দেশ ছেড়ে থাকার দুই বছর পূর্ণ। প্রকাশ্যে না এলেও ভার্চুয়াল সাংবাদিক বৈঠকে মুখ খুললেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানেই তিনি জানালেন, "আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ডিসেম্বরে দেশে ফিরব।"বাংলাদেশের প্রসঙ্গ উঠতেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বঙ্গবন্ধুকন্যা, কণ্ঠও ভারী হয়ে আসে তাঁর।
কী বললেন শেখ হাসিনা?
অডিয়ো বার্তার মাধ্যমে বক্তব্য রাখতে গিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আত্মার। গত দুই বছরে নিজের প্রিয় দেশকে চরম দুর্দশার মধ্যে দিয়ে যেতে দেখেছেন বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর কথায়, "এটি কোনও শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলন ছিল না। আন্দোলনকে পরিকল্পিতভাবে সহিংস রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করা হয়েছিল।"
আওয়ামী লিগ সরকারের পতন নিয়ে কী বললেন?
২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের জেরে আওয়ামী লিগ সরকারের পতনের প্রসঙ্গে হাসিনার দাবি, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। কিন্তু সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য আগেই সুপরিকল্পিত ছক তৈরি করা হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, নির্বাচনের পরিবর্তে অন্য উপায়ে সরকারকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার যা করেছে, তা অপরাধ নয়, বরং দায়িত্ব পালন।
তিনি আরও বলেন, তাঁর সরকারের সময় যে বিচারবিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছিল, ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর তা বন্ধ করে দেয়। জুলাই-আগস্টের আন্দোলনকে তিনি স্বতঃস্ফূর্ত নয়, পরিকল্পিত বলেই দাবি করেন। পাশাপাশি অভিযোগ করেন, প্রায় ১০ হাজার আওয়ামী লিগ কর্মী-সমর্থক নিখোঁজ হয়ে গিয়েছেন।
সরকার পরিবর্তনের পর দেশের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন হাসিনা। তাঁর অভিযোগ, সংখ্যালঘু, সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর হামলা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর নাম ও ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে বলেও দাবি করেন তিনি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আবেদন জানান প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী।
দেশে ফেরার ঘোষণা
শেখ হাসিনা বলেন, তিনি দেশের মানুষের কাছেই ফিরে যেতে চান। দীর্ঘদিন নিজের দেশ থেকে দূরে থাকা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। জেলে যেতে হলেও তিনি ভয় পান না। নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি চিন্তিত নন বলেও জানান। অতীতে একাধিকবার গ্রেফতার হওয়া ও দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়ার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রাণনাশের আশঙ্কা থাকলেও তিনি পিছিয়ে আসবেন না।
তবে তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় স্পষ্ট করে জানান, দেশে ফেরার বিষয়ে বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে তাঁদের কোনও আলোচনা হয়নি এবং ভবিষ্যতেও হবে না।
ভারত প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ভারত সরকার তাঁদের যথেষ্ট সম্মান ও আন্তরিকতা দেখিয়েছে। একইসঙ্গে তিনি বলেন, ভারত বাংলাদেশের বন্ধু রাষ্ট্র এবং সেই সম্পর্ক অটুট থাকবে। তবে তাঁর লক্ষ্য একটাই-নিজের দেশের মানুষের কাছে ফিরে যাওয়া। তিনি জানান, ডিসেম্বরে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত, যদিও নির্দিষ্ট দিন পরে জানানো হবে।
রাষ্ট্রপুঞ্জের তথ্য নিয়েও প্রশ্ন
সজীব ওয়াজেদ জয় বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন করার অভিযোগ তোলেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে নিহতের সংখ্যা নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপুঞ্জ ১,৪০০ জনের মৃত্যুর কথা জানালেও বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া পরিসংখ্যান তার সঙ্গে মিলছে না। তাঁর দাবি, আওয়ামী লিগ বারবার নিহতদের নাম-পরিচয় জানতে চাইলেও রাষ্ট্রপুঞ্জ এখনও সেই তথ্য প্রকাশ করেনি।
ইনডেমনিটি বিলেরও সমালোচনা করেন জয়। তাঁর অভিযোগ, ওই আইনের মাধ্যমে আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে অভিযুক্তদের ব্যাপক আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, পরবর্তীতে বিএনপি সরকারও সেই আইনে অনুমোদন দিয়েছে।
জয়ের আরও অভিযোগ, আওয়ামী লিগের হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে বিচার বা জামিনের সুযোগ ছাড়াই আটক রাখা হয়েছে। অনেকের পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে, আবার অনেককে জেলের বাইরেও হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। পাশাপাশি আওয়ামী লিগের প্রতি সহানুভূতিশীল সাংবাদিক, সম্পাদক, সংবাদমাধ্যমের মালিক ও ব্যবসায়ীদেরও বিচার ছাড়াই কারাবন্দি করা হয়েছে বলে অভিযোগ তোলেন।
বাংলাদেশকে তিনি "ব্যর্থ রাষ্ট্র" আখ্যা দিয়ে বলেন, দেশে এখন বাকস্বাধীনতা, মানবাধিকার, আইনের শাসন ও সংবিধানের কার্যকারিতা-সবই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।
ভারতের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ
সজীব ওয়াজেদ জয়ের অভিযোগ, বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলি দেশের বড় সংবাদমাধ্যমগুলিকে এই ভার্চুয়াল সাংবাদিক বৈঠকের খবর প্রকাশ বা সম্প্রচার না করার নির্দেশ দিয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, বাংলাদেশ ভারতের পূর্ব সীমান্তে ধীরে ধীরে "আরেকটি পাকিস্তান"-এ পরিণত হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, আওয়ামী লিগ সরকারের সময় গ্রেফতার হওয়া বহু জঙ্গিকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে এবং বর্তমানে হিজবুত তাহরীর ও আল-কায়েদা-ঘনিষ্ঠ জঙ্গিরা প্রকাশ্যে সক্রিয়। এই পরিস্থিতি শুধু ভারতের নয়, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগের কারণ বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর সতর্কবার্তা, দ্রুত পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের অন্যতম উৎসে পরিণত হতে পারে।

