উত্তম কুমার টালিগঞ্জের চলচ্চিত্র জগতে একটা যুগ। উনি যেভাবে একচ্ছত্র আধিপত্য রেখেছিলেন, দ্বিতীয় কেউ হয়নি, হবেও না। তাঁর ভুবন ভোলানো হাসি, সেই মুখ—সবটাই আজও মনে পড়ে। এত নিষ্ঠার সঙ্গে অভিনয় করতেন, চরিত্রের মধ্যে একেবারে ডুবে যেতেন। শটের শেষে নিজেই জানতে চাইতেন, 'হ্যারে, ঠিক হয়েছে তো?'
প্রতিটা সহ-অভিনেতার সঙ্গে খুব ভাল ব্যবহার করতেন। সহযোগিতা করতেন। শুধু তাই নয়, একটা শট দেওয়ার পর যদি তাঁর মনে হত ভাল হয়নি, তাহলে আবার নেওয়ার অনুরোধ করতেন। বলতেন, 'আরেকটা শট নে ভাই।' আরও ভাল করার যে চেষ্টা, সেটা ওঁর মধ্যে সবসময় দেখা যেত।
প্রথম আলাপ
উত্তম কুমারকে প্রথম দেখার কথা আজও মনে আছে। ছবির নাম ছিল 'সমাধান'। উনি বাড়ির বড় দাদার চরিত্রে অভিনয় করছিলেন। তখন উনি ক্যারেক্টর অ্যাক্টিং করছিলেন। শটে ঢুকলেন, আর ঢুকেই মনে হল পুরো দৃশ্যটা উনি একা খেয়ে নিয়েছেন। কিন্তু উনি কখনও দৃশ্যটা একা নিজের করে নিতেন না। প্রতিটা সহ-অভিনেতাকে যথাযথ মর্যাদা দিয়ে অভিনয় করতেন।
আর একটা ঘটনা খুব মনে পড়ে। টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োর একদম পিছনের দিকে ফ্লোরে একটা গাছ ছিল। একটা হুঁকো খাওয়ার শট ছিল। দেখি, রোদ্দুরে বসে একা একা হুঁকো খাচ্ছেন। চরিত্রে একেবারে ঢুকে যেতেন। ওঁর সঙ্গে যে সমস্ত সহশিল্পী ছিলেন, যেমন সৌমিত্র দা (চট্টোপাধ্যায়), তাঁরাও ওঁকে খুব ভালবাসতেন। আমাদের মতো জুনিয়র শিল্পী যাঁরা ছিলেন, তাঁদের সকলকেও উনি খুব ভালবাসতেন।
উত্তম কুমারের ছবি যতগুলি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেত, প্রতিটা শো হাউসফুল যেত। আর এটা সত্যি, মা-মাসিমারা উত্তম কুমারের জন্য উন্মাদ ছিলেন। উত্তমদা যেদিন প্রয়াত হলেন, ভবানীপুরের রাস্তা দিয়ে তাঁর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। প্রতিটা বারান্দায় মহিলারা ভিড় করে কাঁদছিলেন। মনে হচ্ছিল, তাঁদের আপন কেউ চলে গেল।
এই ভালবাসাটা বাংলার আর কোনও শিল্পী পাননি। ১০০ বছর ধরে উনি-ই স্টার। উত্তম কুমার উত্তম কুমারই, দ্বিতীয়বার হবে না।

