পটনা:এক কথায় বলতে গেলে, নেপালের বন্যা থেকে বিহারের জন্য যে অদ্ভুত খবরটি এসেছে, তা হল সেই মাছটিকে নিয়ে, যাকে 'মানুষখেকো' বলা হয়। বিহার সরকার পর্যন্ত সতর্কবার্তা জারি করেছে। তাই বিষয়টি যে সত্যিই গুরুতর, তা বলাই যায়। বন্যার জল এখানে পৌঁছতেই বিভিন্ন জায়গা থেকে খবর আসতে শুরু করে যে মানুষজন অবাক হয়ে যাচ্ছেন, কারণ ১০০-১০০ কেজি ওজনের মাছ এসে পড়েছে।
১০০ কেজির মাছ, একবার ভেবে দেখুন! কিন্তু তারপরেই এল সতর্কবার্তা-এই মাছ ধরবেন না, খাওয়ার কথা তো ভাববেনই না। নেপালের রাসুয়া এলাকায় হঠাৎ হড়পা বান হয়, পাহাড় ধসে জল নেমে আসে। ভয়ঙ্কর সেই জলোচ্ছ্বাস ত্রিশূলী থেকে নারায়ণী হয়ে ভারতের গণ্ডক নদীতে ঢুকে পড়ে। আর সেই জলের সঙ্গে কাঠ ভেসে আসে, গ্যাস সিলিন্ডার ভেসে আসে, ধ্বংসাবশেষ ভেসে আসে, এমনকি মৃতদেহও ভেসে আসার খবর পাওয়া যায়। আর তার সঙ্গে আসে বড় বড় মাছ!
গোপালগঞ্জের মঙ্গলপুর ঘাটে, বগহায়, বাল্মীকিনগরে মৎস্যজীবীরা হতবাক হয়ে যান। কোনওটি ১৫ কেজির, কোনওটি ২৭ কেজির, কোনওটি ৪০ কেজির, কোনওটি ৪৫ কেজির। আবার কিছু মানুষ তো ৯০ কেজি এবং ১০০ কেজি পর্যন্ত ওজনের মাছ আসার দাবিও করেন। নেপালের বন্যা উজানের নদীগুলির গভীর তলদেশ থেকে বিশাল মাছগুলিকে তুলে এনে বিহারের সমতল এলাকায় ঠেলে দিয়েছে। মৎস্যজীবীরা সেগুলি ধরতে শুরু করেন, ওজন করতে শুরু করেন, বাজারে বিক্রি করতে শুরু করেন। কিন্তু এরপরই সরকার সতর্কবার্তা জারি করে। বিহারের ডেয়ারি, মৎস্য ও পশুসম্পদ দফতর স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, বন্যার জলের সঙ্গে আসা এই অচেনা ও অদ্ভুত মাছ খাবেন না, কিনবেন না, বিক্রিও করবেন না।
কেন? কারণ এই মাছটির নাম 'গুঁছ'। একে 'গোইতা' বলেও ডাকা হয়। আবার বাঘড় নামেও পরিচিত। 'বাঘড়' নামটি এসেছে বাঘ থেকেই। অর্থাৎ এটিকে জলের বাঘ বলেও মনে করা হয়। এর বৈজ্ঞানিক নাম 'বাগেরিয়াস ইয়ারেল্লি'। মানুষ একে 'ডেভিল ক্যাটফিশ', 'নদীর রাক্ষস', এমনকি 'জলের দানব'ও বলে। অর্থাৎ এটি সাধারণ রুই-কাতলার মতো মাছ একেবারেই নয়। এটিকে স্রোতস্বিনী হিমালয়ের নদীর শিকারি মাছ হিসেবে মনে করা হয়। এটি মাংসাশী মাছ। ছোট মাছ খায়, ব্যাঙ খায়, কাঁকড়া খায়, চিংড়ি খায় এবং জলের বিভিন্ন ধরনের প্রাণীও খায়। এটি দু'মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। ৭০-৮০ কেজি ওজন হওয়া খুবই স্বাভাবিক, কখনও কখনও এর থেকেও বেশি ওজনের হয়।
দেখতে কেমন এই দানবের মতো মাছ?
দেখতেই মাছটিকে বেশ ভয়ঙ্কর লাগে। মাথা চওড়া এবং চ্যাপ্টা, যেন উপর থেকে কেউ সেটিকে চেপে দিয়েছে। মুখ খুব বড়, দাঁত পিছনের দিকে বাঁকানো এবং বেশ ধারালো-একবার আটকে গেলে যেন আর ছাড়ে না। এর চার জোড়া গোঁফের মতো শুঁড় ঝুলতে থাকে। আসলে এই শুঁড়গুলি এর সেন্সর হিসেবে কাজ করে, যা নোংরা জলেও শিকারকে শনাক্ত করতে সাহায্য করে। শরীর লম্বা, সামনের দিক মোটা এবং পিছনের দিক সরু। শরীরের গায়ে বাদামি, হলুদ ও সবুজ রঙের ছোপ থাকে। এর সাহায্যে নদীর গভীরে পাথরের মধ্যে লুকিয়ে থেকে ঘাপটি মেরে শিকার করে। পেট সাদা। আর এর চামড়ায় খসখসে আঁশের মতো একটি স্তর থাকে। অর্থাৎ দেখতে ভয়ঙ্কর, খুবই ভয়ঙ্কর, রীতিমতো আতঙ্কজনক।
বন্যার পর এই মাছ সেখান থেকে এসেছে। কারণ গুঁছ মাছ পাহাড়ের উপরের নদীগুলির গভীর তলদেশে থাকে। উপর দিয়ে প্রবল স্রোত বয়ে চলে, আর এটি জলের নিচে নদীর তলদেশে থাকে। এর জন্য অক্সিজেনসমৃদ্ধ দ্রুত প্রবাহিত জল প্রয়োজন। সমতলের শান্ত নদী এর বাসস্থান নয়।
কীভাবে নেপাল থেকে বিহারে এল এই মাছ:
কিন্তু যখন বন্যার ভয়াবহ স্রোত আসে, যখন পাহাড় ভেঙে জল নীচের দিকে ছুটে আসে, তখন মাছটি নদীর তলদেশ থেকে উপড়ে যায়। স্রোতের টানে সেটি ভেসে যায়, আর অনেক মাছ পথেই মারা যায়। মৎস্যজীবীরাই বলছেন, বেশিরভাগ মাছই আগে থেকেই মৃত অবস্থায় ভেসে আসছে। তাই এই মাছ বন্যার সঙ্গেই এসেছে, তার আগে আসেনি। বন্যা তাকে তার বাসস্থান থেকে বের করে সমতল এলাকায় এনে ফেলেছে।
আর মৎস্যজীবীদের হাতে হঠাৎ এত বড় মাছ এসে পড়ায় তাঁরা দেখলেন, ওজন যত বেশি, দামও তত বেশি। কুইন্টালের পর কুইন্টাল মাছ জমতে শুরু করেছে। খবর আসছে, এর মধ্যে কিছু মাছ পশ্চিমবঙ্গের বাজারগুলিতেও পাঠানো হচ্ছে।
কিন্তু সরকার সতর্কবার্তা জারি করেছে। কারণ প্রথমত, এই মাছ বন্যার নোংরা জলের সঙ্গে ভেসে এসেছে। সেই জলে বিভিন্ন ধরনের মৃত প্রাণী থাকার আশঙ্কা রয়েছে। ধ্বংসাবশেষ তো রয়েছেই। আর এটি একটি মাংসাশী মাছ। ফলে এর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস এবং ছত্রাক থাকার আশঙ্কাও রয়েছে।

