পুরুলিয়া: বাংলার শিল্প মানচিত্রে বড় সম্ভাবনার ইঙ্গিত। পুরুলিয়ার মাটির নীচে লিথিয়াম, সিজিয়াম, গ্রাফাইট এবং রেয়ার আর্থ এলিমেন্ট-এই চার গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সন্ধান মিলেছে বলে সূত্রের খবর। দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর ধরে পুরুলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় খনিজের সন্ধানে সমীক্ষা ও অনুসন্ধান চালানো হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রের দাবি।
এই সমীক্ষা চালিয়েছে জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (GSI), এমনটাই সূত্রের খবর।
সূত্রের দাবি, অনুসন্ধানের পর এই খনিজগুলির বাণিজ্যিক সম্ভাবনা সামনে আসে। এরপর প্রায় তিন বছর আগে খনিজ উত্তোলনের পরবর্তী প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য রাজ্য সরকারের কাছে 'নো অবজেকশন সার্টিফিকেট' বা NOC চেয়েছিল কেন্দ্র। তবে তৎকালীন রাজ্য সরকারের আমলে সেই NOC দেওয়া হয়নি বলে সূত্রের দাবি। একাধিকবার কেন্দ্রের তরফে রাজ্যের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করা হয়েছিল বলেও খবর।
রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর বিষয়টি নতুন করে পর্যালোচনা করা হয়। সূত্রের খবর, লিথিয়াম, সিজিয়াম, গ্রাফাইট এবং রেয়ার আর্থ এলিমেন্ট-এই চার গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ক্ষেত্রে কেন্দ্রকে NOC দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বর্তমান রাজ্য সরকার।
ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় খনি মন্ত্রকের কাছে রাজ্যের NOC সংক্রান্ত চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে সূত্রের দাবি। ফলে এবার খনিজ ব্লক নিলাম এবং বাণিজ্যিক উত্তোলনের পরবর্তী প্রক্রিয়া এগোনোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ পুরুলিয়ার এই খনিজ সম্পদ?
লিথিয়াম: আধুনিক ব্যাটারি শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল লিথিয়াম। বৈদ্যুতিক গাড়ি, মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, শক্তি সঞ্চয় ব্যবস্থা এবং পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি ক্ষেত্রে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। দেশে লিথিয়ামের নিজস্ব উৎস তৈরি হলে ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক গাড়ি শিল্পের ক্ষেত্রে তা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সিজিয়াম: অত্যন্ত বিরল এই ধাতুর ব্যবহার রয়েছে উচ্চপ্রযুক্তির বিভিন্ন ক্ষেত্রে। পারমাণবিক ঘড়ি, GPS ব্যবস্থা, উচ্চ-নির্ভুলতার বৈজ্ঞানিক যন্ত্র এবং বিশেষ ধরনের চিকিৎসা সরঞ্জামে সিজিয়াম ব্যবহৃত হয়। ফলে এর দেশীয় উৎস কৌশলগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।
গ্রাফাইট: ব্যাটারি শিল্প থেকে শুরু করে বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রে গ্রাফাইটের ব্যবহার রয়েছে। বিশেষ করে শক্তি সঞ্চয় এবং আধুনিক শিল্পে এর চাহিদা গুরুত্বপূর্ণ।
রেয়ার আর্থ এলিমেন্ট: এটি কোনও একটি নির্দিষ্ট খনিজ নয়, বরং একাধিক বিশেষ মৌলের সমষ্টি। বৈদ্যুতিক গাড়ি, উন্নত বৈদ্যুতিন সামগ্রী, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি এবং বিভিন্ন উচ্চপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে রেয়ার আর্থ এলিমেন্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কেন বদলাতে পারে পুরুলিয়ার শিল্প মানচিত্র?
বাণিজ্যিকভাবে খনিজ উত্তোলন সম্ভব হলে পুরুলিয়াকে ঘিরে খনি এবং খনিজ-প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক গাড়ি, উন্নত বৈদ্যুতিন সামগ্রী, প্রতিরক্ষা এবং উচ্চপ্রযুক্তির শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহের ক্ষেত্রেও পশ্চিমবঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ খনিজের জন্য ভারতের আমদানি-নির্ভরতা কমানোর জাতীয় পরিকল্পনাতেও পুরুলিয়ার এই সম্ভাব্য খনিজ সম্পদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বর্তমানে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খনিজের জন্য ভারতকে বিদেশের উপর নির্ভর করতে হয়। খনি চালু হলে শুধু খনিজ উত্তোলন নয়, তার সঙ্গে খনিজ-প্রক্রিয়াকরণ, পরিবহণ এবং অনুসারী শিল্পেরও বিকাশ ঘটতে পারে। তৈরি হতে পারে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পরিকাঠামোর উন্নয়নেও গতি আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

