নিউজ বাজার২৪ ডিজিটাল ডেস্ক, মালদা: ফারাক্কা ব্যারাজ সংলগ্ন গঙ্গা নদীর অনন্য পরিবেশগত গুরুত্ব এবং বাংলার ঐতিহ্যবাহী ইলিশ সম্পদ রক্ষায় এবার সরাসরি ময়দানে নামল মালদা জেলা প্রশাসন। সোমবার জেলা প্রশাসনের বিশেষ উদ্যোগে কালিয়াচক-৩ নম্বর উন্নয়ন ব্লকের গঙ্গা তীরবর্তী বিস্তৃত এলাকা জুড়ে আয়োজন করা হয় এক বৃহৎ সচেতনতামূলক কর্মসূচি।
গঙ্গার বিপন্ন জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষা, অবৈধ উপায়ে মাছ ধরা বন্ধ করা এবং প্রজনন মরসুমে মা ইলিশের অবাধ বিচরণ নিশ্চিত করাই ছিল এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য।
'ফারাক্কা সংলগ্ন গঙ্গা নদী আমাদের জেলার অমূল্য সম্পদ এবং ইলিশের অন্যতম প্রধান প্রজনন ক্ষেত্র। কেবল সরকারি কড়া
কড়ি বা আইন প্রয়োগ করে পরিবেশ বাঁচানো সম্ভব নয়; এর জন্য নদীপাড়ের মানুষ ও মৎস্যজীবীদের সচেতন হওয়া জরুরি। প্রজননকালে নিয়ম মেনে মৎস্য আহরণ করলে ইলিশের বংশবৃদ্ধি নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি মৎস্যজীবীদের দীর্ঘমেয়াদী জীবিকাও সুরক্ষিত থাকবে।'
— শ্রী রাজনবীর সিং কাপুর (IAS), জেলা শাসক ও সমাহর্তা, মালদা
গঙ্গা নদী কেবল একটি জলাশয় নয়, বরং এটি ইলিশ মাছের প্রজনন ও চলাচলের জন্য একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও প্রাকৃতিক করিডোর। বিশেষ করে ফারাক্কা ব্যারাজ সংলগ্ন নদী এলাকা ইলিশের বংশবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত অনুকূল। কিন্তু অতিরিক্ত মৎস্য আহরণ, ছোট বা ঝাটকা ইলিশ ধরে ফেলা এবং প্রজননকালে বাধাদানের ফলে সাম্প্রতিক সময়ে গঙ্গায় ইলিশের জোগান আশঙ্কাজনকভাবে কমছিল। এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিচার করে এবং পরিবেশের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে জেলা প্রশাসন স্থানীয় মানুষদের সাথে সরাসরি যোগাযোগের পথ বেছে নিয়েছে।
এদিনের অভিযানে কালিয়াচক-৩ ব্লকের নদীতীরবর্তী বিভিন্ন গ্রাম ও ঘাটে বিশেষ প্রচার চালানো হয়। স্থানীয় মৎস্যজীবী, নদীতীরবর্তী অঞ্চলের বাসিন্দা এবং মৎস্য ব্যবসার সাথে যুক্ত বিভিন্ন অংশীজনদের মধ্যে প্রশাসনিক আধিকারিকরা দায়িত্বশীল মৎস্য আহরণ সংক্রান্ত তথ্য সংবলিত সচেতনতামূলক লিফলেট ও হ্যান্ডবিল বিতরণ করেন। সাধারণ মানুষের নজর কাড়তে এবং স্থায়ী সচেতনতা গড়ে তুলতে নদী পারের গুরুত্বপূর্ণ মোড়, মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ও ঘাটগুলোতে চোখধাঁধানো ফ্লেক্স টাঙানো হয়।
আরও পড়ুন-মালদায় হাটে হাটে জনগণনা ২০২৭ ! গ্রামবাংলার মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছবে স্ব-গণনার বার্তা
সচেতনতা অভিযানের প্রধান দিকসমূহ:
প্রজননকালীন সুরক্ষা: ডিম ছাড়ার মরসুমে যাতে গঙ্গার জলে ইলিশ অবাধে চলাচল করতে পারে এবং প্রজনন প্রক্রিয়া ব্যাহত না হয়, সে বিষয়ে স্থানীয়দের বোঝানো হয়।
ছোট ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা: ভবিষ্যৎ ইলিশ সম্পদকে বাঁচিয়ে রাখতে ছোট বা খোকা ইলিশ (ঝাটকা) ধরা থেকে বিরত থাকার বার্তা দেওয়া হয়।
টেকসই মৎস্য আহরণ: নিষিদ্ধ জাল (যেমন কারেন্ট জাল) ব্যবহার না করে এবং সঠিক সময়ে নিয়ম মেনে মাছ ধরার জন্য মৎস্যজীবীদের উৎসাহিত করা হয়।
বাস্তুতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা: গঙ্গার অন্যান্য জলজ প্রাণ ও সামগ্রিক পরিবেশ ভালো থাকলে মৎস্যজীবীদের জীবিকাই যে দীর্ঘমেয়াদে সুরক্ষিত থাকবে, তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়।
কর্মসূচি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে জেলা প্রশাসনের এক প্রশাসনিক আধিকারিক জানান, 'ফারাক্কা সংলগ্ন গঙ্গা নদী আমাদের জাতীয় সম্পদ। কড়া আইন বা সরকারি নজরদারি চালিয়ে রাতারাতি নদী বা মাছ রক্ষা করা সম্ভব নয়, যদি না স্থানীয় মানুষ এতে সামিল হন। নদীপাড়ের মানুষ এবং মৎস্যজীবীরা সচেতন হলেই গঙ্গার এই ঐতিহ্য আবার ফিরে আসবে।'
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মৎস্যজীবী ও নদীতীরবর্তী সমস্ত সাধারণ মানুষের কাছে যৌথভাবে আবেদন জানানো হয়েছে, তারা যেন সরকারি নির্দেশিকা ও টেকসই মৎস্য আহরণ পদ্ধতি মেনে চলেন। প্রাকৃতিক এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং গঙ্গার বাস্তুতন্ত্র সুরক্ষায় সবাইকে একযোগে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে প্রশাসন।

