নিজস্ব প্রতিবেদন, মালদহ: লোকগাথা আর ধর্মীয় ঐতিহ্যের এক মেলবন্ধন ধরা পড়ল পুরাতন মালদহের নারায়ণপুরে। বেহুলা-লখিন্দরের অমর প্রেমকাহিনি বিজড়িত দেবকুণ্ডকে ঘিরে বুদ্ধ পূর্ণিমার পুণ্যতিথিতে আয়োজিত হলো বাৎসরিক পুজো ও মেলা। শুক্রবার সকাল থেকেই পুরাতন মালদহের নারায়ণপুর বিএসএফ-এর ৮৮ নম্বর ব্যাটালিয়ন ক্যাম্প এলাকায় ভক্তদের ভিড় উপচে পড়ে।
কয়েক দশকের প্রাচীন এই ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে এদিন উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে গোটা সীমান্ত এলাকায়।
বিএসএফ ক্যাম্প প্রাঙ্গণে ভক্তি ও সম্প্রীতির মেলা
নারায়ণপুর বিএসএফ ক্যাম্প এলাকায় অবস্থিত এই দেবকুণ্ড ও শ্রীশ্রী গন্ধেশ্বরী মাতার মন্দিরকে ঘিরে মানুষের বিশ্বাস দীর্ঘদিনের। প্রতি বছরের মতো এবারও বুদ্ধ পূর্ণিমার বিশেষ লগ্নে মেলার আয়োজন করা হয়। বিএসএফ কর্তৃপক্ষের সক্রিয় সহযোগিতায় মেলা ও পুজোর প্রতিটি পর্ব অত্যন্ত সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়। সীমান্ত পাহারার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ধর্মীয় ভাবাবেগকে সম্মান জানিয়ে বিএসএফ জওয়ানদের এই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছে।
আরও পড়ুন-মালদহে রণক্ষেত্র চাঁচল হাসপাতাল: যুবকের মৃত্যু ঘিরে ভাঙচুর, আটক ৬
বেহুলা-লখিন্দরের লোকগাথা ও ভক্তের বিশ্বাস
দেবকুণ্ডকে ঘিরে প্রচলিত রয়েছে নানা রোমাঞ্চকর কাহিনি। স্থানীয় ও ভক্তদের বিশ্বাস, সতী বেহুলা তাঁর মৃত স্বামী লখিন্দরের প্রাণ ফিরিয়ে আনতে কলার ভেলায় করে যখন স্বর্গের পথে যাচ্ছিলেন, তখন এই স্থানেই তিনি পদার্পণ করেছিলেন। এখানেই তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল নেতো ধোপানির, যাঁর হাত ধরে পরবর্তীতে তিনি স্বর্গে গিয়ে লখিন্দরের প্রাণ ফিরে পান। ভক্তদের প্রবল বিশ্বাস, এই পবিত্র কুণ্ডে স্নান করে মা গন্ধেশ্বরী কালীমাতার কাছে মানত করলে সমস্ত মনোবাসনা পূর্ণ হয়।
নবদম্পতিদের বিশেষ আচার ও পুষ্পাঞ্জলি
এদিন মেলায় নজরকাড়া ভিড় ছিল নবদম্পতিদের। প্রথা অনুযায়ী, বহু নবদম্পতি ব্যান্ড-বাদ্যি বাজিয়ে মেলায় উপস্থিত হন। দীর্ঘদিনের ধর্মীয় বিশ্বাস মেনে তাঁরা তাঁদের বিয়ের ফুল, মালা, টোপরসহ যাবতীয় মাঙ্গলিক উপকরণ দেবকুণ্ডের পবিত্র জলে ভাসিয়ে দেন। তাঁদের বিশ্বাস, দেবকুণ্ডে পুণ্যস্নান সেরে শুদ্ধচিত্তে মায়ের পুজো দিলে দাম্পত্য জীবন সুখের ও দীর্ঘস্থায়ী হয়।
বিকেল গড়াতেই মেলার ভিড় আরও বাড়তে শুরু করে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা পুণ্যার্থীদের জন্য বিএসএফ-এর পক্ষ থেকে পানীয় জল ও প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল। সব মিলিয়ে মালদহের এই প্রাচীন মেলা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এক মিলন উৎসবে পরিণত হয়।

