প্রায় ৪৫০০, যাঁদের মধ্যে প্রায় ৩০০ জন ভারতীয় বলে জানা গিয়েছে।
ত্রিশূলী নদীর উপর রাসুয়া ও নুয়াকোট জেলা মিলিয়ে অন্তত ১০টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি এখনও নির্মীয়মাণ। বিপর্যয়ের পর ওই প্রকল্পগুলির একাধিক সুড়ঙ্গে কর্মীরা আটকে পড়েন। রবিবার পর্যন্ত স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছিল, প্রায় ৫০০ কর্মী টানেলের ভিতরে আটকে থাকতে পারেন এবং তাঁদের মধ্যে প্রায় ৪০০ জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
কিন্তু পরবর্তী রিপোর্টে পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। বিবিসি-সহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বিভিন্ন টানেলে এখনও নিখোঁজ কর্মীর সংখ্যা অন্তত ৯৩৩। কোন সুড়ঙ্গে কতজন আটকে রয়েছেন, তাঁরা জীবিত কি না- সেই বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য এখনও মেলেনি। কাদা, জল ও ধ্বংসস্তূপের স্তর পেরিয়ে উদ্ধারকারীরা বিভিন্ন ফাঁক দিয়ে টানেলের ভিতরে অক্সিজেন পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন।
এরই মধ্যে মৃতের সংখ্যাও ৯০০ ছাড়িয়েছে। বহু এলাকা এখনও দুর্গম হয়ে থাকায় উদ্ধারকারী দল সেখানে পৌঁছতে পারেনি। ফলে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। চিতওয়ান জেলার ভরতপুরের কাছে দেবঘাট জঙ্গলে ইতিমধ্যেই গণকবরের সন্ধানে কাজ চলছে। দুই দিন ধরে সেখানে বিপর্যয়ে মৃতদের দেহ উদ্ধারের চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
এই বিপর্যয়ের পর ভারতের নাগরিকদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। প্রায় ৩০০ ভারতীয়ের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না বলে বিভিন্ন রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে একটি ভ্রমণ সংস্থার সঙ্গে নেপালে যাওয়া ৩০ জন পর্যটক এবং সংস্থার দুই ম্যানেজার-সহ মোট ৩৭ জনেরও সোমবার রাত পর্যন্ত কোনও সন্ধান মেলেনি।
বিপর্যয়ের কারণ ও আগাম সতর্কতা নিয়েও শুরু হয়েছে চাপানউতোর। কাঠমান্ডুর পক্ষ থেকে ফের চিনের দিকে অভিযোগের আঙুল তোলা হয়েছে। নেপালের দাবি, হিমবাহ গলন এবং সংশ্লিষ্ট জলস্তর সংক্রান্ত তথ্য আগেই চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় তথ্য সময়মতো পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ।
নেপালের ফ্লাড ফোরকাস্টিং বিভাগের হাইড্রোলজিস্ট সৌহার্দ্র জোশীর বক্তব্য, হিমবাহের গতিবিধি সম্পর্কে আগাম তথ্য পাওয়া গেলে বিপর্যয়ের আগে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হত। নেপাল শুধু বৃষ্টির পূর্বাভাস নয়, হিমবাহ সংক্রান্ত তথ্যও নিয়মিতভাবে পাওয়ার দাবি জানিয়েছে। তবে চিন শুরু থেকেই তথ্য গোপনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
অন্যদিকে উদ্ধারকারীদের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে টানেলের ভিতরে জমে থাকা কাদা ও ধ্বংসস্তূপ। অনেক জায়গায় পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে থার্মাল ড্রোন ব্যবহার করেও মানুষের উপস্থিতির কোনও নির্ভরযোগ্য সংকেত পাওয়া যাচ্ছে না। নুয়াকোটের আপার ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে উদ্ধারকারী দলকে।
হাইড্রোলিক কাটার ও ড্রিল মেশিন ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপ সরানোর পর রবিবার সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ খুঁজে পাওয়া যায়। ভিতরে ঢুকে উদ্ধারকারীরা দীর্ঘক্ষণ ডাকাডাকি করলেও কোনও সাড়া পাননি। ওই টানেলে আটকে থাকা কর্মীর সংখ্যা ৫০ থেকে ২০০-র মধ্যে হতে পারে বলে বিভিন্ন সূত্রে আশঙ্কা করা হয়েছে।
রাসুয়াগাঢ়ি হাইড্রোপাওয়ার প্রকল্পের পরিস্থিতিও একই রকম উদ্বেগজনক। একটি সুড়ঙ্গে থাকা ৯৩ জন শ্রমিকের কোনও সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। টানেলের ভিতরে থার্মাল ড্রোন পাঠানো হলেও মানুষের চলাফেরার কোনও ইঙ্গিত মেলেনি। তাঁরা কাদার নীচে আটকে রয়েছেন, নাকি স্রোতের সঙ্গে অন্যত্র ভেসে গিয়েছেন- তা এখনও জানা যায়নি।
উদ্ধার অভিযানে নেপাল ও চিনের পাশাপাশি ভারত এবং দক্ষিণ কোরিয়ার বিশেষজ্ঞরাও প্রযুক্তিগত সহায়তা করছেন। ভারী যন্ত্র দিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরানোর পাশাপাশি কোথাও নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ ঘটিয়ে টানেলের পথ খোলার চেষ্টা চলছে। আপার ত্রিশূলী-১ প্রকল্প থেকে প্রায় ২৫০ জন শ্রমিককে ইতিমধ্যেই উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তবে আপার ত্রিশূলী-৩এ, আপার ত্রিশূলী-৩বি-সহ একাধিক প্রকল্পে এখনও বড় বাধা হয়ে রয়েছে কাদা ও ধ্বংসস্তূপ।
যাঁরা প্রাণে বেঁচে গিয়েছেন, তাঁদের কাছেও অবশ্য বিপর্যয়ের আতঙ্ক এখনও কাটেনি। আট বছরের বিপ্রিংশা রাতে ঘুমের মধ্যে ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠছে। ত্রিশূলীর দ্বিতীয় শ্রেণির ওই ছাত্রীর স্মৃতিতে এখনও সেই বিকট শব্দ- বোমা বিস্ফোরণের মতো আওয়াজ, তারপর চোখের সামনে ভেসে যায় বাড়ি।
এখন মা-কে নিয়ে দেবীঘাটের একটি সেনা শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে ছোট্ট বিপ্রিংশা। গ্রামে ফিরতে অপেক্ষা করছে একটি উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারের। আর নেপালের উদ্ধারকারীরা একদিকে ধ্বংসস্তূপের নীচে জীবিতদের খোঁজ চালাচ্ছেন, অন্যদিকে দুর্গম এলাকাগুলিতে পৌঁছে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব পাওয়ার চেষ্টা করছেন। ফলে বিপর্যয়ের ষষ্ঠ দিনেও নেপালের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- অন্ধকার সুড়ঙ্গ ও দুর্গম পাহাড়ের ভিতর থেকে আর কতজনকে জীবিত ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

