Dailyhunt
পঞ্চানন্দপুরে অল ইন্ডিয়া মাইনোরিটি অর্গানাইজেশনের ১১তম অ্যানুয়াল কনফারেন্স

পঞ্চানন্দপুরে অল ইন্ডিয়া মাইনোরিটি অর্গানাইজেশনের ১১তম অ্যানুয়াল কনফারেন্স

NEWS TIME 24x7 3 months ago

মালদার পঞ্চানন্দপুরে অল ইন্ডিয়া মাইনোরিটি অর্গানাইজেশনের ১১তম অ্যানুয়াল কনফারেন্স: গঙ্গা ভাঙন, পুনর্বাসন ও সংখ্যালঘু স্বার্থে ১১ দফা দাবিতে সরব সংগঠন

মালদা জেলার কালিয়াচক-২ নম্বর ব্লকের অন্তর্গত পঞ্চানন্দপুরে রবিবার অনুষ্ঠিত হয়ে গেল অল ইন্ডিয়া মাইনোরিটি অর্গানাইজেশনের (AIMO) ১১তম অ্যানুয়াল কনফারেন্স। গঙ্গা ভাঙনে সর্বস্ব হারানো মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়, পুনর্বাসন এবং সার্বিক উন্নয়নের দাবিকে সামনে রেখে এই কনফারেন্সে তুলে ধরা হয় ১১ দফা গুরুত্বপূর্ণ দাবি। সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত এই কনফারেন্স শুধু একটি রাজনৈতিক বা সামাজিক সভাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা পরিণত হয় একটি বৃহৎ গণআন্দোলনের মঞ্চে, যেখানে গঙ্গা ভাঙনে বিপর্যস্ত মানুষের দীর্ঘদিনের যন্ত্রণা, ক্ষোভ ও প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটে।

প্রতিবছরের মতো এই বছরও কনফারেন্সকে কেন্দ্র করে পঞ্চানন্দপুর বিউটি পার্ক এলাকায় আয়োজন করা হয় এক বিশাল ও বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। রবিবার সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নাচ, গান, ব্যান্ড পরিবেশনা, নামিদামি শিল্পীদের সঙ্গীত পরিবেশন এবং মডেলদের প্রদর্শনীতে উৎসবের আবহে মেতে ওঠে গোটা এলাকা। দূরদূরান্ত থেকে আগত দর্শকদের উপচে পড়া ভিড়ে কার্যত জনসমুদ্রে পরিণত হয় অনুষ্ঠানস্থল। দর্শকদের করতালি, উচ্ছ্বাস এবং অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানটি আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।

এই অ্যানুয়াল কনফারেন্স ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অল ইন্ডিয়া মাইনোরিটি অর্গানাইজেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নাসির আহমেদ। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, “গঙ্গা ভাঙন মালদা জেলার মানুষের জীবনে শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকট। বছরের পর বছর মানুষ ঘরবাড়ি, জমিজমা, শিক্ষা, জীবিকা—সবকিছু হারাচ্ছে। অথচ স্থায়ী সমাধানের অভাব আজও রয়ে গেছে।” তিনি আরও বলেন, সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এই এলাকাগুলির সমস্যা নিয়ে সংগঠন বরাবরই রাজ্য ও কেন্দ্র সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আসছে এবং ভবিষ্যতেও আন্দোলনের পথেই দাবি আদায়ের চেষ্টা চলবে।

কনফারেন্সে উপস্থিত ছিলেন রাজ্য মাইনোরিটি কমিশনের সদস্য শেহেনাজ কাদরি। তিনি গঙ্গা ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়ে বলেন, “সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার সুরক্ষা এবং উন্নয়ন রাজ্য সরকারের অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে। গঙ্গা ভাঙন কবলিত মানুষের পুনর্বাসন, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বিষয়গুলো নিয়ে সরকারকে আরও সংবেদনশীল হতে হবে।” তিনি সংগঠনের ১১ দফা দাবিকে গুরুত্ব দিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে তা তুলে ধরার প্রতিশ্রুতি দেন।

এছাড়াও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের উদ্বাস্তু, ত্রাণ ও পুনর্বাসন দপ্তরের চেয়ারম্যান রঞ্জিত সরকার, একাধিক জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের আধিকারিক, সমাজকর্মী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। তাঁদের উপস্থিতি কনফারেন্সের গুরুত্ব ও গ্রহণযোগ্যতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

কনফারেন্সে অল ইন্ডিয়া মাইনোরিটি অর্গানাইজেশনের পক্ষ থেকে যে ১১ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়, তার মধ্যে অন্যতম হলো—

১) গঙ্গা ভাঙন সমস্যার স্থায়ী ও বৈজ্ঞানিক সমাধান,

২) ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির দ্রুত ও স্থায়ী পুনর্বাসন,

৩) পুনর্বাসিত পরিবারগুলির জন্য জমি, বাসস্থান ও মৌলিক পরিষেবা নিশ্চিত করা,

৪) গঙ্গা ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত ছাত্রছাত্রীদের জন্য বিশেষ শিক্ষা সহায়তা,

৫) মোথাবাড়ি এলাকায় একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি কলেজ স্থাপন,

৬) পরিযায়ী শ্রমিকদের ভিনরাজ্যে হয়রানি ও শোষণ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা,

৭) কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি,

৮) স্বাস্থ্য পরিষেবার পরিকাঠামো উন্নয়ন,

৯) নদী ভাঙন কবলিত এলাকায় স্থায়ী বাঁধ ও নদীশাসন প্রকল্প,

১০) ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য ক্ষতিপূরণ ও বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা এবং

১১) সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় সার্বিক উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন।

বক্তারা জানান, এই দাবিগুলি কেবল কিছু সংগঠনের দাবি নয়, বরং তা হাজার হাজার গঙ্গা ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও বেঁচে থাকার লড়াইয়ের প্রতিফলন। দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক অবহেলা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটানো এই মানুষগুলির জন্য স্থায়ী সমাধান এখন সময়ের দাবি।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের দিক থেকেও এবারের আয়োজন ছিল নজরকাড়া। জনপ্রিয় শিল্পীদের পরিবেশনা, ব্যান্ডের লাইভ মিউজিক, নৃত্য পরিবেশনা ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অনুষ্ঠানস্থল ছিল আলোকময়। শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সের মানুষ এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। স্থানীয় শিল্পীদের পাশাপাশি বাইরের শিল্পীদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি এক সর্বভারতীয় রূপ পায়।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতিবছর এই অ্যানুয়াল কনফারেন্স ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান তাঁদের জীবনে কিছুটা হলেও আনন্দ ও আশার আলো নিয়ে আসে। গঙ্গা ভাঙনের যন্ত্রণার মধ্যেও এই ধরনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে এবং নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলে।

অনুষ্ঠান শেষে স্থানীয় মানুষজন অল ইন্ডিয়া মাইনোরিটি অর্গানাইজেশনের এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তাঁদের আশা, শুধু মঞ্চে দাবি তোলাই নয়, আগামী দিনে এই দাবিগুলি বাস্তবায়নের দিকেও প্রশাসন ও সরকার যথাযথ পদক্ষেপ নেবে। গঙ্গা ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দীর্ঘদিনের লড়াইয়ে এই অ্যানুয়াল কনফারেন্স যে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে, সে বিষয়ে তাঁরা আশাবাদী।

সব মিলিয়ে, মালদার পঞ্চানন্দপুরে অনুষ্ঠিত অল ইন্ডিয়া মাইনোরিটি অর্গানাইজেশনের ১১তম অ্যানুয়াল কনফারেন্স শুধুমাত্র একটি সাংগঠনিক অনুষ্ঠান নয়, বরং তা হয়ে উঠল গঙ্গা ভাঙনে বিপর্যস্ত মানুষের কণ্ঠস্বর, দাবি ও স্বপ্নের এক শক্তিশালী প্রকাশ।

Dailyhunt
Disclaimer: This content has not been generated, created or edited by Dailyhunt. Publisher: NEWS TIME 24x7