হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু। এখনও নিখোঁজ প্রায় সাড়ে চার হাজার। ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকা। একের পর এক আতঙ্কজনক ভিডিয়ো ছড়িয়ে পড়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। এর মধ্যেই সামনে এসেছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। দাবি করা হচ্ছে, হিমবাহ ধসে নেপালে যে ভয়াবহ বিপর্যয় তৈরি হয়েছিল, তার শক্তি ছিল হিরোশিমায় আমেরিকার নিক্ষেপ করা পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণের শক্তির থেকেও বেশি।
কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক বসন্ত রাজ অধিকারীর দাবি, নেপালের সাম্প্রতিক এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের শক্তি হিরোশিমার পরমাণু বিস্ফোরণের তুলনায়ও বেশি। হিমালয় অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং বন্যার ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন তিনি। তাঁর কথায়, বিপর্যয়ের সম্ভাবনা নিয়ে তিনি একেবারে বিস্মিত নন। তবে গবেষণার জীবনে এমন ভয়াবহ দুর্যোগ তিনি আগে দেখেননি।
বসন্ত রাজ অধিকারীর ব্যাখ্যা, কীভাবে এই বিপর্যয় ঘটেছে, তার একটি পরিষ্কার ছবি ইতিমধ্যেই পাওয়া গিয়েছে। তাঁর মতে, বিশাল আকারের একটি হিমবাহ ভেঙে নদীতে আছড়ে পড়ে। এরপর দ্রুত বরফ গলে বিপুল জলরাশি এবং ধ্বংসাবশেষ পাহাড়ি নদীপথ ধরে নীচের দিকে ধেয়ে আসে। ২০২১ সালে উত্তরাখণ্ডের চামোলিতে যে ধরনের ঘটনা দেখা গিয়েছিল, তার সঙ্গে এর কিছুটা মিল রয়েছে। তবে নেপালের এবারের বিপর্যয়ের মাত্রা ছিল অনেক বেশি।
ওই অধ্যাপকের দাবি, হিমবাহ ধসের ফলে উৎপন্ন শক্তির পরিমাণ হিসাব করে দেখা হয়েছে। সেই হিসাব অনুযায়ী, শক্তির মাত্রা হিরোশিমার পারমাণবিক বিস্ফোরণের শক্তিকেও ছাপিয়ে গিয়েছে। এত বিশাল মাত্রার হিমবাহ ধস যে ঘটতে পারে, তা তাঁদের কাছে কার্যত অকল্পনীয় ছিল বলেও জানান তিনি।
ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জলবিজ্ঞান ও আবহাওয়াবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক দিবাস শ্রেষ্ঠার বক্তব্য, লাংটাং উপত্যকার পরিচিত লিরুং শৃঙ্গের উত্তর ঢালে থাকা একটি ঝুলন্ত হিমবাহ ভেঙে পড়ার ফলেই এই ভয়াবহ বন্যার সূত্রপাত। প্রায় ১,৪০০ মিটার উচ্চতা থেকে হিমবাহের একটি বিশাল অংশ খাড়াভাবে নীচে নেমে আসে। তার জেরেই তৈরি হয় প্রবল জলস্রোত এবং ধ্বংসাবশেষের স্রোত।
ইউনাইটেড স্টেটস জিওলজিক্যাল সার্ভে (USGS)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, হিমবাহ ধসের পর যে কম্পন ধরা পড়েছিল, প্রাথমিকভাবে সেটিকে ভূমিকম্প বলে মনে করা হয়েছিল। সেই কম্পনের মাত্রা ছিল ৫.২। পরে অবশ্য স্পষ্ট হয়, ভূগর্ভস্থ টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ার কারণে ওই কম্পন হয়নি। হিমবাহ ধস এবং তার পরবর্তী ধ্বংসাবশেষের প্রবল আঘাতেই ওই কম্পনের সৃষ্টি হয়েছিল।
কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান রিজান ভক্তার কথায়, নেপালে এখন বর্ষাকাল চললেও বিপর্যস্ত এলাকায় সেই সময়ে বৃষ্টিপাত হয়নি। কিন্তু পার্বত্য অঞ্চলে তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেশি রয়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বরফ দ্রুত গলে যাচ্ছে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাঁর আশঙ্কা, নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয় হয়তো আরও ভয়াবহ ভবিষ্যতের ইঙ্গিত। জলবায়ু ও পার্বত্য পরিবেশের পরিবর্তনের বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী দিনে হিমবাহ ধস এবং তার জেরে ভয়াবহ বন্যার মতো ঘটনা আরও ঘটতে পারে।

