নয়াদিল্লি : বিশ্বজুড়ে বাড়তে রাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝে সবচেয়ে বড় আশঙ্কার বিষয় হল- যদি বিশ্বের দুই বৃহত্তম শক্তি, আমেরিকা ও চিনের মধ্যে সরাসরি সংঘাত শুরু হয়, তাহলে কী হতে পারে? এই সম্ভাবনাকেই অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে উল্লেখ করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।
এক সাক্ষাৎকারে লারা লি ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে রুবিও বলেন, "God forbid" (ঈশ্বর যেন এমন না করেন) এবং "Catastrophic" (ভয়াবহ ধ্বংসাত্মক)- এই শব্দগুলো ব্যবহার করে তিনি স্পষ্ট করেন যে, আমেরিকা ও চিনের মধ্যে যুদ্ধ হলে তার পরিণতি হবে ভয়ঙ্কর।
রুবিওর বক্তব্য অনুযায়ী, "ঈশ্বর না করুন, কখনও যেন আমেরিকা ও চিনের মধ্যে যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয় কারণ এমন সংঘাত সামরিক হোক বা অর্থনৈতিক- উভয় ক্ষেত্রেই তা ভয়াবহ ধ্বংস ডেকে আনবে।"
তিনি আরও ইঙ্গিত দেন, বর্তমান বিশ্বে অর্থনৈতিক, সামরিক ও কৌশলগত দিক থেকে আমেরিকা ও চিনই সবচেয়ে শক্তিশালী দুই দেশ। তাই এই দুই শক্তির মধ্যে যে কোনও ধরনের সংঘাত শুধু দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বিশ্ব অর্থনীতি, বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
চিনের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ কেন চায় না আমেরিকা? বড় কারণ জানালেন বিশেষজ্ঞরা
বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, আমেরিকা ও চিন প্রায় প্রতিটি আন্তর্জাতিক ইস্যুতেই একে অপরের মুখোমুখি অবস্থান নেয়। কখনও তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে, আবার কখনও দক্ষিণ চিন সাগর (South China Sea) নিয়ে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা চরমে ওঠে।
তবে বাস্তবে আমেরিকা কোনওভাবেই চিনের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ চায় না। কারণ, বিশ্বের অন্যতম সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি হওয়া সত্ত্বেও চিনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়ানোর আগে ওয়াশিংটনকে বহুবার ভাবতে হয়।
এর পেছনে রয়েছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কারণ-
দুই দেশই বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির মধ্যে অন্যতম, ফলে যুদ্ধ হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগতে পারে। সামরিক শক্তির ভারসাম্য আগের তুলনায় অনেক বদলেছে। চিনের আধুনিক নৌবাহিনী, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আমেরিকার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তাইওয়ান ও দক্ষিণ চিন সাগরের মতো স্পর্শকাতর অঞ্চল থেকে সংঘাত দ্রুত বৃহত্তর যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ হলে বিশ্ব বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আমেরিকা ও চিনের যুদ্ধের আশঙ্কা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন সংঘাত শুরু হলে তার প্রভাব শুধু এই দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং পুরো বিশ্বই বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।
দুই দেশই পরমাণু শক্তিধর
আমেরিকা ও চিন-দুই দেশই পরমাণু শক্তিধর। যদি দুই দেশের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ শুরু হয়ে তা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তাহলে তা শুধু জয়-পরাজয়ের প্রশ্ন থাকবে না, বরং মানবসভ্যতার জন্যই মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
এ ধরনের পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক কৌশলগত ভাষায় 'Mutually Assured Destruction (MAD)' বলা হয়। অর্থাৎ, পারমাণবিক যুদ্ধে কোনও পক্ষই প্রকৃত অর্থে বিজয়ী হতে পারে না-উভয় পক্ষই ভয়াবহ ধ্বংসের মুখে পড়ে।
অর্থনীতির গভীর নির্ভরশীলতা
বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চিনের অর্থনীতি পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। আমেরিকার বাজারে বিক্রি হওয়া অসংখ্য পণ্য চীনে তৈরি। আবার চীনের কাছে রয়েছে মার্কিন সরকারের বিপুল পরিমাণ ট্রেজারি বন্ড।
যদি দুই দেশের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ শুরু হয়, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধাক্কা খাবে, সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি ব্যাপকভাবে বেড়ে যেতে পারে। কোনও দেশই ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের অর্থনীতিকে এমন ঝুঁকির মুখে ফেলতে চায় না।
অতীতের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা
ভিয়েতনাম যুদ্ধ, ইরাক ও আফগানিস্তানের মতো দীর্ঘ সংঘাত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ব্যয়বহুল ও কঠিন অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। হাজার হাজার সেনার প্রাণহানি এবং বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছিল দেশটিকে।
বিশ্লেষকদের মতে, চিনের মতো সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিধর দেশের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ সেই অভিজ্ঞতার তুলনায় আরও অনেক বেশি জটিল ও বিপজ্জনক হতে পারে।
চিনের 'হোম অ্যাডভান্টেজ'
তাইওয়ান ও দক্ষিণ চীন সাগর চীনের ভৌগোলিক অবস্থানের খুব কাছাকাছি। ফলে ওই অঞ্চলে চিনের নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, বিমানঘাঁটি, নৌবাহিনী ও স্বল্প-পাল্লার অস্ত্র ব্যবস্থার বড় সুবিধা রয়েছে। অন্যদিকে, আমেরিকাকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূর থেকে সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করতে হবে, যা সামরিক দিক থেকে বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধের প্রভাব
সম্ভাব্য সংঘাত শুধু যুদ্ধেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে এতে সাইবার হামলা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), মহাকাশ প্রযুক্তি ও স্যাটেলাইট ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট পরিষেবা ব্যাহত হতে পারে, স্যাটেলাইট যোগাযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খল (Global Supply Chain) ভেঙে পড়তে পারে।

