Dailyhunt Logo
  • Light mode
    Follow system
    Dark mode
    • Play Story
    • App Story
পুরীর রথযাত্রায় প্রতি বছর কেন নতুন রথ তৈরি হয়? সত্যযুগের ঐতিহ্যের নেপথ্যে চমকপ্রদ কারণ

পুরীর রথযাত্রায় প্রতি বছর কেন নতুন রথ তৈরি হয়? সত্যযুগের ঐতিহ্যের নেপথ্যে চমকপ্রদ কারণ

পুরীর (Puri) রথযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি ভারতীয় সভ্যতা, আধ্যাত্মিকতা, কারুশিল্প এবং শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যের এক অনন্য প্রতীক। প্রতি বছর আষাঢ় মাসে লক্ষ লক্ষ ভক্তের উপস্থিতিতে জগন্নাথদেব (Lord Jagannath), বলরাম (Balabhadra) এবং সুভদ্রা (Subhadra) তিনটি পৃথক রথে চড়ে শ্রীমন্দির থেকে গুণ্ডিচা মন্দির (Gundicha Temple) -এর উদ্দেশে যাত্রা করেন।

তবে এই উৎসবের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো-প্রতি বছর নতুন করে তিনটি রথ নির্মাণ করা হয়। কেন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই প্রথা মেনে চলা হচ্ছে? তার উত্তর লুকিয়ে রয়েছে শাস্ত্র, দর্শন ও প্রাচীন ঐতিহ্যের গভীরে।

সত্যযুগ থেকে শুরু হয়েছে রথযাত্রার প্রথা

হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, পুরীর রথযাত্রার সূচনা সত্যযুগে। পুরাণে বর্ণিত আছে, শ্রীজগন্নাথের এই যাত্রা ভক্তদের কাছে ঈশ্বরের নিজে বেরিয়ে এসে দর্শন দেওয়ার প্রতীক। পুরীকে চার ধাম (Char Dham)-এর অন্যতম হিসেবে গণ্য করা হয়। অন্য তিনটি ধাম হল বদ্রীনাথ (Badrinath), দ্বারকা (Dwarka) এবং রামেশ্বরম (Rameswaram)

রথযাত্রার আগে জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমায় তিন দেবদেবীর মহাস্নান অনুষ্ঠিত হয়। এরপর তাঁরা প্রায় ১৫ দিন 'অনবাসর' পর্বে থাকেন। এই সময় দেবতাদের অসুস্থ বলে মনে করা হয় এবং লোকচক্ষুর আড়ালে বিশেষ সেবা ও চিকিৎসার পর রথে চড়ে গুণ্ডিচা মন্দিরে যাত্রা করেন।

প্রতি বছর নতুন রথ কেন তৈরি করা হয়?

পুরীর রথযাত্রার সবচেয়ে অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, কোনও রথই দ্বিতীয়বার ব্যবহার করা হয় না। প্রতি বছর অক্ষয় তৃতীয়ার দিন থেকে নতুন রথ তৈরির কাজ শুরু হয়।

ধর্মীয় দর্শনে রথকে মানুষের শরীরের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। শরীর নশ্বর হলেও আত্মা চিরন্তন-হিন্দু দর্শনের এই ধারণাই রথ নির্মাণের প্রথার সঙ্গে যুক্ত। পুরোনো রথ ভেঙে নতুন রথ তৈরি করা জন্ম, মৃত্যু ও পুনর্জন্মের অনন্ত চক্রের প্রতীক বলে মনে করা হয়।

তিন রথের নাম ও বৈশিষ্ট্য

তিন দেবদেবীর জন্য তিনটি পৃথক রথ তৈরি করা হয়।

  • জগন্নাথদেবের রথ - নন্দীঘোষ (Nandighosha), উচ্চতা প্রায় ৪৫ ফুট এবং এতে থাকে ১৬টি চাকা।
  • বলরামের রথ - তালধ্বজ (Taladhwaja)
  • সুভদ্রার রথ - দর্পদলন বা পদ্মধ্বজ (Darpadalana/Padmadhwaja)

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একই শাস্ত্রীয় নিয়ম ও নির্দিষ্ট পরিমাপ মেনে এই রথগুলি নির্মাণ করা হয়।

কীভাবে তৈরি হয় এই বিশাল রথ?

রথ তৈরিতে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৮৩২টি কাঠের অংশ ব্যবহার করা হয়। এর জন্য ওডিশার বনাঞ্চল থেকে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে কাঠ সংগ্রহ করা হয়।

শাস্ত্র অনুসারে শুধুমাত্র ফসি (Phassi), ধৌসা (Dhausa), হাঁসি (Asan) এবং নিম (Neem) গাছের কাঠ রথ নির্মাণের জন্য উপযুক্ত বলে বিবেচিত।

প্রতিটি গাছ নির্বাচনের আগে পূজা করা হয় এবং বন দপ্তরের অনুমতি সাপেক্ষে কাঠ সংগ্রহ করা হয়।

সোনার কুঠার দিয়ে শুরু হয় কাঠ কাটার কাজ

রথ নির্মাণের সূচনায় বিশেষ আচার পালিত হয়। প্রধান ছুতোর প্রথমে সোনার জল দেওয়া কুঠার জগন্নাথদেবের চরণে স্পর্শ করান। তারপর সেই কুঠার দিয়েই প্রথম কাঠ কাটা হয়।

এই রীতি জগন্নাথদেবকে পুরীর প্রকৃত রাজা হিসেবে সম্মান জানানোর প্রতীক।

একটিও লোহার পেরেক ব্যবহার করা হয় না

রথ নির্মাণের আরেকটি বিস্ময়কর দিক হলো, এত বড় কাঠামো তৈরিতে কোনও লোহার পেরেক বা স্ক্রু ব্যবহার করা হয় না।

প্রাচীন ভারতীয় কাঠ-সংযোগ প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পূর্ণ রথ তৈরি করা হয়। নির্মাণকাজে যুক্ত কারিগরদেরও বিশেষ নিয়ম মানতে হয়। তাঁরা নিরামিষ আহার করেন, মন্দির চত্বরে অবস্থান করেন এবং নির্দিষ্ট ধর্মীয় বিধি অনুসরণ করেন।

পুরোনো রথের কী হয়?

উল্টো রথের পর তিনটি রথ খুলে ফেলা হয়। তবে দেবদেবীর বিগ্রহ, ঘোড়া বা অন্যান্য পবিত্র অংশ সংরক্ষণ করে রাখা হয়।

রথের কাঠ পরে নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়। ওডিশার বহু পরিবার শুভ কাজ, যেমন অন্নপ্রাশন, বিবাহ, গৃহনির্মাণ কিংবা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে এই কাঠ ব্যবহার করেন। অনেক ক্ষেত্রে শ্রীজগন্নাথ মন্দির (Jagannath Temple)-এর মহাপ্রসাদ রান্নাতেও রথের কাঠ ব্যবহার করা হয়। স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই কাঠ শুভ শক্তি ও আশীর্বাদের প্রতীক।

রথযাত্রার ঐতিহ্য আজও অমলিন

প্রতি বছর নতুন রথ নির্মাণ শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় প্রথা নয়; এটি ভারতীয় সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা, আধ্যাত্মিক দর্শন এবং ঐতিহ্যবাহী কারিগরি দক্ষতার এক জীবন্ত নিদর্শন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একই নিয়মে রথ নির্মাণ ও রথযাত্রা পালনের মধ্য দিয়ে পুরী আজও বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসবের কেন্দ্র হিসেবে নিজের মর্যাদা ধরে রেখেছে।

Dailyhunt
Disclaimer: This content has not been generated, created or edited by Dailyhunt. Publisher: Najarbandi