Dailyhunt Logo
  • Light mode
    Follow system
    Dark mode
    • Play Story
    • App Story
বাড়তি খরচ, কম লাভ-দেবীপ্রতিমা গড়তে দিনরাত এক করছেন কুমারঘাটের মৃৎশিল্পীরা

বাড়তি খরচ, কম লাভ-দেবীপ্রতিমা গড়তে দিনরাত এক করছেন কুমারঘাটের মৃৎশিল্পীরা

নতুন 1 week ago

কুমারঘাট , ১০ অক্টোবর : পিতৃপক্ষের অবসানে সূচনা হয়েছে দেবীপক্ষের। আর দেবীপক্ষের আগমনের সঙ্গে সঙ্গেই শারদোৎসবের প্রস্তুতিতে গতি বেড়েছে গোটা ত্রিপুরায়। শহর থেকে গ্রাম, সর্বত্রই এখন দুর্গাপুজোকে ঘিরে সাজ সাজ রব। কোথাও চলছে পুজোমণ্ডপ নির্মাণের শেষ মুহূর্তের কাজ, কোথাও আবার দেবী দুর্গার প্রতিমায় রং ও অলংকারের চূড়ান্ত ছোঁয়া দিতে ব্যস্ত শিল্পীরা।

তবে উৎসবের এই আনন্দঘন আবহের আড়ালেই রয়েছে মৃৎশিল্পীদের এক অন্য লড়াই। কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, শ্রমিকদের পারিশ্রমিক বৃদ্ধি এবং প্রতিমার বিক্রয়মূল্য সেই অনুপাতে না বাড়ায় ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে তাঁদের জীবিকা নির্বাহ।

ঊনকোটি জেলার কুমারঘাট মহকুমার সর্বত্রই এখন দুর্গাপ্রতিমা নির্মাণের কাজে ব্যস্ত মৃৎশিল্পীরা। পুজোর দিন যত এগিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে তাঁদের কাজের চাপ। কোনও প্রতিমার কাঠামোয় মাটির শেষ প্রলেপ দেওয়া হচ্ছে, কোথাও চলছে প্রতিমা শুকিয়ে নেওয়ার কাজ, আবার কোথাও শিল্পীদের তুলির আঁচড়ে ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে দেবী দুর্গার পূর্ণাঙ্গ রূপ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিমা নির্মাণের কাজ শেষ করে পুজো উদ্যোক্তাদের হাতে তুলে দেওয়াই এখন তাঁদের প্রধান লক্ষ্য।

কিন্তু এই ব্যস্ততার মধ্যেও শিল্পীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ স্পষ্ট। প্রতিমা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় মাটি, খড়, বাঁশ, রং, অলংকার-সহ বিভিন্ন উপকরণের দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে শ্রমিকদের মজুরিও। ফলে আগের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করে প্রতিমা তৈরি করতে হচ্ছে তাঁদের। অথচ বাজারের পরিস্থিতি এবং ক্রেতাদের আর্থিক সামর্থ্যের কথা বিবেচনা করে প্রতিমার দাম ইচ্ছেমতো বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। এর জেরে উৎপাদন খরচ বাড়লেও প্রত্যাশিত লাভের মুখ দেখছেন না মৃৎশিল্পীরা।

কুমারঘাট শহরের মৃৎশিল্পী স্বপন কুমার দাস এ বছর মোট ১৮টি দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করেছেন। তাঁর কর্মশালায় প্রতিমা নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। পুজোর আগে প্রতিটি প্রতিমাকে যথাযথভাবে সাজিয়ে চূড়ান্ত রূপ দিতে এখন ব্যস্ত তিনি। তবে কাজের পরিমাণ বেশি হলেও শ্রমিকদের পারিশ্রমিক বেড়ে যাওয়ায় তাঁদের নিয়োগ করে কাজ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। সেই কারণে অধিকাংশ কাজই নিজের হাতে সামলাতে হচ্ছে তাঁকে।

স্বপন কুমার দাসের বক্তব্য, প্রতিমা তৈরির উপকরণের দাম বাড়লেও সেই অনুপাতে প্রতিমার বিক্রয়মূল্য বাড়েনি। সাধারণ মানুষের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় বেশি দামে প্রতিমা কিনতে অনেকেই আগ্রহী হচ্ছেন না। ফলে শিল্পীদের পক্ষে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিমার দাম নির্ধারণ করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিমা তৈরির পিছনে শ্রম, সময় ও অর্থ-সবকিছুই বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই পরিশ্রমের যথাযথ আর্থিক প্রতিদান মিলছে না। উৎসবের মরশুমে কাজের চাপ বাড়লেও লাভের পরিমাণ সীমিত থাকায় আর্থিক দুশ্চিন্তা থেকেই যাচ্ছে।

অন্যদিকে, কুমারঘাটের রাজনগর শক্তিসংঘ গ্রামেও দুর্গাপ্রতিমা নির্মাণের কাজে ব্যস্ত মৃৎশিল্পীরা। গ্রামের মৃৎশিল্পী সুধাংশু রুদ্রপাল এ বছর ১০টি দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করেছেন। চার থেকে পাঁচজন শ্রমিককে সঙ্গে নিয়ে চলছে প্রতিমা নির্মাণের কাজ। পুজোর সময়সীমা মাথায় রেখে দ্রুত কাজ শেষ করার চেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি। তবে প্রতিমা তৈরির ক্ষেত্রে একাধিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাঁকে।

সুধাংশু রুদ্রপালের কথায়, পর্যাপ্ত রোদের অভাবে মাটির প্রতিমা শুকোতে সমস্যা হচ্ছে। প্রতিমা তৈরির ক্ষেত্রে মাটি শুকিয়ে নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আবহাওয়া অনুকূলে না থাকলে সেই কাজে বেশি সময় লাগে। এতে পরবর্তী ধাপের কাজেও বিলম্ব হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অন্যদিকে, প্রতিমা নির্মাণে ব্যবহৃত মাটি, অলংকার ও অন্যান্য উপকরণের মূল্যবৃদ্ধির ফলে বেড়েছে সামগ্রিক উৎপাদন খরচ। কিন্তু সেই অনুপাতে প্রতিমার দাম বাড়ানো যাচ্ছে না। ফলে আগের তুলনায় পরিশ্রম বেশি হলেও লাভের পরিমাণ ক্রমশ কমছে বলে জানান তিনি।

মৃৎশিল্পীদের কাছে দুর্গাপুজো শুধু উপার্জনের একটি মরশুম নয়, বরং দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, শিল্পসাধনা ও বংশপরম্পরায় চলে আসা পেশার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তাঁদের আবেগ। বছরের পর বছর ধরে নিজেদের দক্ষতা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে তাঁরা দেবী দুর্গার প্রতিমাকে প্রাণবন্ত করে তোলেন। তাঁদের হাতের নিপুণ কারুকার্যেই মণ্ডপে মণ্ডপে পূর্ণতা পায় শারদোৎসব। অথচ সেই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষগুলিকেই প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হচ্ছে বাড়তি খরচ এবং সীমিত আয়ের সঙ্গে।

উৎসবের আনন্দে যখন মেতে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছেন সাধারণ মানুষ, তখন মৃৎশিল্পীদের কাছে প্রতিটি দিনই গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো প্রতিমা তৈরি করে ক্রেতাদের হাতে তুলে দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের হিসাব মেলাতে হচ্ছে উৎপাদন খরচ ও সম্ভাব্য আয়ের। শ্রমিকের মজুরি, কাঁচামালের দাম এবং প্রতিমা তৈরির আনুষঙ্গিক ব্যয় মেটানোর পর কতটা লাভ থাকবে, তা নিয়েই চিন্তিত তাঁরা। তবুও পেশার প্রতি ভালোবাসা এবং দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদে থেমে নেই তাঁদের কাজ।

সব মিলিয়ে, কুমারঘাটের মৃৎশিল্পীদের কর্মশালায় এখন শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা। বাড়তি উৎপাদন খরচ, আবহাওয়াজনিত সমস্যা এবং সীমিত লাভের বাধা পেরিয়ে দেবীপ্রতিমাকে নিখুঁত রূপ দেওয়ার চেষ্টায় দিনরাত এক করে কাজ করছেন তাঁরা। শিল্পীদের প্রত্যাশা, তাঁদের শ্রম ও শিল্পসাধনার যথাযথ মূল্যায়ন হবে এবং আগামী দিনেও এই ঐতিহ্যবাহী পেশা টিকে থাকবে। এখন তাঁদের সমস্ত অপেক্ষা একটাই-সময়ের মধ্যে প্রতিমা নির্মাণ শেষ করে ভক্তদের সামনে দেবী দুর্গাকে পূর্ণাঙ্গ রূপে তুলে ধরা। আর সেই সঙ্গে অপেক্ষা দেবীবরণের, ঢাকের বাদ্যি আর শারদীয় আনন্দে মেতে ওঠার।

Dailyhunt
Disclaimer: This content has not been generated, created or edited by Dailyhunt. Publisher: Natun