এক বাঙালি মধ্যবিত্ত বাড়িতে গৃহসহায়কের বড় দরকার। কিন্তু বিপুল কাজের বহরের জন্য হোক, গৃহস্বামীদের কিপটেপনার জন্য হোক, বা অন্যতর কারণ- গৃহসহায়ক বা সহায়িকা সে-বাড়িতে টেকে না। চূড়ান্ত হতাশা এবং অব্যবস্থা যখন সংসারকে গ্রাস করেছে, তখন এক সকালে হাজির হল ধনঞ্জয়, 'চাকর' পদে। বাড়ির পুরুষ ও নারীগণ কাজে বহাল করার আগে ধনঞ্জয়ের স্কিল একটু বাজিয়ে ও ঝালিয়ে নেবে, এ তো স্বাভাবিক।
তো, ধনঞ্জয়কে জিজ্ঞেস করা হল- কী বাঙালি রান্না জানো বাপু? সে বলল- সব জানি। ঝোল, ঝাল, অম্বল, কালিয়া। মুগের ডাল নারকোল দিয়ে, অড়হর ডাল হিং দিয়ে, মটর ডাল চালতা দিয়ে। বাড়ির নববধূ জিজ্ঞেস করল- কাঁটাচচ্চড়ি জানো? ধনঞ্জয় বলল খুব সোজা। আপনাকে বরং একদিন পাঁঠাচচ্চড়ি করে খাওয়াব। বাঁধাকপির পুরুষ্টু ডাঁটা এবং পাঁঠার বাঁ-পাঁজরার হাড় দিয়ে। বাড়ির বুড়ো দাদুর বায়না দই-ইলিশ পারো, কত দিন খাই না? ধনঞ্জয় বলল- কমন আইটেম। তার চেয়ে আপনাকে একদিন কইপয়োধি খাওয়াব।
আসলে, ধনঞ্জয় মনে করে, রান্না একটা শিল্প। সব শিল্পের যদি বিকাশ ও অগপ্রতি ঘটে, তাহলে রান্নারই বা ঘটবে না কেন? বাঙালি হেঁশেলে তো অজস্র ধরনের চাটনি হয়- যেমন: কাঁচা আম, জলপাই, টমেটো, আলুবোখারা, পেঁপে। ধনঞ্জয় নাকি একটি ‘স্পেশাল চাটনি’ জানে। কাঁচা আমড়া ছেঁচে সরষে দিয়ে। বাড়ির সকলে এসব শুনে অবাক হয়। সন্দেহেও ভোগে। সত্যিই কি লোকটি এতশত পারে, না কি মুখেই বাঘ মারতে ওস্তাদ? কিন্তু যেদিন সে কাঁচকলার কোপ্তা বেঁধে তাক লাগিয়ে দিল, খেতে খেতে বাড়ির প্রত্যেকের মনে হল- এটি মাংসের কোপ্তা, সেদিনের পর থেকে ধনঞ্জয়ের রান্নার হাত নিয়ে কারও আর কোনও সংশয় রইল না।
সম্প্রতি, বিশিষ্ট শেফ সঞ্জীব কাপুর একটি সাক্ষাৎকারে ‘হোম-মেড মিল’ বা ঘরের রান্না নিয়ে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। এমন নয়, কথাটি নতুন। কিন্তু সামাজিক সংশ্লেষণের বহুমুখী অভিযোজনের মাঝে কথাটিকে নতুনভাবে দেখা যেতে পারে।

তপন সিনহার ‘গল্প হলেও সত্যি’ ছবিটি বাঙালি মধ্যবিত্তের চিত্তপ্রসাদ ও মনের মানচিত্রের এত
পরতকে আবিষ্কার করেছে বলার নয়। এর মধ্যে রান্নার অংশটি আলাদা করে দাগ কাটে। বাড়িতে হওয়া রোজের রান্নার মতো একঘেয়ে কাজ হয়তো আর দু’টি নেই। কিন্তু তা অলক্ষ্যে সংসারের প্রাণভ্রমর। বাঙলির হৃদয়ে অনুপ্রবেশের পথটি যে পেটের সুড়ঙ্গ ধরেই ধাবিত। তুচ্ছ পদ, তুচ্ছ উপাদান, অনুরাগ ও স্কিলের সমন্বয়ে বিদ্যুৎ ছড়ায়।
সম্প্রতি, বিশিষ্ট শেফ সঞ্জীব কাপুর একটি সাক্ষাৎকারে ‘হোম-মেড মিল’ বা ঘরের রান্না নিয়ে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। এমন নয়, কথাটি নতুন। কিন্তু সামাজিক সংশ্লেষণের বহুমুখী অভিযোজনের মাঝে কথাটিকে নতুনভাবে দেখা যেতে পারে। ‘ফুড ডেলিভারি অ্যাপস রিফ্লেক্টস চেঞ্জিং লাইফস্টাইলস, বাট কিডস শুড নো ভ্যালু অফ আ হোম-কুকড মিল।’ এখন চাকরির ধরন বদলেছে। বদলেছে কাজের সময়, জীবনযাপন ও খাওয়াদাওয়ার চরিত্র। ফুড ডেলিভারি অ্যাপ এই পরিবর্তিত চাহিদাকে পুষ্ট করছে। কিন্তু বাড়ির রান্নায় উপযোগিতা ও মূল্যবোধের নির্যাস ধরা পড়ে। ‘জেনজি’ যেন তা বোঝে। সঞ্জীব কাপুরের কথায় ধনঞ্জয়ের গল্প ও সাংসারিক শিক্ষাই যেন সত্যি হয়ে উঠল।
