বিদেশে ছুটি কাটানোর পরিকল্পনা করছেন? অথবা বিদেশের কোনও বিলাসবহুল গন্তব্যে বিয়ের অনুষ্ঠান করার কথা ভাবছেন? তাহলে সেই পরিকল্পনা আরও একবার ভেবে দেখার পরামর্শ দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। একইসঙ্গে একান্ত প্রয়োজন না হলে সোনা না কেনারও আবেদন জানিয়েছেন তিনি। তাঁর বার্তা, দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে মানুষের খরচের একটি বড় অংশ যেন দেশের মধ্যেই থাকে।
চলতি অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে ভারতের অর্থনীতি ৭.৮ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাওয়ার পর দেশবাসীর উদ্দেশে একটি ভিডিও বার্তা দেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানেই 'স্বদেশি' এবং আত্মনির্ভরতার উপর ফের জোর দেন তিনি।
মোদী বলেন, বিদেশে যাওয়ার উদ্দেশ্য যদি শুধুই অবসর কাটানো বা আনন্দ করা হয়, তাহলে সেই সফর এড়িয়ে চলা যেতে পারে। একইভাবে বিদেশে গিয়ে বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিবর্তে দেশের মধ্যেই তা করার পরামর্শ দেন তিনি। প্রয়োজন না থাকলে সোনা কেনার ক্ষেত্রেও সংযত হওয়ার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
এর পিছনে মূলত দেশের অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ ধরে রাখার যুক্তিই তুলে ধরেছেন মোদী। ভারতীয়রা বিদেশে ছুটি কাটাতে কিংবা বিয়ের অনুষ্ঠান করতে গেলে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে চলে যায়। তার পরিবর্তে দেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলিতে ভ্রমণ কিংবা দেশের মাটিতে বিয়ের অনুষ্ঠান হলে সেই অর্থ হোটেল, পরিবহণ, পর্যটন শিল্প এবং স্থানীয় ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মানুষের আয় হিসেবে দেশের অর্থনীতিতেই ঘুরবে।
এর আগেও 'ওয়েড ইন ইন্ডিয়া'-র ডাক দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ধনী ও উচ্চবিত্ত পরিবারের একটি অংশের মধ্যে বিদেশে ডেস্টিনেশন ওয়েডিংয়ের প্রবণতা বাড়ছে। কেন্দ্রের মতে, সেই বিপুল অর্থ দেশের মধ্যেই খরচ হলে স্থানীয় ব্যবসা, পরিষেবা ক্ষেত্র এবং কর্মসংস্থান আরও লাভবান হতে পারে।
সোনা কেনার ক্ষেত্রেও রয়েছে অর্থনৈতিক কারণ। ভারতে সোনার চাহিদার একটি বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। ফলে অপ্রয়োজনীয় সোনা আমদানি বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার উপর চাপ তৈরি হতে পারে এবং দেশের বাণিজ্য ঘাটতিও প্রভাবিত হতে পারে।
ভিডিও বার্তায় মোদী বলেন, স্বদেশি পণ্যের ব্যবহার এবং আত্মনির্ভরতার উপর যত বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে, ততই শক্তিশালী হবে ভারতের অর্থনীতি। তাঁর মতে, স্বাধীনতার ১০০ বছর পূর্তির সময় ভারতকে একটি উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব।
প্রধানমন্ত্রীর কথায়, "আমরা যত বেশি স্বদেশির উপর জোর দেব, যত বেশি আত্মনির্ভরতার উপর গুরুত্ব দেব, ততই উন্নত ভারতের লক্ষ্য অর্জনের দিকে এগিয়ে যেতে পারব।"
অর্থাৎ, তাঁর আবেদন শুধুমাত্র বিদেশ ভ্রমণ বা সোনা কেনা এড়িয়ে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দৈনন্দিন কেনাকাটা থেকে শুরু করে ভ্রমণ, বিয়ে কিংবা বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন-সব ক্ষেত্রেই দেশীয় পণ্য ও পরিষেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বার্তা দিয়েছেন তিনি।
এই বক্তব্য 'ভোকাল ফর লোকাল' এবং 'আত্মনির্ভর ভারত' কর্মসূচির ধারাবাহিকতা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো, ছোট ব্যবসাকে শক্তিশালী করা এবং স্থানীয় কর্মসংস্থান তৈরির ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের খরচের ধরন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে মনে করছে কেন্দ্র।
এদিকে, ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের এপ্রিল থেকে জুন ত্রৈমাসিকে ভারতের প্রকৃত মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা রিয়েল GDP ৭.৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের একই সময়ে বৃদ্ধির হার ছিল ৬.৯ শতাংশ। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে নমিনাল GDP-র বৃদ্ধির হার ছিল ১০.৩ শতাংশ।
এই বৃদ্ধিকে 'অত্যন্ত কঠিন একটি সাফল্য' বলে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর দাবি, বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, অনিশ্চয়তা, বিভিন্ন সংকট এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যার মধ্যেও ভারত দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে।
অর্থনীতির এই বৃদ্ধিতে পরিষেবা ক্ষেত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। প্রথম ত্রৈমাসিকে পরিষেবা ক্ষেত্রের বৃদ্ধি হয়েছে ১০ শতাংশ। আর্থিক পরিষেবা, রিয়েল এস্টেট, তথ্যপ্রযুক্তি এবং পেশাদারি পরিষেবাগুলিতে বৃদ্ধির হার ছিল ১২.১ শতাংশ। শিল্প-সহ দ্বিতীয় ক্ষেত্র বেড়েছে ৮.৬ শতাংশ। কৃষি ও সহযোগী ক্ষেত্রের বৃদ্ধির হার ৩.৬ শতাংশ।
বিনিয়োগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক গ্রস ফিক্সড ক্যাপিটাল ফর্মেশন বা GFCF-ও ১১.৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে ব্যক্তিগত ভোগব্যয়ের বৃদ্ধির হার ছিল ৭.১ শতাংশ।
ভিডিও বার্তায় বিরোধীদেরও নাম না করে নিশানা করেন মোদী। তাঁর অভিযোগ, দেশের মধ্যেই কিছু মানুষ হতাশার পরিবেশ তৈরি করছেন এবং চারদিকে 'মিথ্যার প্রতিধ্বনি' ছড়ানোর চেষ্টা চলছে। তাঁর দাবি, সেই সমস্ত বাধা পেরিয়েই ভারত ৭.৮ শতাংশ বৃদ্ধির হার অর্জন করেছে।
মোদীর ব্যবহৃত 'ঝুঠ কি গুঞ্জ' মন্তব্যকে রাহুল গান্ধীর 'ছাত্রোঁ কি গুঞ্জ' কর্মসূচির প্রতি পরোক্ষ আক্রমণ হিসেবে দেখছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ। কংগ্রেসের ওই কর্মসূচিতে বেকারত্ব, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষা ব্যবস্থার মতো বিষয় তুলে ধরা হচ্ছে।
যদিও মোদী তাঁর বক্তব্যে কারও নাম করেননি। তাঁর দাবি, দেশের নীতি সঠিক এবং সরকারের উদ্দেশ্যও স্পষ্ট। ১৪০ কোটি ভারতীয়র সম্মিলিত শক্তিই দেশকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। একইসঙ্গে উন্নয়নের বর্তমান গতি বজায় রাখতে দেশবাসীকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
এই মুহূর্তে কিরঘিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে রয়েছেন নরেন্দ্র মোদী। সেখানে ২৬তম সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন বা SCO সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন তিনি। সম্মেলনে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান-সহ সদস্য দেশগুলির রাষ্ট্রনেতারা উপস্থিত রয়েছেন।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে SCO সম্মেলনে অংশ নেওয়ার মধ্যেই দেশবাসীর উদ্দেশে এই ভিডিও বার্তা দিয়ে মোদী কার্যত বোঝাতে চেয়েছেন, ভারতের অর্থনীতির বৃদ্ধির গতি বজায় রাখতে শুধু সরকারি নীতি নয়, সাধারণ মানুষের খরচের সিদ্ধান্তও গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশি পণ্যের পরিবর্তে স্বদেশি সামগ্রী, বিদেশে ছুটি কাটানোর বদলে দেশের পর্যটনকেন্দ্র এবং বিদেশে ডেস্টিনেশন ওয়েডিংয়ের পরিবর্তে ভারতেই বিয়ের অনুষ্ঠান-এই ভাবনার মাধ্যমেই দেশের অর্থ দেশের মধ্যেই রাখার বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

