তিনি ছিলেন পর্দার আড়ালের আসল কারিগর। যে মানুষটি বায়ুসেনার আকাশ ছুঁয়েছিলেন, যাঁর মগজাস্ত্রের ওপর ভরসা করে নন্দীগ্রাম থেকে ভবানীপুর- রাজনীতির ময়দানে চাল চালতেন শুভেন্দু অধিকারী, সেই চন্দ্রনাথ রথের এমন করুণ পরিণতি মানতে পারছে না রাজনৈতিক মহল। রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনের প্রাক্তনী থেকে বায়ুসেনার অফিসার এবং শেষমেশ রাজনীতির রণকুশলী- চন্দ্রনাথের জীবনকাহিনি যেন কোনও রোমাঞ্চকর উপন্যাসের চেয়ে কম নয়।
মিশন থেকে বায়ুসেনা: এক মেধাবীর উত্তরণ
চন্দ্রনাথের আদি বাড়ি পূর্ব মেদিনীপুরের চণ্ডীপুরে। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র হিসেবে শৈশব থেকেই পরিচিত ছিলেন তিনি। ২০০০ সালে উত্তর ২৪ পরগনার বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রহড়া রামকৃষ্ণ মিশন থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে মাধ্যমিক পাশ করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার পাঠ চুকিয়ে সরাসরি যোগ দেন ভারতীয় বায়ুসেনায় (Indian Air Force)। শর্ট সার্ভিস কমিশনে অফিসার হিসেবে কয়েক বছর দেশসেবা করার পর অবসর গ্রহণ করেন তিনি।
শুভেন্দুর 'প্রশ্নাতীত' বিশ্বাস ও রাজনীতির আঙিনা
পরিবারে রাজনীতির পরিবেশ ছিল আগে থেকেই। তাঁর মা হাসি রানী রথ চণ্ডীপুর পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য হিসেবে দীর্ঘ লড়াই করেছেন। বায়ুসেনা থেকে ফিরে চন্দ্রনাথ রাজনীতির ময়দানে পা রাখলেও তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল পর্দার আড়ালে থেকে সাংগঠনিক কাজ পরিচালনা করা। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে শুভেন্দু অধিকারী যখন বিজেপিতে যোগ দেন, তখন চন্দ্রনাথই ছিলেন তাঁর প্রধান সহযোদ্ধা।
ঘনিষ্ঠদের মতে, শুভেন্দুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল গভীর আনুগত্য ও অটুট বিশ্বাসের। ভবানীপুর উপনির্বাচন থেকে শুরু করে নন্দীগ্রামের হাই-ভোল্টেজ লড়াই- শুভেন্দুর প্রতিদিনের সূচি তৈরি করা, মিটিং গোছানো এবং রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে চন্দ্রনাথের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য।
ঘাতক এলো চুরির গাড়িতে: শেষ ১০ ঘণ্টা কী হয়েছিল?
বুধবার রাতে মধ্যমগ্রাম থেকে ফেরার পথে ঘটে সেই হাড়হিম করা হত্যাকাণ্ড। প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী, দুষ্কৃতীরা একটি গাড়ি নিয়ে এসে হঠাৎ চন্দ্রনাথের পথ আটকায়। এরপর পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে তাঁকে লক্ষ্য করে একের পর এক গুলি চালানো হয়। গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়েন তিনি।
তদন্তে নেমে সিআইডি (CID) একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য জানতে পেরেছে। যে গাড়িটি ব্যবহার করে চন্দ্রনাথের পথ আটকানো হয়েছিল, সেটি আসলে একটি চুরির গাড়ি। বৃহস্পতিবার সকালেই ঘটনাস্থল থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছেন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা। আততায়ীরা যে পেশাদার খুনি এবং তাদের পেছনে বড় কোনও মাথা রয়েছে, তা নিয়ে একপ্রকার নিশ্চিত গোয়েন্দারা। তবে ঘটনার পর বেশ কয়েক ঘণ্টা কেটে গেলেও এখনও পর্যন্ত কেউ গ্রেফতার না হওয়ায় বাড়ছে ক্ষোভ।
শুভেন্দু অধিকারীর ছায়াসঙ্গীর এই খুনের ঘটনায় বাংলার রাজনৈতিক সমীকরণ এখন কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে গোটা রাজ্য। একজন প্রাক্তন সেনাকর্মী এবং মেধার অধিকারী মানুষের এমন রক্তাক্ত সমাপ্তি কি কেবলই রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনও রহস্য? উত্তর খুঁজছে পুলিশ।

