কলকাতা: বিধানসভা ভোটে গেরুয়া ঝড়ে কার্যত সাফ হয়ে গিয়েছে তৃণমূল। রাজনীতির ময়দানে দখল হয়েছে নীলবাড়ি অর্থাৎ নবান্ন। এবার ছোট লালবাড়ি (কলকাতা পুরসভা) দখলের পথে বিজেপি। ছাব্বিশের ভোটের ফলাফলের নিরিখে কলকাতা পুরসভার শতাধিক ওয়ার্ডে এগিয়ে পদ্ম শিবির। তবে কি চলতি বছরের ডিসেম্বরেই নতুন মেয়র পেতে চলেছে কলকাতা?
রাজনীতির অলিন্দে এই নিয়েই চলছে জোর গুঞ্জন।
বাংলার রাজধানী কলকাতা। বহু বছর ধরে তৃণমূলের ঘাঁটি। রাজ্যে ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই ঘাসফুলের দখলে ছিল কলকাতা পুরসভা। ২০১০ থেকেই কলকাতা পুরসভা ছিল তৃণমূলের দখলে। তারপর একের পর এক ভোট হয়েছে, কিন্তু তৃণমূলের কলকাতায় দাঁত ফোটাতে পারেনি কোনও দল। সেই ছবিটাই আমূল বদলে গেল ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে। সবুজ কলকাতা এখন বদলে গেরুয়া।
বিধানসভা ভোটে নীলবাড়ি হাতছাড়া হয়েছে। এবার ছোট লালবাড়িও তৃণমূলের হাত ছাড়া হওয়ার পথে। বিধানসভা নির্বাচনের ফলের নিরিখে দেখা যাচ্ছে, কলকাতা পুরসভার দুই তৃতীয়াংশেরও বেশি ওয়ার্ডে এগিয়ে বিজেপি। ক্রমেই জমি হারিয়েছে তৃণমূল।
প্রসঙ্গত, ১৪৪টি ওয়ার্ড নিয়ে কলকাতা পুরসভা। এই ১৪৪টি ওয়ার্ড ছড়িয়ে রয়েছে ১৭টি বিধানসভা কেন্দ্রে। যার মধ্যে কলকাতা শহরের মধ্যে রয়েছে ১১টি আসন। উত্তর ও দক্ষিণ শহরতলি এলাকায় আরও ৬টি কেন্দ্র। বিধানসভা ভোটের ফলের নিরিখে কলকাতার ১৪৪টি ওয়ার্ডের মধ্যে বিজেপি এগিয়ে ১০২টি ওয়ার্ডে। তৃণমূল এগিয়ে ৪২টিতে। যেখানে ২০২১-এর পুরসভা ভোটে তৃণমূল জিতেছিল ১৩৪টি ওয়ার্ডে। বিজেপি জিতেছিল মাত্র ৩টি ওয়ার্ডে
উত্তর কলকাতায় সাতটি বিধানসভা। চৌরঙ্গী, মানিকতলা, বেলেঘাটা, কাশীপুর -বেলগাছিয়া, শ্যামপুকুর, জোড়াসাঁকো ও এন্টালি। এই ৭ বিধানসভায় মোট ৬০টি ওয়ার্ড
এখানে বিজেপি এগিয়ে ৪০টি ওয়ার্ডে, অন্যদিকে তৃণমূল এগিয়ে মাত্র ২০ ওয়ার্ডে। এরই মধ্যে পড়ে মানিকতলা। সাধন পাণ্ডের খাসতালুক। এবার এই কেন্দ্র থেকে প্রার্থী হন তাঁর মেয়ে শ্রেয়া পাণ্ডে। ভোটে দাঁড়ান। বিজেপির কাছে হারেন। মানিকতলার ৮ ওয়ার্ডেই পিছিয়ে তৃণমূল।
একইসঙ্গে, উত্তর কলকাতার শ্যামপুকুরও । আরেকটি হেভিওয়েট কেন্দ্র। ছাব্বিশের ভোটে এই কেন্দ্রে তৃণমূলের প্রার্থী ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী শশী পাঁজা। সেই কেন্দ্রেও ভরাডুবি। শ্যামপুকুর বিধানসভার ১১ ওয়ার্ডেই পিছিয়ে তৃণমূল।
অন্যদিকে, উত্তর কলকাতায় কোনওক্রমে মুখ বাঁচাতে পেরেছে বেলেঘাটা ও চৌরঙ্গি বিধানসভা আসন। সেগুলিতেও সংখ্যালঘু ভোট বেশি এমন ওয়ার্ডেই এগিয়েছিল তৃণমূল। বাকি জায়গাতে নয়। এমনকি মানিকতলা, শ্যামপুকুরের মতো আসনে ১টি ওয়ার্ডেও জিততে পারেনি তৃণমূল ফলে আগামী দিনে উত্তর কলকাতায় পুরসভার ওয়ার্ডগুলিতে মুখ থুবড়ে পড়ার মতো অবস্থা তৃণমূলের।
ছাব্বিশের ভোটের ফলে স্পষ্ট দক্ষিণ কলকাতাতেও মুখ থুবড়ে পড়েছে তৃণমূল। ১০ বিধানসভায় মোট ৮৪টি ওয়ার্ড। বিজেপি এগিয়ে ৬২ ওয়ার্ডে, তৃণমূল এগিয়ে ২২ ওয়ার্ডে। কলকাতার দক্ষিণে যাদবপুর। এবার প্রথম পদ্ম ফুটেছে এই কেন্দ্রে। যাদবপুরের ১০ ওয়ার্ডেই পিছিয়ে তৃণমূল।
দক্ষিণ কলকাতায় তৃণমূলের আরও একটি শক্ত ঘাঁটি হল বেহালা পশ্চিম। এতদিন এখান থেকেই লড়তেন পার্থ চট্টোপাধ্যায়। এই কেন্দ্রেও ভরাডুবি হয়েছে তৃণমূলের। বেহালা পশ্চিমের ১০ ওয়ার্ডেই পিছিয়ে তৃণমূল। যে দক্ষিণ কলকাতাকে তৃণমূলের গড় বলা হতো সেখানে বিধানসভা ভোটে তৃণমূল মুখ বাঁচাতে পেরেছে বালিগঞ্জ ও কলকাতা বন্দরে। যাদবপুরের ১টি ওয়ার্ডেও তাদের জয় নেই, টালিগঞ্জে মাত্র ২টি ওয়ার্ডে, কসবায় ১টি ওয়ার্ডে জয় পেয়েছে এবং তাতে ব্যবধান এত বেশি ছিল যে তার ভিত্তিতে ওই আসনে জয় পেয়েছে তবে যাদপুর ও টালিগঞ্জ হাতছাড়া হয়েছে। কলকাতার প্রাণকেন্দ্র রাসবিহারী। এই বিধানসভা আসনে চমক দিয়েছে বিজেপি। দেবাশিষ কুমারকে হারিয়ে দিয়েছেন স্বপন দাশগুপ্ত। রাসবিহারীর ৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে মাত্র ২টিতে এগিয়ে তৃণমূল। বাকি সাতটিতে এগিয়ে বিজেপি।
প্রসঙ্গত, চলতি বছরের শেষেই কলকাতা পুরসভায় ভোট। ইতিমধ্যেই পুরসভার অন্দরে ডামাডোল পরিস্থিতি। বিদ্রোহী হতে শুরু করেছেন একের পর এক তৃণমূল কাউন্সিলর। ছাব্বিশের ওয়ার্ড ভিত্তিক এই ফলে স্পষ্ট, ছোট লালবাড়ি এবার তৃণমূলের হাতছাড়া হওয়া শুধুমাত্র সময়ের অপেক্ষা।

