রাজ্যের গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড-'সমবায় সমিতি'। কিন্তু গত কয়েক বছরে এই সমবায়গুলো ঘিরেই বারবার উঠে এসেছে আর্থিক অনিয়ম, স্বজনপোষণ এবং দুর্নীতির মারাত্মক অভিযোগ। সাধারণ কৃষক ও গ্রাহকদের প্রতারিত হওয়ার ঘটনা রাজ্য সরকারের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতির মোকাবিলায় এবং সমবায়ের হৃত গৌরব ফেরাতে এবার কঠোর অবস্থানে রাজ্য প্রশাসন।
আসন্ন ‘সমবায় সপ্তাহ’ কর্মসূচিকে সামনে রেখে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পাঠ দিতে নয়া উদ্যোগ নিলেন নবান্ন।
প্রথা ভাঙছে নবান্ন:
ঐতিহ্যগতভাবে সমবায় সপ্তাহ মানেই শোভাযাত্রা বা আলোচনা সভা। কিন্তু এবার সরকার সেই প্রথাগত ছক থেকে বেরিয়ে এসেছে। নবান্ন সূত্রে খবর, এবার প্রতিটি জেলা, মহকুমা এবং ব্লকস্তরে আধিকারিক ও সাধারণ সদস্যদের জন্য বিশেষ ‘ওয়ার্কশপ’ বা কর্মশালার আয়োজন করা হবে। এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্যই হলো-তৃণমূল স্তর থেকে দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলা।
কী কী থাকছে এই কর্মশালায়?
সরকারের লক্ষ্য হলো সাধারণ সদস্যদের তাঁদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা। প্রশাসনিক কর্তারা মনে করছেন, সদস্যরা যদি নিয়মকানুন সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকেন, তবে পরিচালন পর্ষদের পক্ষে কারচুপি করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। কর্মশালায় মূলত যে বিষয়গুলোর ওপর জোর দেওয়া হবে:
আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা: বার্ষিক অডিট বা নিরীক্ষণের আইনি নিয়মাবলী সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশিক্ষণ।
তথ্য অধিকার: সদস্যদের কাছে সমিতির প্রতিটি আয়-ব্যয়ের হিসাব স্বচ্ছভাবে তুলে ধরার পাঠ।
ডিজিটাল রূপান্তর: খাতা-কলমের পুরনো হিসেবনিকেশের বদলে ডিজিটাল ও কোর ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার বাধ্যতামূলক ব্যবহার।
কেন এই পদক্ষেপ?
প্রাথমিক কৃষি সমবায় সমিতিগুলোতে ঋণ মঞ্জুরের ক্ষেত্রে স্বজনপোষণ এবং ভুয়ো নামে ঋণ পাইয়ে দেওয়ার মতো অভিযোগ প্রায়শই শোনা যায়। প্রশাসনের দাবি, দুর্নীতি রুখতে অনলাইন অডিট এবং ডিজিটাল লেনদেন অপরিহার্য। এর ফলে যেকোনো সময় সমিতির আর্থিক লেনদেন যাচাই করা সম্ভব হবে, যা বেনিয়মের সুযোগ কমিয়ে দেবে।
প্রশাসনের স্পষ্ট বার্তা:
নবান্নের এক পদস্থ আধিকারিক সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, “সমবায় ব্যবস্থা গ্রামীণ মানুষের শেষ ভরসার জায়গা। এখানে কোনো প্রকার আর্থিক দুর্নীতি বরদাস্ত করা হবে না।” সঠিক সময়ে বার্ষিক সাধারণ সভা (AGM) আয়োজন এবং অডিট রিপোর্ট পেশ করার ব্যাপারেও কড়া নির্দেশিকা জারি করছে রাজ্য সমবায় দফতর।
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, নবান্নের এই পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে এবং সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনবে। এখন দেখার বিষয়, সমবায় সপ্তাহের এই সচেতনতা প্রচার বাস্তবে কতটা দুর্নীতির লাগাম টানতে পারে।

