কলকাতা:গত বুধবার বোধহয় ছিল সাম্প্রতিক অতীতে বঙ্গ রাজনীতির সবচেয়ে ঘটনাবহুল একটা দিন। ঐতিহাসিক দিন। যেদিন নির্বাচনী পরাজয়ের এক মাসের মধ্যে ভেঙে খান খান হয়ে গেল তৃণমূল। গত বুধবারি তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষের মন্তব্যে তৈরি হয়েছিল আরেক জল্পনা। তৃণমূল নেতা জানিয়েছিলেন, কলকাতা পুরসভার মেয়র পদ থেকে ইস্তফা দিতে চলেছেন ফিরহাদ হাকিম।
তাঁকে অনুমতি দিয়ে দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পরে যদিও ফিরহাদ স্পষ্ট জানান, কুণাল ঘোষ কী বলেছেন তিনি জানেন না, তিনি আপাতত ইস্তফার কথা ভাবছেন না।
এর আগে কলকাতার একাধিক বরো চেয়ারম্যান এবং মেয়র পারিষদ ইস্তফা দিয়েছেন। কাউন্সিলরদেরও একটা বড় অংশ বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিল বলেও জল্পনা করা হচ্ছিল, এবার মেয়রের ইস্তফা নিয়ে প্রবল জল্পনা শুরু হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, Municipal act 1980 অনুযায়ী মেয়র পদত্যাগ করলে কলকাতা পুরসভার চেয়ারম্যানের কাছে তাঁর পদত্যাগ পত্র দিতে হবে। যদি তিনি অনুপস্থিত থাকেন তবে সেই পদত্যাগ পত্র দিতে হবে পুর কমিশনারের কাছে।
এই জল্পনার মধ্যেই এবার দীর্ঘ পোস্ট করেছেন রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। এদিনের পোস্টে অগ্নিমিত্রা লেখেন, 'কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিমের পদত্যাগ, পাশাপাশি প্রাক্তন শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত একাধিক কাউন্সিলর ও জনপ্রতিনিধির অনুপস্থিতি, জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা ও রাজনৈতিক দায়িত্ববোধ নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
জনপ্রতিনিধির পদ কেবল ক্ষমতার আসন নয়; এটি মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখার এক গুরুদায়িত্ব, বিশেষত সংকটের সময়ে। আজ কলকাতা এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বর্ষার আসার সঙ্গে সঙ্গে জলজমা, নিকাশি ব্যবস্থার দুর্বলতা, জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত উদ্বেগ, রাস্তার রক্ষণাবেক্ষণ এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার মতো চিরাচরিত সমস্যাগুলি আবারও সামনে আসছে। এমন সময়ে নাগরিকরা তাঁদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পাশে আশা করেন-যাঁরা তাঁদের সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসবেন এবং নাগরিক পরিষেবার স্বাভাবিক কার্যক্রম নিশ্চিত করবেন।''
অগ্নিমিত্রার অভিযোগ, 'কিন্তু তার পরিবর্তে মানুষ যা দেখেছে, তা হল দায়িত্ব থেকে একযোগে সরে দাঁড়ানোর প্রবণতা। রাজনৈতিক মতপার্থক্য কিংবা নির্বাচনী পরাজয় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনকে অজুহাত করে প্রশাসনিক দায়িত্ব পরিত্যাগ করা কখনও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। রাজনৈতিক আনুগত্য এবং জনসেবার দায়িত্ব-এই দুইয়ের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। রাজনৈতিক ভাগ্য পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু নাগরিকদের প্রতি দায়িত্ব কখনও বদলায় না'।
রাজ্যের মন্ত্রীর কথায়, ''যে সময়ে কলকাতার স্থিতিশীল নেতৃত্বের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি, সেই সময় নাগরিক দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক বার্তা বহন করে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে জনকল্যাণের চেয়ে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মানুষ তাঁদের ভোট দিয়ে এই প্রতিনিধিদের নির্বাচিত করেছিলেন এই প্রত্যাশায় যে তাঁরা পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করবেন, কর্তব্যে অবিচল থাকবেন এবং রাজনৈতিক পরিবর্তন সত্ত্বেও শহরের উন্নয়নে কাজ করে যাবেন।''
অগ্নিমিত্রার কথায়, ''শহর এগোবে। উন্নয়নও চলবে। জনসেবাও অব্যাহত থাকবে। তবে এই ঘটনা আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয় যে নির্বাচিত পদ মূলত জনগণের অর্পিত একটি বিশ্বাসের প্রতীক। আর সেই বিশ্বাসের সঙ্গে এমন কিছু দায়িত্ব জড়িয়ে থাকে, যা অসুবিধাজনক হয়ে উঠলেই সরিয়ে রাখা যায় না।''

