সংবাদ সম্প্রচার থেকে বিতর্কমূলক অনুষ্ঠান-বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলগুলির জন্য একাধিক বিষয়ে সতর্কতার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রক (Ministry of Information and Broadcasting)। বুধবার জারি করা নির্দেশিকায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়াতে পারে এমন বক্তব্য, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের খবর এবং হিংসাত্মক দৃশ্য সম্প্রচারের ক্ষেত্রে সম্পাদকীয় নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার কথা বলা হয়েছে।
একই সঙ্গে সংবাদ তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নির্ভুলতা ও সত্যতা বজায় রাখার উপরে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নির্দেশিকার মূল লক্ষ্য, সংবাদ পরিবেশনের সময় এমন কোনও বিষয় যাতে সম্প্রচারিত না হয়, যা নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানকে বিপদের মুখে ফেলতে পারে, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়াতে পারে অথবা দর্শকদের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। সেই কারণে সংবাদ সংগ্রহ, সম্পাদনা, প্রযোজনা ও সম্প্রচারের প্রতিটি পর্যায়ে সতর্কতা বজায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রের নির্দেশিকায় নিরাপত্তা বাহিনীর সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান সম্প্রচারের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ধরনের অভিযানের খবর দেখানোর সময় এমন কোনও তথ্য বা দৃশ্য প্রকাশ করা উচিত নয়, যার ফলে বাহিনীর কাজ কিংবা অভিযানের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে।
প্রয়োজন অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট অভিযান সম্প্রচার থেকে বিরত থাকার কথাও বলা হয়েছে। অর্থাৎ, খবরের গুরুত্ব বিবেচনার পাশাপাশি নিরাপত্তার সম্ভাব্য ঝুঁকিও সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে গুরুত্ব পাবে।
এ ছাড়া হিংসাত্মক দৃশ্য বা এমন ছবি দেখানোর ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে হবে, যা সাধারণ দর্শকের মানসিক অস্বস্তি বাড়াতে পারে। সম্প্রচারের আগে দৃশ্যের প্রকৃতি এবং তার সম্ভাব্য প্রভাব বিচার করার উপরে জোর দেওয়া হয়েছে।
টেলিভিশনের প্যানেল আলোচনা ও বিতর্কমূলক অনুষ্ঠানে অতিথিদের বক্তব্য নিয়ন্ত্রণের বিষয়েও নির্দেশিকা দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রের বক্তব্য অনুযায়ী, কোনও আলোচনা যাতে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, দেশবিরোধী মনোভাব বা উত্তেজনা ছড়ানোর মঞ্চ হয়ে না ওঠে, তা নিশ্চিত করতে চ্যানেল কর্তৃপক্ষ ও সঞ্চালকদের সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।
কোনও প্যানেলিস্টের বক্তব্য আপত্তিকর, অবমাননাকর বা উস্কানিমূলক হয়ে উঠলে পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট বক্তার মাইক্রোফোন বন্ধ করা, তাঁর বক্তব্যের সম্প্রচার থামিয়ে দেওয়া কিংবা পুরো অনুষ্ঠান বা ফিড বন্ধ করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।
এর ফলে সরাসরি সম্প্রচারিত বিতর্কের ক্ষেত্রে সঞ্চালকের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আলোচনায় একাধিক মতামত উঠে এলেও বক্তব্যের ধরন ও সম্ভাব্য প্রভাবের দিকে নজর রাখতে হবে চ্যানেল কর্তৃপক্ষকে।
বর্তমানে সংবাদ সংগ্রহ, ছবি তৈরি, ভিডিও সম্পাদনা এবং তথ্য উপস্থাপনের বিভিন্ন কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে সংবাদ পরিবেশনে AI ব্যবহারের বিষয়টিও কেন্দ্রীয় নির্দেশিকায় জায়গা পেয়েছে।
নির্দেশিকায় AI-কে সংবাদ তৈরির সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। তবে এই প্রযুক্তির প্রয়োগ যেন খবরের নির্ভুলতা, সত্যতা এবং সংবেদনশীলতার ক্ষতি না করে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
অর্থাৎ, AI ব্যবহার করে তৈরি বা সম্পাদিত সংবাদসামগ্রী প্রকাশের আগে তার তথ্যগত নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করা জরুরি। প্রযুক্তির সাহায্যে দ্রুত সংবাদ তৈরি করা সম্ভব হলেও তার ফলে ভুল তথ্য ছড়ানো বা সংবেদনশীল বিষয় ভুলভাবে উপস্থাপিত হওয়ার ঝুঁকি এড়ানো প্রয়োজন।
কেন্দ্রের নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, নিয়ম লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট টিভি চ্যানেলের বিরুদ্ধে কেবল টেলিভিশন নেটওয়ার্কস (রেগুলেশন) আইন, ১৯৯৫ (Cable Television Networks (Regulation) Act, 1995)-এর অধীনে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং সম্পাদকীয় পর্যালোচনার ব্যবস্থা জোরদার করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। সংবাদ সংগ্রহ থেকে শুরু করে চূড়ান্ত সম্প্রচার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের উপরে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, টেলিভিশন সংবাদ সম্প্রচারে নিরাপত্তা, সামাজিক সংবেদনশীলতা এবং প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহারের বিষয়গুলিকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার বার্তা দিয়েছে কেন্দ্র। তবে নির্দেশিকার নির্দিষ্ট আইনি প্রয়োগ ও প্রতিটি ক্ষেত্রে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা মূল্যায়নের জন্য সম্পূর্ণ সরকারি নির্দেশিকার ভাষা দেখা প্রয়োজন।

