দ্য ওয়াল ব্যুরো: রাজ্য সরকারের 'অন্নপূর্ণা যোজনা'র (Annapurna Yojana) ফর্ম পূরণ নিয়ে আমজনতার চিন্তা দূর করতে এবার বড়সড় পদক্ষেপের ইঙ্গিত মিলল। ১২ পৃষ্ঠার দীর্ঘ ফর্মে চাওয়া একগাদা নথির জেরে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড় হতেই এবার এই প্রক্রিয়া আরও সহজ করার কথা ভাবছে প্রশাসন।
রাজ্যের নারী-শিশু উন্নয়ন ও সমাজকল্যাণ দপ্তরের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল (Agnimitra Paul) বৃহস্পতিবার স্পষ্ট জানিয়েছেন, উপভোক্তাদের সুবিধার্থে প্রয়োজনে এই ফর্মের সরলীকরণ করা হতে পারে এবং এই বিষয়ে তিনি স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে কথা বলবেন।
অন্নপূর্ণা যোজনা ছিল মূলত বিজেপির একটি বড় নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। রাজ্যে সরকার গঠনের পর মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই এই প্রকল্পের অনুমোদন মেলে, যার মাধ্যমে পূর্বতন 'লক্ষ্মীর ভাণ্ডার' প্রকল্পের উপভোক্তাদের ভাতার অঙ্ক দ্বিগুণ করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গত বুধবার সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রকল্পের ফর্ম প্রকাশ করার পর থেকেই রাজ্যজুড়ে সাইবার ক্যাফে এবং স্থানীয় সরকারি দফতরগুলিতে ফর্ম তোলার জন্য উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে ফর্ম হাতে আসতেই উপভোক্তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। ১২ পৃষ্ঠার এই দীর্ঘ ফর্মে আবেদনকারী এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের জমি-জায়গার দলিল, আধার কার্ড, প্যান কার্ড থেকে শুরু করে ব্যাঙ্কের নথি-সহ যাবতীয় খুঁটিনাটি তথ্য চাওয়া হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ নথি জোগাড় এবং ফর্ম পূরণ কীভাবে সম্ভব, তা নিয়েই এখন জোর চর্চা চলছে সর্বত্র।
ফর্মের এই জটিলতা নিয়ে পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ এদিন জানান, 'সবই সরলীকরণ হবে। তবে যাকে ইচ্ছে তাকে এই সুবিধা দিয়ে দেওয়া হবে না, যাতে বাংলাদেশিরা এর সুবিধা নিয়ে যেতে না পারে। আগে যেমন জিএসটি নিয়ে জটিলতা থাকলেও এখন তা ভালো হয়েছে, তেমনই এত বড় একটা প্রকল্পের কাজে কিছু তথ্য চাওয়া হলে তা দিতে হবে, এতে অসুবিধা কোথায়?'
অন্যদিকে, নারী-শিশু উন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল মা-বোনেদের পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, 'বাংলার মা-বোনেদের যদি ফর্ম পূরণ করতে অসুবিধা হয় এবং তাঁরা যদি বদল চান, তবে ফর্মের সরলীকরণ অবশ্যই হবে। কারণ এই প্রকল্প তো আসলে তাঁদের জন্যই।' তবে এর পাশাপাশি তিনি উপভোক্তাদের একটি বিশেষ অনুরোধও করেছেন। তিনি বলেন, 'আপাতত আমরা আয়করের বিষয়টা দেখছি এবং বাকি ডেটাগুলো ভবিষ্যতের জন্য সংগ্রহ করে রাখতে চাইছি। আমি মা-বোনেদের অনুরোধ করব, আপনারা ফর্মে কোনও অসত্য তথ্য দেবেন না। কারণ এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই কঠোর যাচাই প্রক্রিয়া চলবে। ভুল তথ্য দিলে আপনারা চিহ্নিত হয়ে যেতে পারেন। আমরা চাইছি প্রকৃত গরিব মা-বোনেরা এই টাকা পান, তাই যিনি আবেদন করছেন শুধুমাত্র তাঁর ক্ষেত্রটাই যাচাই করা হবে।'
১২ পাতার এই দীর্ঘ ফর্ম নিয়ে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন যে, এই ফর্মের মাধ্যমেই আসলে রাজ্য সরকার নাগরিকদের পরিবার সংক্রান্ত একটি বিস্তারিত তথ্যভাণ্ডার বা ডেটা সংগ্রহ করছে, আর সেই কারণেই ফর্মটি এত দীর্ঘ হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ফর্মটি অনলাইন এবং অফলাইন— দুই মাধ্যমেই পূরণ করা যাবে। যাঁরা নিজেরা ফর্ম পূরণ করতে পারবেন না, তাঁদের সাহায্যের জন্য সরকারি আধিকারিকরা সরাসরি বাড়ি বাড়ি ঘুরবেন। এমনকি স্থানীয় বিধায়কদেরও এই কাজে দায়িত্ব নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অফলাইনে এই ফর্ম বিডিও অফিস, ডিএম অফিস, পুরসভা এবং ওয়ার্ড অফিস থেকে সংগ্রহ করা যাবে। এছাড়া পুরসভার কর্মীরাও বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফর্ম পৌঁছে দেবেন এবং পূরণ করার পর তা কাছাকাছি সরকারি অফিসে জমা দেওয়া যাবে। যোগ্য আবেদনকারীদের তথ্য সরকারি কর্মীরা খতিয়ে দেখার পরই এই প্রকল্পের সুবিধা মিলবে।
এদিকে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও ভিড় এড়াতে নবান্ন সূত্রে জানা গেছে এক বিশেষ পরিকল্পনার কথা। জেলাগুলিতে সাধারণ মানুষের সহায়তার জন্য গ্রাম পঞ্চায়েত স্তরে বিশেষ ক্যাম্প বা 'সহায়তা শিবির' করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগকে সফল করতে ইতিমধ্যেই গ্রাম পঞ্চায়েত কর্মীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণও দেওয়া শেষ। যদিও এখনও পর্যন্ত এই বিষয়ে নবান্নের তরফ থেকে চূড়ান্ত কোনও সরকারি গাইডলাইন বা নির্দেশিকা জারি করা হয়নি, তবুও প্রতিটি ব্লকের বিডিও-দের (BDO) নিজস্ব পরিকল্পনা তৈরি রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের মূল লক্ষ্য হলো, ভিড় নিয়ন্ত্রণ করে অত্যন্ত সুষ্ঠুভাবে পরিষেবা প্রদান করা, যাতে কোথাও কোনও ধরনের বিশৃঙ্খলা বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি না হয়। সেই নিয়ম মেনেই ধাপে ধাপে আবেদনপত্র সংগ্রহ এবং পরিষেবা বণ্টনের ওপর জোর দিচ্ছে রাজ্য সরকার।

