কলকাতা:ভারতীয় পরিবারগুলিতে প্রায়শই মনে করা হয়, বাবার মৃত্যুর পর বড় ছেলেই বাবার সমস্ত সম্পত্তি বা সম্পত্তির সিংহভাগের মালিক হয়ে যান। অনেক সময় এই ভুল ধারণা থেকেই পরিবারের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ শুরু হয় এবং শেষ পর্যন্ত বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। অথচ ভারতীয় উত্তরাধিকার আইনে এমন কোনও সাধারণ নিয়ম নেই যে শুধুমাত্র বড় ছেলেই বাবার সমস্ত সম্পত্তি পাবেন।
আসলে সম্পত্তি কীভাবে ভাগ হবে, তা নির্ভর করে সম্পত্তিটি পৈতৃক নাকি স্ব-অর্জিত, মৃত ব্যক্তি কোনও উইল করে গিয়েছেন কি না এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ধর্ম অনুযায়ী কোন উত্তরাধিকার আইন প্রযোজ্য হচ্ছে তার উপর। বিশেষ করে হিন্দু উত্তরাধিকার আইন, ১৯৫৬ এবং ২০০৫ সালের সংশোধনের মাধ্যমে মেয়েদেরও ছেলেদের সমান অধিকার দেওয়া হয়েছে।
বাবার মৃত্যুর পর কি বড় ছেলেই সমস্ত সম্পত্তির মালিক হন?
ভারতে কোনও ধর্মের ক্ষেত্রেই বাবার মৃত্যুর পর শুধুমাত্র বড় ছেলেই তাঁর সমস্ত সম্পত্তির মালিক হয়ে যাবেন-এমন কোনও সরাসরি আইনি বিধান নেই। এটি মূলত একটি সামাজিক ধারণা, আইনের নিয়ম নয়।
কোনও ব্যক্তি যদি উইল না করে মারা যান, তাহলে সংশ্লিষ্ট উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী তাঁর সম্পত্তি সমস্ত বৈধ উত্তরাধিকারীর মধ্যে ভাগ করা হয়।
হিন্দু পরিবারের ক্ষেত্রে স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে এবং মা-সকলেই প্রথম শ্রেণির বা Class-I উত্তরাধিকারী। এই ধরনের পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র বড় ছেলে হওয়ার কারণে কেউ অগ্রাধিকার পান না।
অন্যদিকে, মৃত ব্যক্তি যদি বৈধ উইল করে যান, তাহলে সেই উইল অনুযায়ী সম্পত্তি বণ্টন হবে, যদি উইলটি আইনত বৈধ হয়।
পৈতৃক সম্পত্তি ও স্ব-অর্জিত সম্পত্তির মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে সম্পত্তির অধিকার নির্ধারণের সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলির মধ্যে একটি হল-সম্পত্তিটি পৈতৃক নাকি স্ব-অর্জিত। সাধারণভাবে পৈতৃক সম্পত্তি বলতে এমন সম্পত্তিকে বোঝানো হয়, যা চার পুরুষ ধরে অবিভক্ত অবস্থায় উত্তরাধিকার সূত্রে চলে আসছে। এই ধরনের সম্পত্তিতে সহদায়িকদের (Coparceners) জন্মসূত্রে অধিকার তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে, স্ব-অর্জিত সম্পত্তি হল সেই সম্পত্তি, যা কোনও ব্যক্তি নিজের উপার্জনে অর্জন বা ক্রয় করেছেন।
স্ব-অর্জিত সম্পত্তির মালিক সাধারণত নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী উইলের মাধ্যমে সেই সম্পত্তি কোনও ব্যক্তিকে দিয়ে যেতে পারেন। কিন্তু কোনও উইল না থাকলে প্রযোজ্য উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী সম্পত্তি বণ্টন করা হবে।
তাই পৈতৃক ও স্ব-অর্জিত সম্পত্তির ক্ষেত্রে উত্তরাধিকারের নিয়ম এক নয়।
বাবার সম্পত্তিতে মেয়েদের কী অধিকার রয়েছে?
২০০৫ সালের সংশোধনের পর হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে মেয়েদের ছেলেদের মতোই সহদায়িক বা Coparcener-এর মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। এর অর্থ, পৈতৃক সম্পত্তিতে মেয়েরও জন্মসূত্রে ছেলের সমান অধিকার রয়েছে। মেয়ে বিবাহিত হোন বা অবিবাহিত-বিয়ের কারণে তাঁর এই অধিকার শেষ হয়ে যায় না।
সুপ্রিম কোর্টও তার রায়ে স্পষ্ট করেছে যে আইনের উদ্দেশ্য হল নারী ও পুরুষের মধ্যে সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা করা।
তাই শুধুমাত্র কেউ বড় ছেলে বলে তিনিই সম্পত্তির মালিক হবেন-এই ধারণা আইনসম্মত নয়। সম্পত্তি পৈতৃক হলে মেয়েরও তাতে সমান অধিকার থাকতে পারে।
বাবা কি তাঁর সমস্ত সম্পত্তি শুধুমাত্র একজন ছেলেকে দিয়ে যেতে পারেন?
এই প্রশ্নটিও পরিবারে প্রায়শই উঠে আসে।
সম্পত্তি যদি সম্পূর্ণ ভাবে বাবার স্ব-অর্জিত সম্পত্তি হয়, তাহলে তিনি বৈধ উইলের মাধ্যমে সেই সম্পত্তি কোনও একজন ছেলে, মেয়ে বা অন্য কোনও ব্যক্তিকেও দিয়ে যেতে পারেন।
কিন্তু সম্পত্তি যদি যৌথ পারিবারিক বা পৈতৃক সম্পত্তি হয়, তাহলে সেই সম্পত্তিতে পরিবারের অন্যান্য সহদায়িকেরও অধিকার থাকতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে বাবা একক ভাবে সম্পূর্ণ পৈতৃক সম্পত্তি শুধুমাত্র একজন ছেলের নামে দিয়ে যেতে পারেন না। তাই সম্পত্তির প্রকৃতি অনুযায়ী আইনি অধিকার আলাদা হতে পারে এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রযোজ্য হয় না।
সম্পত্তি নিয়ে বিবাদ এড়াতে কী করবেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে বিবাদ এড়াতে সময় থাকতেই আইনসম্মত ভাবে একটি বৈধ উইল তৈরি করা উচিত।
সম্পত্তি সংক্রান্ত সমস্ত নথি স্পষ্ট এবং আপডেটেড রাখা জরুরি।
সম্পত্তি পৈতৃক হলে সম্ভাব্য সমস্ত অংশীদারের অধিকার সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন।
মৌখিক প্রতিশ্রুতির উপর নির্ভর না করে যথাযথ আইনি নথি তৈরি করে রাখা বেশি নিরাপদ।
আদালত সাধারণত নথিপত্র, প্রযোজ্য আইন এবং মামলার তথ্য ও পরিস্থিতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দেয়-পারিবারিক প্রথা বা প্রচলিত সামাজিক ধারণার ভিত্তিতে নয়।
সম্পত্তি নিয়ে কোনও বিবাদ তৈরি হলে যোগ্য আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত। সঠিক আইনি পরামর্শ ভবিষ্যতে বড় ধরনের সম্পত্তি সংক্রান্ত বিবাদ এড়াতে সাহায্য করতে পারে।
বড় ছেলে মানেই সম্পত্তিতে বেশি অধিকার-আইনের নিয়ম নয়, সামাজিক ধারণা
সব মিলিয়ে বলা যায়, বাবার মৃত্যুর পর বড় ছেলেই সমস্ত সম্পত্তির মালিক হবেন-এটি ভারতীয় আইনের কোনও সাধারণ নিয়ম নয়, বরং একটি প্রচলিত সামাজিক ধারণা।
হিন্দু উত্তরাধিকার আইন, ১৯৫৬ এবং ২০০৫ সালের সংশোধন অনুযায়ী মেয়েদেরও ছেলেদের সমান অধিকার দেওয়া হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত কে কতটা সম্পত্তি পাবেন, তা নির্ভর করবে সম্পত্তিটি পৈতৃক নাকি স্ব-অর্জিত, মৃত ব্যক্তি বৈধ উইল করে গিয়েছেন কি না এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ক্ষেত্রে কোন উত্তরাধিকার আইন প্রযোজ্য হচ্ছে-এই সমস্ত বিষয়ের উপর।

