নিউজ বাজার২৪ , প্রযুক্তি ডেস্ক: গত কয়েক বছরে স্মার্টফোনের দুনিয়ায় প্লাস্টিকের ফিজিক্যাল বা সাধারণ সিম কার্ডের জায়গায় 'ই-সিম' (eSIM) বা এমবেডেড সিমের জনপ্রিয়তা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এখনকার প্রায় প্রতিটি প্রিমিয়াম এবং মিড-রেঞ্জের স্মার্টফোনে এই ইন-ব্লিট সিমের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
আর অনেকেই নতুন প্রযুক্তিকে বেছে নিতে এই 'ই-সিমের' প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করছে। আর এর ফলে ই-সিমের এই রমরমা বাজারের মধ্যে বহু স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর মনেই একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—ই-সিম ব্যবহার করলে কি ইন্টারনেটের স্পিড সাধারণ সিমের চেয়ে বেশি পাওয়া যায়? এটি কি সত্যিই ট্র্যাডিশনাল সিমের চেয়ে ভালো অপশন? আসুন আজ এই বিষয়ে সমস্ত ধোঁয়াশা দূর করা যাক।
তবে সবার আগে আলোচনা করা যাক ই-সিম কি ? এই সিমের সাথে ফিজিক্যাল সিমের তফাৎ কি ? কারন ই সিম সম্পর্কে না জানলে এই প্রতিবেদন টি হয়ত বুঝতে অসুবিধা হবে । তাই এই বিষয়ে আলোচনা করা যাক-
প্রকৃতপক্ষে ই-সিম হলো আমাদের চেনা ফিজিক্যাল সিম কার্ডের একটি ডিজিটাল সংস্করণ বা ভারচুয়াল কোড। অর্থাৎ, এটি কোনো প্লাস্টিকের টুকরো নয়, বরং ভার্চুয়াল উপায়ে ডিভাইসটিকে সনাক্ত করে নেটওয়ার্ক সংযোগ প্রদান করে। এটি সম্পূর্ণ সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রোগ্রাম করা হয় এবং নতুন প্রজন্মের আধুনিক স্মার্টফোনগুলিতে এটি বেশি দেখা যায়।
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, ই-সিম কেনার জন্য আপনাকে কোনো মোবাইল রিটেইলার বা দোকানে যেতে হবে না। এটি আকারে অত্যন্ত ছোট এবং ফোনের মাদারবোর্ডের ভেতরেই এমবেড বা ইন-বিল্ট থাকে। স্মার্টফোন ছাড়াও ট্যাবলেট, স্মার্টওয়াচ, ড্রোন এবং আধুনিক প্রযুক্তির গাড়িতেও এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বলা বাহুল্য, অনুমান করা হচ্ছে আগামিতে ফিজিক্যাল সিমের ব্যবহার বন্ধ হয়ে যাবে।
ডিজিটাল দুনিয়ায় ই-সিম ব্যবহার করার একাধিক অসাধারণ সুবিধা রয়েছে, যা সাধারণ সিম কার্ডে পাওয়া অসম্ভব:
হারানো বা নষ্ট হওয়ার ভয় নেই: যেহেতু এটি ফোনের ভেতরেই ইনস্টল করা থাকে, তাই এটি শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা হারিয়ে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনাই থাকে না।
অনবদ্য নিরাপত্তা: ই-সিম সম্পূর্ণ নিরাপদ। অপরাধমূলক কাজের জন্য প্লাস্টিক সিমের মতো ই-সিম কখনো ক্লোন বা নকল করা সম্ভব নয়।
একাধিক প্রোফাইল স্টোরেজ: সবচেয়ে ভালো দিক হলো, একটি ই-সিমে ৩ থেকে ৫টি পর্যন্ত সেলুলার প্রোফাইল বা আলাদা নম্বর সংরক্ষণ করে রাখা যায়। ব্যবহারকারী ফোনের নেটওয়ার্ক সেটিং থেকে সরাসরি যেকোনো নেটওয়ার্কে পলকের মধ্যে সুইচ করতে পারেন।
ভ্রমণকারীদের জন্য সেরা: বিদেশে বা অন্য রাজ্যে বেড়াতে গেলে ই-সিম দারুণ কাজে আসে। বারবার নতুন জায়গায় গিয়ে আলাদা সিম কেনার ঝামেলা নেই, ফোন থেকেই কিউআর (QR) কোড স্ক্যান করে খুব কম খরচে স্থানীয় অপারেটরের নেটওয়ার্ক চালু করে নেওয়া যায়।
বর্তমানে মূলত অ্যাপল (Apple) এবং স্যামসাং (Samsung) কোম্পানির প্রিমিয়াম ও দামি ফোনেই ই-সিমের এই অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলি বেশি দেখতে পাওয়া যায়।
সুবিধা তো অনেক, কিন্তু এর অসুবিধাগুলি কী কী?
ই-সিমের যেমন দারুণ কিছু সুবিধা রয়েছে, তেমনই কিছু অসুবিধাও রয়েছে যা এড়িয়ে যাওয়া যায় না:
জরুরি অবস্থায় সমস্যা: হঠাৎ আপনার ফোনটি হাত থেকে পড়ে বন্ধ হয়ে গেলে বা নষ্ট হয়ে গেলে, আপনি ফিজিক্যাল সিমের মতো এটি খুলে অন্য ফোনে চট করে লাগাতে পারবেন না।
ডিভাইস পরিবর্তন করা কঠিন: খুব কম ফোনেই ই-সিম সাপোর্ট করে। তাই হঠাৎ অন্য কোনো সাধারণ ডিভাইসে আপনার নম্বরটি স্থানান্তর করা একপ্রকার অসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। এর জন্য পুনরায় অপারেটরের মাধ্যমে ডিজিটাল অ্যাক্টিভেশন প্রসেস ফলো করতে হয়, যা বেশ সময়সাপেক্ষ।
ই-সিম ব্যবহার করলে কি ইন্টারনেট বেশি ফাস্ট চলে?
খুব সহজ ভাষায় বলতে গেলে—না, ই-সিম ব্যবহার করার কারণে ইন্টারনেটের স্পিডে কোনো অলৌকিক তফাত বা বৃদ্ধি ঘটে না। ইন্টারনেটের স্পিড সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে আপনার এলাকার নেটওয়ার্ক কভারেজ, টেলিকম অপারেটর (যেমন জিয়ো, এয়ারটেল বা ভোডাফোন), ৪জি বা ৫জি-র প্রাপ্যতা এবং আপনার আশেপাশের নেটওয়ার্ক ট্রাফিকের ওপর।
ধরা যাক, একই কোম্পানির একটি ফিজিক্যাল সিম এবং একটি ই-সিম পাশাপাশি দুটি একই ফোনে ব্যবহার করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে দুটিতেই ডেটা ডাউনলোডিং এবং আপলোডিং স্পিড একদম সমান মিলবে।
তবে প্রযুক্তিগত দিক থেকে একটি সুবিধা রয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে যে, ই-সিমের ডিজিটাল কোডিং ব্যবস্থার কারণে নেটওয়ার্ক সুইচিং এবং প্রোফাইল ম্যানেজমেন্ট অনেক দ্রুত ও সহজ হয়। ফলে ব্যবহারকারী কিছুটা স্থিতিশীল বা বেটার কানেক্টিভিটি অনুভব করতে পারেন। কিন্তু তার সাথে ইন্টারনেটের মূল গতির সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই।
ই-সিম ব্যবহারের আসল সুবিধাগুলি কী কী?
ই-সিম আসলে ফোনের মাদারবোর্ডের ভেতরেই আগে থেকে বিল্ট-ইন বা বসানো থাকে। অর্থাৎ, এটি বাইরে থেকে ফোনে ঢোকাতে বা বের করতে হয় না। এর প্রধান সুবিধাগুলি হলো:
হারিয়ে যাওয়ার ভয় নেই: সিম কার্ড ড্যামেজ হওয়া বা ফোন থেকে খুলে হারিয়ে যাওয়ার কোনো টেনশন থাকে না।
একাধিক প্রোফাইল: একটি মাত্র ফোনে একাধিক ই-সিম প্রোফাইল সেভ করে রাখা যায়। ফলে এক অপারেটর থেকে অন্য অপারেটরে সুইচ করা এক ক্লিকেই সম্ভব।
ফোনের নিরাপত্তা: ফোন চুরি হয়ে গেলেও চোর আপনার সিম কার্ডটি খুলে ফেলে দিতে পারবে না, ফলে ফোন ট্র্যাক করা সহজ হয়।
যদি আপনার স্মার্টফোনটিতে ই-সিমের সাপোর্ট থাকে এবং আপনি বারবার সিম খোলার ঝামেলা থেকে মুক্তি চান, তবে আপনার জন্য ই-সিম একটি অত্যন্ত আধুনিক ও দুর্দান্ত বিকল্প।
অন্যপক্ষে, আপনি যদি ঘনঘন মোবাইল ফোন পরিবর্তন করতে ভালোবাসেন অথবা প্রয়োজনের সময় নিজের সিমটি খুলে সহজেই অন্য কারোর ডিভাইসে ব্যবহার করতে চান, তবে ফিজিক্যাল বা প্লাস্টিক সিমই এখনো পর্যন্ত আপনার জন্য সেরা এবং সবচেয়ে সুবিধাজনক মাধ্যম।

