দ্য ওয়াল ব্যুরো: বয়স বাড়লে হাঁটুর ব্যথা হবে, এটাই স্বাভাবিক— এই ধারণা নিয়ে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে তীব্র কষ্ট সহ্য করছিলেন এক কৃষক। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান দেখাল ম্যাজিক। কোনও রকম হাঁটু প্রতিস্থাপন (Knee Replacement) ছাড়াই, শুধুমাত্র একটি বিশেষ অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তিনি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ এবং স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করছেন।
বেঙ্গালুরুর এই ঘটনাটি প্রমাণ করল যে, আর্থ্রাইটিস বা বাতের ব্যথার একমাত্র সমাধানই হাঁটু প্রতিস্থাপন নয়।
পেশায় কৃষক সত্যবাবু। বছরের পর বছর ধরে মাঠে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হয়েছে তাকে। ফলে একটা সময়ের পর হাঁটুতে তীব্র ব্যথা শুরু হয়। আর পাঁচজন সাধারণ মানুষের মতোই তিনি ভেবেছিলেন, বয়স হওয়া এবং কঠোর পরিশ্রমের কারণেই এই যন্ত্রণা। কিন্তু ধীরে ধীরে পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছায় যে, তাঁর স্বাভাবিক হাঁটাচলা, সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এবং মাঠে কাজ করা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার জোগাড় হয়। দীর্ঘ ১৫ বছর এই অসহ্য কষ্ট সহ্য করার পর অবশেষে তিনি চিকিৎসকের দ্বারস্থ হন।
হাসপাতালে সমস্ত পরীক্ষার পর চিকিৎসকরা জানতে পারেন, সত্যবাবু আর্থ্রাইটিসের পাশাপাশি 'বো-লেগ' (Bow-leg Deformity) বা পা বেঁকে যাওয়ার সমস্যায় ভুগছিলেন। সেখানে অর্থোপেডিক এবং রোবোটিক জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট সার্জারি বিশেষজ্ঞ ডা. মল্লিনাথ জি তাকে পরীক্ষা করেন। ডা. মল্লিনাথ তাকে তড়িঘড়ি হাঁটু প্রতিস্থাপনের পরামর্শ না দিয়ে, 'কারেক্টিভ রিঅ্যালাইনমেন্ট সার্জারি' (Corrective Realignment Surgery) বা পা সোজা করার অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন।
ডা. মল্লিনাথের মতে, অনেক রোগীই ভুলবশত মনে করেন যে আর্থ্রাইটিস হলেই একমাত্র পথ হাঁটু প্রতিস্থাপন। কিন্তু চিকিৎসকরা প্রথমে ওষুধ, ফিজিওথেরাপি, ইনজেকশন, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মতো সাধারণ পদ্ধতির চেষ্টা করেন। আর সঠিক সময়ে সঠিক রোগীর ক্ষেত্রে এই ' রিঅ্যালাইনমেন্ট সার্জারি' করা গেলে হাঁটু প্রতিস্থাপনের প্রয়োজনীয়তা বহু বছর পিছিয়ে দেওয়া বা পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব।
এই পদ্ধতিতে রোগীর হাঁটু বাদ না দিয়ে বা কৃত্রিম হাঁটু না বসিয়ে, পায়ের হাড়ের অ্যালাইনমেন্ট বা ভারসাম্য এমনভাবে ঠিক করা হয় যাতে শরীরের ওজন পুরো হাঁটুর ওপর সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে হাঁটুর ক্ষতিগ্রস্ত অংশের ওপর চাপ কমে যায়।
এর প্রধান সুবিধাগুলি হল:
• তীব্র ব্যথা অনেকটাই কমে যায়।
• হাঁটাচলা এবং পায়ের নড়াচড়া সহজ হয়।
• আর্থ্রাইটিস বা বাতের বাড়বাড়ন্ত ধীরগতির হয়ে যায়।
• হাঁটুর প্রাকৃতিক জয়েন্ট বা সন্ধিস্থল সুরক্ষিত থাকে।
• উপযুক্ত রোগীদের ক্ষেত্রে এই অস্ত্রোপচারের সুফল ১০ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত বজায় থাকে।
এরাজ্যের অর্থপেডিক সার্জন ডাঃ অর্ণব কর্মকার জানান, এটি কোনও নতুন পদ্ধতি নয়, এটি একটি দীর্ঘ সময় ধরে পরীক্ষিত (Time-tested) চিকিৎসা পদ্ধতি। তবে বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষ প্লেট ও স্ক্রুর ব্যবহার এবং উন্নত ডায়াগনস্টিক ব্যবস্থার কারণে এই রাজ্যেও অত্যন্ত নিখুঁতভাবে এবং অনেক কম কাটাকুটি করে এই অপারেশন সফলভাবে করা যাচ্ছে। বরং বলা ভাল অল্প বয়সে হাঁটুর ব্যথায় নি-রিপ্লেশমেন্টকে ঠেকিয়ে রেখে অনেক দিন ভাল রাখা সম্ভব হচ্ছে রোগীদের।
তিনি আরও বলেন, 'সাধারণত আমাদের হাঁটু মূলত তিনটি কম্পার্টমেন্ট বা অংশ নিয়ে গঠিত—মিডিয়াল (ভেতরের দিক), ল্যাটারাল (বাইরের দিক) এবং মালাইচাকির সংলগ্ন জয়েন্ট। আমাদের জীবনযাত্রা, মাটিতে বসা, ভারতীয় শৌচাগার ব্যবহার করা বা চাষবাসের কাজের কারণে অনেক সময় হাঁটুর পুরো অংশ নষ্ট না হয়ে কেবল ভেতরের দিকের অংশটি (মিডিয়াল সাইড) বেশি ক্ষয়ে যায়, এর ফলে পা বা হাঁটু বাইরের দিকে বেঁকে যায়, যাকে বলা হয় 'বো লেগস' (Bow Legs).
এই সার্জারির মাধ্যমে আমরা ক্ষয়ে যাওয়া হাড়ের অংশটি কেটে সোজা (Realign) করে দিই। ফলে শরীরের ওজনের যে চাপ এতকাল হাঁটুর খারাপ অংশে পড়ছিল, তা এবার ভাল বা সুস্থ অংশে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে। চাপ কমে যাওয়ার সাথে সাথেই রোগীর হাঁটুর ব্যথা পুরোপুরি দূর হয়ে যায়।'
• কম বয়সী রোগীদের ক্ষেত্রে: বিশেষ করে যাদের বয়স ৪০ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে এবং হাঁটু বেঁকে গেছে, তাদের জন্য এটি আদর্শ। কম বয়সে নি রিপ্লেসমেন্ট করলে কৃত্রিম জয়েন্টের স্থায়িত্বের (সর্বোচ্চ ২০-২৫ বছর) কারণে ভবিষ্যতে আবারও অপারেশনের জটিলতা থাকে। তাই তরুণ রোগীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা প্রথমেই নি রিপ্লেসমেন্টের পরামর্শ না দিয়ে এই সার্জারির কথা বলা হয়।
• নির্দিষ্ট অংশের ক্ষয়ে (Uni-compartmental Arthritis): যাদের হাঁটুর সব অংশ নষ্ট হয়নি, কেবল একটি নির্দিষ্ট কম্পার্টমেন্ট ক্ষয়ে গেছে এবং বাকি অংশ সুস্থ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই চিকিৎসা সবচেয়ে ভাল কাজ করে।
• পেশাগত কারণে যাদের ওপর চাপ পড়ে: যারা চাষবাসের কাজ করেন, নিচু হয়ে কাজ করেন বা দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে কাজ করেন, তাদের হাঁটুর ক্ষয় রুখতে এটি অত্যন্ত কার্যকর।
প্রথমে সত্যবাবুর একটি হাঁটুতে এই কারেক্টিভ সার্জারি করা হয়। ফলাফল আসে চমৎকার! দীর্ঘ বছর পর তিনি কোনও ব্যথা ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে শুরু করেন এবং নিজের দৈনন্দিন কাজে ফেরেন। এর তিন বছর পর যখন তাঁর অন্য হাঁটুতেও একই সমস্যা দেখা দেয়, তখন তিনি আত্মবিশ্বাসের সাথে দ্বিতীয় হাঁটুতেও একই অস্ত্রোপচার করান। আজ তিনি সম্পূর্ণ যন্ত্রণামুক্ত এবং স্বাভাবিক জীবনের ছন্দে ফিরে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ।
ডা. মল্লিনাথ জানিয়েছেন, ভারতীয়দের জীবনযাত্রায় উবু হয়ে বসা, বাবু হয়ে বসা বা মেঝেতে বসার প্রবণতা বেশি থাকে। কৃষক, গৃহবধূ বা যাঁদের পেশাগত কারণে পায়ে বেশি নমনীয়তা (Flexibility) প্রয়োজন, তাঁদের জন্য এই সার্জারি আশীর্বাদস্বরূপ। কারণ, ট্র্যাডিশনাল হাঁটু প্রতিস্থাপনের তুলনায় এই পদ্ধতিতে প্রাকৃতিক হাঁটু বজায় থাকায় মাটিতে বসা অনেক সহজ হয়।
তবে চিকিৎসকরা সতর্ক করেছেন যে, এই চিকিৎসা সবার জন্য প্রযোজ্য নাও হতে পারে। আর্থ্রাইটিসের তীব্রতা, রোগীর বয়স, পায়ের গঠন এবং সার্বিক স্বাস্থ্যের ওপর নির্ভর করেই একজন অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন।
আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসা সবার জন্য এক নয়। হাঁটুতে ক্রনিক ব্যথা হলে তা চেপে না রেখে যত দ্রুত সম্ভব বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সঠিক সময়ে চিকিৎসা করালে নিজের প্রাকৃতিক হাঁটু বাঁচিয়েই সুস্থ জীবনে ফেরা সম্ভব।

