Report: Ankur Saini: উত্তরপ্রদেশের সাহারানপুরে ঢমোলা নদীর উপর নির্মিত কয়েকশো বছরের প্রাচীন ঐতিহাসিক '৩২ দরাজ সেতু', যা একসময় মুঘল সম্রাট শাহজাহানের সহারানপুর আগমনের সময় নির্মিত হয়েছিল। আজ সেই সেতুটি ভেঙে তার অস্তিত্ব মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই সেতুর ইতিহাস একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় কাহিনির সঙ্গে জড়িত।
বাবা লাল দাস এবং হাজি শাহ কামাল হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে পরিচিত। এই ঘটনার সময়কাল ষোড়শ শতাব্দী বলে উল্লেখ করা হয়। সে সময় শাহজাহানের শাসনকাল চলছিল।
বাবা লাল দাস ও হাজি শাহ কামাল:
বাবা লাল দাস তাঁর শিষ্যদের সঙ্গে ভ্রমণ করতে করতে সাহারানপুরে পৌঁছেছিলেন। এখানকার সবুজে ঘেরা পরিবেশ, শান্ত আবহ এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তিনি একটি ঘাটের পাশে নিজের কুটির নির্মাণ করেন এবং তপস্যায় নিমগ্ন হন। ধীরে ধীরে তাঁর খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। তাঁর সাধনা ও অলৌকিক ক্ষমতা দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসতে থাকেন। তবে তাঁর এই জনপ্রিয়তায় কিছু মানুষ ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েন। দরবারের কয়েকজন ব্যক্তি দিল্লির দরবারে গিয়ে শাহজাহানের কাছে অভিযোগ করেন যে, সাহারনপুরে এক বাবা নাকি মানুষের ধর্মান্তর ঘটাচ্ছেন।
কমণ্ডলের অলৌকিক কাণ্ড দেখে ফকির নতজানু:
সাহিত্যিক ড. বীরেন্দ্র আজম জানান, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে শাহজাহান তাঁর এক বিশ্বস্ত ফকিরকে সাহারনপুরে পাঠান। সেই ফকির বাবা লাল দাসের সঙ্গে দেখা করে বলেন, ''বাবা, আমার খুব পিপাসা পেয়েছে, একটু জল পান করান।'' বাবা মৃদু হেসে তাঁর ছোট্ট কমণ্ডলটি তুলে নিয়ে ফকিরকে জল পান করাতে শুরু করেন। ফকির জল পান করতেই থাকেন, আর বাবা তাঁকে জল দিতে থাকেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, কমণ্ডলের জল যেন শেষই হচ্ছিল না। এই অলৌকিক ঘটনা দেখে ফকির বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান এবং সঙ্গে সঙ্গে বাবা লাল দাসের চরণে লুটিয়ে পড়েন। এরপর তিনি আর ফিরে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং সেখানেই নিজের একটি কুটির নির্মাণ করে বসবাস শুরু করেন।

শাহজাহানের আগমন এবং '৩২ দরাজ সেতু'র নির্মাণ:
যখন সেই ফকির আর ফিরে এলেন না, তখন এই রহস্যময় ঘটনাই স্বয়ং সম্রাট শাহজাহানকে সাহারানপুরে আসতে বাধ্য করেছিল। শাহজাহানের সাহারানপুর আগমনকে সহজ ও নির্বিঘ্ন করতে সে সময় ঢমোলা নদীর উপর এই বিশাল '৩২ দরাজ সেতু' নির্মাণ করা হয়েছিল। সেতু নির্মাণের পর শাহজাহান তাঁর সমগ্র রাজকীয় সেনাবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে এই সেতু দিয়েই বাবা লাল দাসের কুটিরে পৌঁছেছিলেন।
যখন সম্রাট শাহজাহানেরও অহংকার ভেঙে গিয়েছিল:
কুটিরে পৌঁছানোর পর শাহজাহানও বাবা লাল দাসের পরীক্ষা নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁর কাছে জল চেয়েছিলেন। তখন বাবা লাল দাস একই অলৌকিক উপায়ে তাঁর সেই ছোট্ট কমণ্ডল থেকেই শাহজাহান এবং তাঁর সমগ্র বিশাল সেনাবাহিনীকে জল পান করিয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়। বিস্ময়কর বিষয় ছিল, পুরো সেনাবাহিনীর তৃষ্ণা মিটে যাওয়ার পরও কমণ্ডলের জল শেষ হয়নি। এই অলৌকিক ঘটনা দেখে সম্রাট শাহজাহানের সমস্ত অহঙ্কার চূর্ণ হয়ে গিয়েছিল এবং তিনিও বাবা লাল দাসের অনুরাগী হয়ে উঠেছিলেন। এই ঐতিহাসিক সেতুটি সেই গৌরবময় ও সম্প্রীতির সময়ের এক জীবন্ত স্মারক ছিল, যা এখন সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে।

