দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাংলায় শিল্প ও কর্মসংস্থানের খরা কাটাতে এবার বড়সড় লগ্নির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বিশ্বখ্যাত জাপানি সংস্থা মিৎসুবিশি কেমিক্যাল (Mitsubishi Chemical) এবার পশ্চিমবঙ্গে সেমিকন্ডাক্টর (Semiconductor) এবং ইলেকট্রিক ভেহিকল (EV) সেক্টরের উৎপাদন ইউনিট তৈরিতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করতে আগ্রহী।
বুধবার নবান্নে এসে রাজ্যের শিল্প ও অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে এ ব্যাপারে এক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক করেছেন মিৎসুবিশি কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শীর্ষ কর্তারা। ঠিক ৩০ বছর পর বাংলায় এই জাপানি জায়ান্টের প্রত্যাবর্তনকে অত্যন্ত ইতিবাচক বলেই মনে করছে নবান্ন।
বুধবার নবান্নে এসেছিলেন মিৎসুবিশির দুই কর্তা তেরুয়ো ফুজিতা (Teruo Fujita) এবং তোমাফুমি কোয়ামা (Tomafumi Koyama)। তাঁরা রাজ্যের শিল্প মন্ত্রী তাপস রায় (Tapas Roy) এবং অর্থ মন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তর সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন।
আন্তর্জাতিক স্তরে মিৎসুবিশি কেমিক্যালের সাম্প্রতিক স্ট্র্যাটেজি খতিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, নবান্নের এই বৈঠকটি মোটেও আকস্মিক নয়। বৈশ্বিক স্তরে চিন-নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প সাপ্লাই চেইন গড়ার যে চেষ্টা চলছে, ভারত সেখানে অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। মিৎসুবিশি কেমিক্যাল ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে যে, তারা ভারতের দ্রুত বাড়তে থাকা সেমিকন্ডাক্টর এবং ইলেকট্রিক ভেহিকল (EV) ইকোসিস্টেমের মূল 'সাপ্লাই চেইন' বা সরবরাহ শৃঙ্খলে নিজেদের শক্তপোক্তভাবে যুক্ত করতে আগ্রহী।
সেমিকন্ডাক্টরের জন্য প্রয়োজনীয় অতি-বিশুদ্ধ রাসায়নিক (Ultra-pure chemicals) এবং ইভি ব্যাটারির উপাদান তৈরিতে মিৎসুবিশি বিশ্বসেরা। ভারতে চিপ তৈরির কারখানা (Fab) এবং ইভি বিপ্লব যেভাবে গতি পাচ্ছে, সেখানে কাঁচামাল ও প্রযুক্তি সরবরাহ করতে ভারতে একটি বড় উৎপাদন ভিত্তি গড়তে মরিয়া জাপানি এই বহুজাতিক সংস্থা। আর সেই মেগা প্রজেক্টেরই অন্যতম দাবিদার হিসেবে এবার উঠে এলো পশ্চিমবঙ্গের নাম।
২ সপ্তাহের মধ্যে জমি দেখাবে রাজ্য সরকার
নবান্নের বৈঠক শেষে শিল্পমন্ত্রী তাপস রায় জানান, 'সেমিকন্ডাক্টর ও আধুনিক প্রযুক্তির উৎপাদন ইউনিটের জন্য সরকার কোথায় উপযুক্ত জমি দিতে পারে, তা নিয়ে দ্রুত একটি খসড়া প্রস্তাব তৈরি করা হচ্ছে। ঠিক দুই সপ্তাহ পর মিৎসুবিশির প্রতিনিধি দল আবার কলকাতায় আসবে। সেই সময় তাঁদের নির্দিষ্ট জমিগুলি দেখানো হবে'।
এর আগে ১৯৯৭ সালে হলদিয়ায় পিটিএ প্ল্যান্ট (Purified Terephthalic Acid - PTA) বসিয়েছিল মিৎসুবিশি কেমিক্যাল কর্পোরেশন। দীর্ঘ তিন দশক পর, ভারতের উদীয়মান চিপ ও ইভি মার্কেটে নিজেদের অংশীদারিত্ব বাড়াতে আবারও তাদের বাংলায় লগ্নির ইচ্ছাকে বড় সাফল্য হিসেবেই দেখছে বর্তমান সরকার।
লগ্নির লড়াই: বাংলার সামনে অসমের চ্যালেঞ্জ
তবে মিৎসুবিশির এই মেগা প্রজেক্ট পাওয়া কিন্তু বাংলার জন্য খুব সহজ হবে না। কারণ, ভারতের সেমিকন্ডাক্টর ও ইভি ম্যানুফ্যাকচারিং হাব হওয়ার দৌড়ে পশ্চিমবঙ্গের ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলছে উত্তর-পূর্বের রাজ্য অসম।
কলকাতায় আসার আগে তেরুয়ো ফুজিতা এবং তোমাফুমি কোয়ামা অসম সরকারের শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গেও বৈঠক সেরে এসেছেন, যেখানে ইতিমধেই টাটাদের চিপ ফেসিলিটি তৈরি হচ্ছে। ফলে সেমিকন্ডাক্টরের গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনে জায়গা করে নিতে শেষ পর্যন্ত কোন রাজ্য বেশি ছাড় ও অনুকূল পরিবেশ দিতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করছে মিৎসুবিশির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।
জুলাই মাসেই বাংলায় মেগা লগ্নির ছড়াছড়ি!
শুধু মিৎসুবিশি নয়, চলতি জুলাই মাসেই আরও একগুচ্ছ বড় লগ্নির ঘোষণা হতে চলেছে বাংলায়। নবান্ন সূত্রে এক নজরে রইল সেই তালিকা:
লাক্স কোজি (৬০০ কোটি): বুধবারই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে দেখা করেন হোসিয়ারি জায়ান্ট লাক্স কোজির কর্তা অশোক টোডি। আগামী ১১ জুলাই ডানকুনিতে ৬০০ কোটি টাকা লগ্নির মাধ্যমে তৈরি হতে চলা নতুন কারখানার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করবেন তাঁরা।
আমুল ডেয়ারি প্ল্যান্ট: আগামী ১৮ই জুলাই হাওড়ার সাঁকরাইলে আমুলের দই উৎপাদন ইউনিটের শিলান্যাস করতে কলকাতায় আসার কথা রয়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহর।
শ্যাম স্টিল (১০,০০০ কোটি): আগামী ২৭শে জুলাই বাঁকুড়ার মেজিয়াতে ১০ হাজার কোটি টাকার বিশাল ইস্পাত কারখানা গড়ে তোলার ঘোষণা করতে চলেছে শ্যাম স্টিল। সেই মেগা শিলান্যাস অনুষ্ঠানে হাজির থাকবেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও শিল্প মন্ত্রী তাপস রায়।

