কলকাতা:লেখিকা রাখি চট্টোপাধ্যায়ের লেখা সম্প্রতি বই প্রকাশিত হল কলকাতার অক্সফোর্ড বুক স্টোরে। 'কিলোনসুফলন: দ্য লস্ট সিটি অফ শশাঙ্ক'- সুবর্ণযুগের ৫০০০ বছরের ইতিহাস বইয়ের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। বুধবার সেই বইয়ের উদ্বোধন হল। অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী ড.
শঙ্কর ঘোষ। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন মানব গুহ, জয়দীপ সেন, অরিত্র চট্টোপাধ্যায়, সুদীপ্ত গুহ এবং ঝন্টু বড়াইক প্রমুখ ।
রাখি চট্টোপাধ্যায়ের সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট, ''ইতিহাসের নির্মাণপ্রক্রিয়ায় লোককথার ভূমিকা অনস্বীকার্য। যে কর্ণসুবর্ণের প্রসঙ্গ আজ লিখছি, তার সঙ্গে লোকবিশ্বাস কালের গণ্ডি পেরিয়ে আমাদের মহাভারতের যুগে নিয়ে যায়। জনশ্রুতি অনুযায়ী, মহাভারতের অঙ্গরাজ কর্ণ গৌড়দেশের কর্ণসুবর্ণেই তাঁর রাজধর্মের কেন্দ্র স্থাপন করেছিলেন। এমনকি, কর্ণের নামানুসারেই নাকি এই জনপদের নামকরণ-কর্ণসুবর্ণ। এখানেই ইতিহাস ও কিংবদন্তির লোক উপাখ্যান আশ্চর্য সেতু বন্ধন করে। লোকপরম্পরায় আরও এক বর্ণনা আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বলা হয়ে থাকে, বনবাসকালে পাণ্ডবরাও এই ভূখণ্ড অতিক্রম করেছিলেন। কর্ণসুবর্ণ সংলগ্ন রাক্ষসীডাঙ্গা নামক স্থানে সংঘটিত হয় ভীম ও হিড়িম্বা রাক্ষসীর সেই স্মরণীয় অভিসার। কাহিনির ধারাবাহিকতায় জানা যায়, ভীমের সঙ্গে তুমুল মল্লযুদ্ধে হিড়িম্বার সহোদর হিড়িম্বর পরাজয়ের পর তার মস্তক ছেদন করে, দেহ রাক্ষসীডাঙ্গায় সমাহিত করা হয়, মাথাটি অন্যত্র পুঁতে দেওয়া হয়। এই বিবরণ প্রজন্মান্তরে লোকমুখে প্রবাহিত হয়ে আজ সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ হিসেবে টিকে আছে। অবশ্য একথা সমর্থনের জন্য যে তথ্য প্রয়োজন, তার হদিস দেওয়া অন্তত এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে সম্ভব নয়।
চিনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং :
৬৩৮ খ্রিস্টাব্দ, হিউয়েন সাং (Xuanzang), পৌঁছলেন কর্ণসুবর্ণে, গৌড়ের রাজা শশাঙ্কের মৃত্যুর( ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দ ) ঠিক অব্যবহিত পরই। তিনি যখন তাম্রলিপ্তি (তামলুক) থেকে কর্ণসুবর্ণে যান, তখন গৌড়ে চলছিল রাজনৈতিক ক্ষমতার রূপান্তর। পরিব্রাজক হিউয়েন সাং তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্ত 'জিউ জি'-তে কর্ণসুবর্ণের উল্লেখ করেছেন 'কিলোনসুফলন' নামে, এবং সেই বর্ণনায় যা পাওয়া যায় তা হল- কর্ণসুবর্ণ ছিল আয়তনে সুবিস্তৃত ও জনসমাগমে সমৃদ্ধ এক প্রাচীন মহানগর। কর্ণসুবর্ণের অধিবাসীরা অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল এবং জ্ঞানচর্চায় অনুরক্ত ছিল; বিদ্যাবুদ্ধির প্রতি তাদের আকর্ষণ ছিল লক্ষণীয়। এখানকার জনগণ নৈতিক চরিত্রে উন্নত, শালীনতা ও সদাচরণে অভ্যস্ত। পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে দশটি বৌদ্ধ বিহার বিদ্যমান ছিল, যেখানে প্রধানত বৌদ্ধ সম্প্রদায়ভুক্ত ভিক্ষুগণ বসবাস ও ধর্মচর্চা করতেন। পাশাপাশি এখানে প্রায় পঞ্চাশটি দেবমন্দিরও ছিল, একেবারে ওয়েল প্ল্যানড আরবান সেক্টর।
কর্ণসুবর্ণের কাছেই ছিল রক্তমৃত্তিকা মহাবিহার, যা ছিল একটি মেজর বুদ্ধিস্ট লার্নিং সেন্টার। 1960s-এ মুর্শিদাবাদ জেলার যদুপুর গ্রামে (কর্ণসুবণের অদূরে) Archaeological Excavation-এর মাধ্যমে এই বৌদ্ধ বিহার বা মনেস্ট্রি-র ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়। পাওয়া যায় Terracotta Plaques, Inscriptions এবং বিভিন্ন Buddhist Symbols। স্থানীয় লোক প্রচার অনুযায়ী, এই এলাকাকে রাজা কর্ণের প্রসাদ বলেও ধরা হতো- যা এখনো মানুষকে হতচকিত করে।
রাজা শশাঙ্ক:
সাল ৫৯০ খ্রিষ্টাব্দ, ষষ্ঠ শতকে গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর, উত্তর-পূর্ব ও পূর্ব ভারতে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়, গৌড়ের স্বাধীন রাজতন্ত্রের সূচনা করেন শশাঙ্ক। থানেশ্বরে তখন সম্রাট হর্ষবর্ধনের রাজত্ব। হর্ষবর্ধনের রাজ্যাভিষেকের অব্যবহিত পরেই গৌড়াধিপতি শশাঙ্কের বিরুদ্ধে, বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের এক সুসংগঠিত ষড়যন্ত্র সূচিত হয়। শশাঙ্ক কর্তৃক পরাজিত কামরূপের রাজপুত্র ভাস্করবর্মা এই সুযোগে থানেশ্বরের সঙ্গে মৈত্রী স্থাপনে আগ্রহী হয়ে যৌথভাবে গৌড় আক্রমণে প্রবৃত্ত হন। তথাপি ধারাবাহিক আক্রমণ সত্ত্বেও শশাঙ্ক দীর্ঘকাল অপরাভূত অবস্থান বজায় রাখতে সক্ষম হন।
তবে অবিরাম সামরিক সংঘর্ষের অভিঘাতে শশাঙ্ক আর্থিক সংকটে নিপতিত হন, ইকোনমি অনেকটা আনস্টেবল হয়- যার প্রত্যক্ষ প্রতিফলন হলো তাঁর মুদ্রায় ক্রমবর্ধমান রৌপ্যাংশের উপস্থিতি।
এবার আসি তার বংশবিবরণীতে। শশাঙ্কের বংশপরিচয় প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক তথ্য অত্যন্ত দুর্লভ; সে খোঁজ করতে গেলে হাত প্রায় নিঃস্বই থেকে যায়। তার মুদ্রা ও কয়েকটি শিলালিপি ব্যতীত নির্ভরযোগ্য উপাদানের প্রায় সম্পূর্ণ অভাব লক্ষ্য করা যায়। গৌড় রাজবংশের এই রাজনৈতিক রহস্যময় অধ্যায় ইতিহাসের পর্দার অন্তরালেই রয়ে গেছে।
তার মুদ্রা থেকে যতটুকু তথ্য আহরণ করা যায়, তাতে দেখা যায়- এক পৃষ্ঠে কমলাত্মিকা মূর্তি ও গুপ্তযুগীয় রীতিতে উৎকীর্ণ রাজনাম, যা গুপ্ত মুদ্রাশৈলীর সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। যদিও গুপ্তসম্রাটগণ ভাগবত মতাবলম্বী ছিলেন, শশাঙ্ক ছিলেন শৈব, তার প্রমাণ মেলে তাঁর মুদ্রায় 'বৃষভবাহন মহাদেবের' প্রতীকচিহ্নে।
যশোরের মোহাম্মদপুর-সহ বিভিন্ন স্থানে প্রাপ্ত মুদ্রার একপৃষ্ঠে উৎকীর্ণ নামকে কোনো কোনো পণ্ডিত 'নরেন্দ্রাদিত্য' বলে পাঠ করেছেন- যা গুপ্ত সম্রাটদের নামকরণ প্রথার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ, যেমন: চন্দ্রগুপ্ত বিক্রমাদিত্য, মহেন্দ্রাদিত্য, নরসিংহগুপ্ত বালাদিত্য ইত্যাদি।
এই সূত্র ধরে তাকে মহাসেন গুপ্তের পুত্র বা ভাতুষ্পুত্র হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হলেও পরবর্তীকালে ঐতিহাসিকেরা এ মতকে অনুমাননির্ভর ও অগ্রহণযোগ্য বলে অভিহিত করেছেন। ফলে শশাঙ্কের বংশানুক্রম সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়নি। কেবলমাত্র বানভট্টের 'হর্ষচরিত' গ্রন্থেই তাকে 'গৌড়ভুজঙ্গ গৌড়েশ্বর' রূপে চিত্রিত করা হয়েছে, যিনি হর্ষবর্ধনের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা রাজ্যবর্ধনের হত্যাকারী বলে কথিত।
হিউয়েন সাং-কে হর্ষবর্ধনের 'পেইড ক্রনিকাল' হিসেবে ভাবলেও, শশাঙ্ক সম্পর্কে জানার আর সেরকম কোনও উপায় দেখা যায় না।
হিন্দু সুশাসক হিসেবে অবদান:
শশাঙ্ক তাঁর রাজত্বকালে একটি নতুন বর্ষপঞ্জি চালু করেন, যা ইতিহাসে "শশাঙ্কাব্দ" ( খ্রিস্টীয় ৫৯৩/৫৯৪ অব্দ ) নামে পরিচিত। অর্থাৎ বলা যেতে পারে, বঙ্গাব্দ উদযাপনের ঐতিহাসিক ভিত্তি নির্মাণে রাজা শশাঙ্কের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার শাসনামলে হিন্দু আচার, সংস্কৃতি ও কালগণনা পদ্ধতি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পায়। আজও সেই ইতিহাসকে বহন আমরা বহন করি, পালন করি পয়লা বৈশাখ।
অন্যান্য অবদান:
কর্ণসুবর্ণ একাই ইতিহাসের আঁচড় নিয়ে বেঁচে নেই, বেঁচে আছে আরও কিছু সুপ্রাচীন উপান্ত অঞ্চলের কুলীন গ্রাম। রাজধানী শহরের চতুর্দিকে গোবরহাটি, গোকর্ণ, পাঁচথুপি, শক্তিপুর, মহলন্দি প্রভৃতি জায়গায় সমৃদ্ধশালী গ্রামীণ বসতি ছিল, যা আজও বর্তমান প্রাচীন ইতিহাসের স্মারক হিসেবে। একদা এই সমৃদ্ধশালী জনবসতিগুলি, নগরবাসীর দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাত।
এই অঞ্চল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গেও বাণিজ্যিক সম্পর্কে যুক্ত ছিল বলে ধারণা করা হয়। মালয় উপদ্বীপের ওয়েলেসলি অঞ্চল থেকে প্রাপ্ত পঞ্চম শতাব্দীর একটি উৎকীর্ণ লিপিতে রক্তমৃত্তিকা থেকে আগত মহানাবিক বুদ্ধগুপ্তের উল্লেখ পাওয়া যায়, জানা যায় রক্তমৃত্তিকা থেকে মালয় উপদ্বীপগামী একটি বৃহৎ জাহাজের অধিনায়কের কথাও, যা বাংলার সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সামুদ্রিক বাণিজ্যের সম্পর্কের ইতিহাস বহন করে।
সমৃদ্ধি কালের গর্ভে হারায় বারবার। সময় ইতিহাসের বৈচিত্র্যময় অধ্যায়কে বারবার সমাপ্ত করে আপনার মননকে জানান দেয়, সমৃদ্ধি যত বড়ই হোক, কালের নিয়মে তা অন্তহীন ভাঙচুরের পথে একদিন যাত্রা করবেই। একদা সুসমৃদ্ধ রাজনৈতিক, সামরিক ও ধর্মীয় কেন্দ্র কর্ণসুবর্ণের মতো বিলাসবহুল রাজধানীর গৌরবও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। সপ্তম শতাব্দীর শেষের দিকেই কর্ণসুবর্ণ ধীরে ধীরে তার গুরুত্ব হারায় এবং ইতিহাসের আড়ালে মুখ লুকায়। পরবর্তী পাল ও সেন যুগের দলিলে এই নগরের তেমন কোনো উল্লেখ আর পাওয়া যায় না। এখানেই শশাঙ্কের ইতিহাস সমাপ্ত, আজও রহস্যাবৃত, একেবারে 'র্যাপড ইন এনিগ্মা'।''

