দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্রত্যাশা মতোই শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী (Teacher Recruitment Scam) নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য রাজ্য সরকারকে (West Bengal Government) আরও কিছুটা বাড়তি সময় দিয়েছে শীর্ষ আদালত (Supreme Court)। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, আগামী ২০২৭ সালের ৩১ মে-র মধ্যে নবম-দশম ও একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে মোট ৩৫ হাজার শূন্যপদে নিয়োগের যাবতীয় কাজ শেষ করতে হবে।
নতুন করে শিক্ষক নিয়োগের মেয়াদ বাড়াতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের করা আর্জি মঞ্জুর করে সোমবার (৩১ অগস্ট) এই রায় দিয়েছে বিচারপতির বেঞ্চ। মামলায় পরবর্তী শুনানির তারিখ ধার্য করা হয়েছে ২০২৭-এর ৩১ মে। আদালতের এই নির্দেশে সাময়িক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেও দীর্ঘমেয়াদী অনিশ্চয়তা কাটে না বলে চিন্তিত 'যোগ্য' শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের একাংশ। একই সঙ্গে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর (Suvendu Adhikari) তৎকালীন বিরোধী দলনেতা হিসেবে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন আক্রান্তরা।
শীর্ষ আদালতের থেকে অতিরিক্ত সময় পাওয়া সত্ত্বেও আশার আলো দেখছেন না 'যোগ্য' শিক্ষকদের অনেকেই। 'যোগ্য শিক্ষক শিক্ষিকা অধিকার মঞ্চ'-এর মুখপাত্র মেহবুব মণ্ডল জানান, 'হাতে যেটুকু সময় পাওয়া গিয়েছে, তা মোটেও খুব বেশি নয়। এই সময়সীমার মধ্যে প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যে সমস্ত সমস্যা সামনে আসছে, সেগুলি দ্রুত সমাধানের জন্য সরকার পক্ষের উচিত সব পক্ষকে সঙ্গে নিয়ে আলোচনায় বসা।'
অন্যদিকে, 'যোগ্য' চাকরিহারা শিক্ষক চিন্ময় মণ্ডলের মতে, 'আজই হয়তো আমাদের চাকরি জীবনের ইতি ঘটতে পারত। সেখানে সুপ্রিম কোর্ট অতিরিক্ত সময় দেওয়ায় সাময়িক সুবিধা হল ঠিকই, তবে এটাই চূড়ান্ত সমাধান নয়। ৩১ মে ২০২৭-এর মধ্যেই পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে, কারণ শীর্ষ আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে এর পর আর সময় বাড়ানো হবে না।' পাশাপাশি, দীর্ঘ বছরের ব্যবধান ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার কারণে যাঁরা নতুন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি, তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়েও চিন্তাপ্রকাশ করেন তিনি।
উল্লেখ্য, প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মের দায়ে ২০১৬ সালের এসএসসি প্যানেল বাতিল হওয়ার পর 'যোগ্য' শিক্ষকদের নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court)। তবে ওবিসি সংরক্ষণ ও আইনি জটিলতায় ২০২৬-এর অগস্ট পর্যন্তও প্রক্রিয়া শেষ করতে পারেনি কমিশন। দীর্ঘকাল শিক্ষকতার পর ২০২৫-এর সেপ্টেম্বরে নতুন পরীক্ষায় বসলেও অনেকেই পাশ করতে পারেননি, যার ফলে শীর্ষ আদালতের দেওয়া সময়সীমা পর্যন্তই সবেতন কাজ করার সুযোগ পাবেন তাঁরা।
এমনই এক শিক্ষকের কথায়, 'সরকার কিছুটা সময় পেল, আমরাও পেলাম। কিন্তু আসল সমস্যার সুরাহা তো হল না! চাকরিটা আদৌ থাকবে কি থাকবে না, সেটাই পরিষ্কার নয়।' তৎকালীন বিরোধী দলনেতা থাকাকালীন শুভেন্দু অধিকারীর বারংবার দেওয়া প্রতিশ্রুতির প্রসঙ্গ তুলে ওই শিক্ষক বলেন, 'ক্ষমতায় এলে 'যোগ্য' শিক্ষকদের চাকরি বাঁচানোর বিষয়টি আইনি দিক থেকে দেখার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আবেদন, উনি যেন সিদ্ধান্ত নেন এবং আমাদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন।'
প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির দায়ে কেবল শিক্ষক পদপ্রার্থীরাই নন, কাজ হারিয়েছিলেন শিক্ষাকর্মীরাও (গ্রুপ-সি ও ডি)। তবে শিক্ষকদের মতো কাজ চালিয়ে যাওয়ার কোনও আইনি ছাড়পত্র তাঁরা পাননি। ফলে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে সম্পূর্ণ কর্মহীন তাঁরা। ২০২৬-এর মার্চ মাসে নতুন করে শিক্ষাকর্মী নিয়োগের পরীক্ষা নেওয়া হলেও অগস্টের শেষ দিন পর্যন্ত তার ফলপ্রকাশ হয়নি।
২০১৮ সালে পাথরপ্রতিমা আনন্দলাল আদর্শ বিদ্যালয়ে গ্রুপ-সি পদে যোগ দেওয়া সুজয় সর্দার জানান, ২০২৫-এর এপ্রিলে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে কাজ হারানোর পর থেকে তিনি ও তাঁর মতো অনেকে চরম অভাব-অনটনে দিন কাটাচ্ছেন। সুজয় বলেন, 'দেড় বছর ধরে এক টাকাও বেতন নেই। নতুন পরীক্ষাও দিয়েছি, কিন্তু রেজাল্ট আউট হয়নি। বিরোধী দলনেতা হিসেবে শুভেন্দু অধিকারী আমাদের আশ্বাস দিয়েছিলেন যে নতুন সরকার গড়ে আইনি পথ বের করা হবে। কিন্তু সরকার বদলের তিন মাস পার হয়ে গেলেও আমাদের বিষয়ে কোনও ইতিবাচক পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। সরকার যেন মানবিক দৃষ্টিতে আমাদের কথা বিবেচনা করে।'

