কলকাতা: ডিসেম্বরের মধ্যেই বাংলাদেশে ফিরতে চান প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর প্রত্যাবর্তন হবে তাঁর নিজের সিদ্ধান্তেই। ভারত থেকে বাংলাদেশের একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া একান্ত টেলিফোন সাক্ষাৎকারে এমনটাই জানিয়েছেন তিনি।
হিন্দুস্তান টাইমসকে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি অনির্দিষ্টকালের জন্য দেশের বাইরে থাকতে চান না।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও আইনি পরিস্থিতি জটিল হলেও দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত তিনি ইতিমধ্যেই নিয়েছেন। ঢাকার অন্তর্বর্তী পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশে ফেরার সঙ্গে তাঁর প্রত্যর্পণের বিষয়টি যুক্ত করা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন হাসিনা। তিনি জানতে চান, দিল্লিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফরের সঙ্গে তাঁর প্রত্যর্পণের বিষয়টি কেন যুক্ত করা হচ্ছে।
ভারতে থাকাকালীন তাঁর প্রকাশ্য মন্তব্য দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে কীভাবে সমস্যা তৈরি করতে পারে, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। হাসিনার কথায়, "আমি একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে সাংবাদিক বৈঠক করেছি। এটা কীভাবে দুই দেশের সম্পর্কের সমস্যা হতে পারে?" ব্রিটেনে থাকার সময় তারেক রহমানের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসঙ্গও তোলেন শেখ হাসিনা। তিনি প্রশ্ন করেন, সেই সময় কেন তিনি ব্রিটিশ সরকারের হস্তক্ষেপ চাননি।
হাসিনা স্পষ্ট করে বলেন, তিনি নিজের দেশে ফিরতে চান এবং সারা জীবন বিদেশে থেকে যাওয়ার কোনও পরিকল্পনা তাঁর নেই। ডিসেম্বরের মধ্যে ফেরার ইচ্ছার কথা ইতিমধ্যেই জানিয়েছেন তিনি। পরে দেশে ফেরার নির্দিষ্ট তারিখ, সময় এবং কোন সীমান্ত বা প্রবেশপথ দিয়ে তিনি বাংলাদেশে ঢুকবেন, তা জানাবেন বলে জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট অনির্দিষ্টকাল ধরে চলতে দেওয়া যায় না।
বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে সরব শেখ হাসিনা
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের উপর নির্যাতন চালানো হচ্ছে, তাঁদের গ্রেফতার করা হচ্ছে এবং হিংসার শিকার হতে হচ্ছে। দলের সদস্যদের বাড়িতে হামলা এবং তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের অভিযোগও করেন তিনি। প্রত্যর্পণের বিষয়টিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন হাসিনা। তবে একইসঙ্গে তিনি জানান, আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া নিজের মতো করে চলবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার কথাও তুলে ধরেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর দাবি, তাঁর সরকারের সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। মাথাপিছু আয়ও ৪৮২ ডলার থেকে বেড়ে ২,৭৮৪ ডলার হয়েছিল। তাঁর দাবি, পরবর্তীতে বাংলাদেশের GDP বৃদ্ধির হার ৬.৮০ শতাংশ থেকে কমে ২.২২ শতাংশে নেমে এসেছে। ৫৪ বছরের মধ্যে প্রথমবার শিল্প বৃদ্ধির হার নেতিবাচক হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। একইসঙ্গে দেশে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বেড়েছে বলে অভিযোগ করেন হাসিনা।
আওয়ামী লীগের পক্ষেও সওয়াল হাসিনার
আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়েও মুখ খোলেন শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের ইতিহাসে দলের ভূমিকার কথা তুলে ধরে তিনি প্রশ্ন করেন, কেন আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। হাসিনার বক্তব্য, কোনও রাজনৈতিক দলের জনপ্রিয়তা এবং কাজের বিচার হওয়া উচিত নির্বাচনের মাধ্যমে ভোটারদের সিদ্ধান্তে। তাঁর দাবি, দলের নেতা-কর্মীদের উপর ব্যাপক নির্যাতন চালানো হলেও আওয়ামী লীগের এখনও মানুষের সমর্থন রয়েছে।
তিনি জানান, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। কারা বাংলাদেশে ফিরবেন, সে বিষয়ে দলের মধ্যে আলোচনা এবং দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। নিজের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার প্রসঙ্গও তোলেন হাসিনা। তাঁর দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে ৬০০-রও বেশি মামলা দায়ের হয়েছে।
বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার হিসেবেও উল্লেখ করেন তিনি। অতীতে নিজের বিরুদ্ধে থাকা হুমকির প্রসঙ্গ টেনে শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বা ক্ষমতায় ফেরার জন্য নয়। তাঁর কথায়, "আমার ফিরে আসা ক্ষমতার জন্য নয়। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য।"

