পূর্বের তুলনায় আরও জোরদার হয়েছে বীরভূমের বহুল আলোচিত পাথর ব্যবসায়ী মহম্মদ নিজামুদ্দিন ওরফে টুলু মণ্ডলকে ঘিরে তদন্ত। তাঁর বিপুল সম্পত্তি, আয়ের উৎস এবং অভিযোগ ওঠা বেআইনি আর্থিক লেনদেনের হদিস পেতে গত কয়েকদিন ধরে ধারাবাহিকভাবে অভিযান চালাচ্ছে জেলা পুলিশ। সেই তদন্তে এবার আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হয়েছে রাজ্য পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ)।
বুধবার সকালে পাঁড়ুই থানার অন্তর্গত টুলু মণ্ডলের শ্বশুরবাড়িতে হানা দিয়ে প্রায় নয় ঘণ্টা ধরে তল্লাশি চালায় এসটিএফ এবং জেলা পুলিশের যৌথ দল।
তদন্তকারী সূত্রে জানা গিয়েছে, টুলুর শ্যালক মহম্মদ সামসুল আলম ওরফে মিন্টু শেখের অবস্থান এবং তাঁর সম্পদের উৎস সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করাই ছিল অভিযানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। অত্যাধুনিক মেটাল ডিটেক্টরের সাহায্যে বাড়ির বিভিন্ন অংশ খুঁটিয়ে পরীক্ষা করা হলেও উল্লেখযোগ্য কিছু উদ্ধার হয়নি বলে পুলিশ সূত্রে খবর। জানা যায়, টুলুর শ্বশুর নুরুল হক ধান ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তবে তাঁর দুই ছেলে দীর্ঘদিন ধরে পাথরের ব্যবসা করছেন বলে স্থানীয়দের দাবি। নুরুল হকের মেয়ে ফিরোজা বিবি ওরফে মীনা বেগমের সঙ্গে মহম্মদবাজারের বাসিন্দা টুলু মণ্ডলের বিয়ে হয়েছিল।
বুধবার সকালে বোলপুরের এসডিপিও অর্পিত আর পারেখের নেতৃত্বে প্রথমে এসটিএফ ও জেলা পুলিশের দল পৌঁছয় টুলুর খুড়শ্বশুরের ছেলে মহম্মদ নজরুল ইসলামের বাড়িতে। সেখানে আলমারি, ড্রয়ার, খাটের নিচ-সহ বাড়ির একাধিক জায়গায় তল্লাশি চালানো হয়। পরে নজরুল ইসলাম জানান, তাঁর বাড়ি থেকে কোনও সন্দেহজনক জিনিস উদ্ধার হয়নি। এরপর তদন্তকারীরা নুরুল হকের বাড়িতে অভিযান চালান। দীর্ঘ সময় ধরে জলের ট্যাঙ্ক, বাথরুম, চিলেকোঠা-সহ বাড়ির বিভিন্ন অংশ মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে পরীক্ষা করা হয়। একটি বাথরুমের মেঝে ভেঙে এবং বাড়ির কয়েকটি জায়গায় মাটি খুঁড়েও অনুসন্ধান চালানো হয়। পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেন তদন্তকারীরা। কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথিও খতিয়ে দেখা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও কোন নির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে এই অভিযান চালানো হয়েছে, সে বিষয়ে এসটিএফ বা জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, অভিযানের সময় টুলুর শ্যালক মিন্টু শেখ বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন না। তদন্তকারীরা তাঁর খোঁজ করলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তিনি কোথায় রয়েছেন, তা নিয়ে এলাকায় ইতিমধ্যেই জল্পনা শুরু হয়েছে। এদিকে তদন্তকে আরও শক্তিশালী করতে জেলা পুলিশের সঙ্গে কাজ করছে রাজ্য পুলিশের সিআইডি এবং ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের একটি দল। বুধবার বীরভূম জেলা আদালতে মামলার তদন্তকারী অফিসার তথা জেলা পুলিশের ডিএসপি (ট্রাফিক) কুণাল মুখোপাধ্যায় বাজেয়াপ্ত নথিগুলি ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে ডিজিটাল স্ক্যান করার অনুমতি চান। আদালতের অনুমতির পর সিআইডি ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে সেই স্ক্যানিংয়ের কাজ সম্পন্ন হয়।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, গত প্রায় আটদিনে জেলার বিভিন্ন এলাকায় চালানো সমস্ত তল্লাশি অভিযানের ভিডিও ফুটেজও ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করে মামলার নথিতে যুক্ত করা হবে। এছাড়া টুলু মণ্ডলের কথিত গোপন ছাপাখানা থেকে উদ্ধার হওয়া ছাপার কালি, বিভিন্ন রাসায়নিক এবং অন্যান্য সামগ্রী পরীক্ষার জন্য ফরেনসিক পরীক্ষাগারে পাঠানো হবে। একইসঙ্গে টুলুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও ম্যানেজার সীতেশ প্রামাণিকের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া বহুচর্চিত লাল ডায়েরিটিও ফরেনসিক পরীক্ষার আওতায় আনার প্রস্তুতি চলছে। তদন্তকারী সূত্রের দাবি, ওই ডায়েরিতে হাতে লেখা এমন একাধিক তথ্য রয়েছে, যেখানে জেলার কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং প্রশাসনের কিছু আধিকারিকের সঙ্গে টুলু মণ্ডলের কথিত আর্থিক লেনদেনের উল্লেখ রয়েছে। সেই লেখার সত্যতা, হস্তাক্ষর এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত দিক খতিয়ে দেখতে জেলা পুলিশকে সহায়তা করবে সিআইডির বিশেষজ্ঞ দল।

