দ্য ওয়াল ব্যুরো: অযোধ্যার রামমন্দিরের অনুদান-কেলেঙ্কারির (Ram Temple Theft) তদন্ত চলার মাঝেই সামনে এল নতুন বিস্ফোরক অভিযোগ। কেন্দ্রের প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রসচিব এস লক্ষ্মীনারায়ণন দাবি করেছেন, তিনি এবং তাঁর পরিবার যে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা মূল্যের সোনার আবরণ দেওয়া 'রামচরিতমানস' (Golden Ramcharitmanas) মন্দিরে দান করেছিলেন, সেটি হঠাৎ করেই দর্শনার্থীদের চোখের আড়াল করে দেওয়া হয়েছে।
বারবার জানতে চাইলেও মন্দির কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাননি বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
প্রাক্তন এই আমলার দাবি, এটি শুধুমাত্র একটি মূল্যবান উপহার ছিল না, বরং তাঁর পরিবারের বহু দশকের আধ্যাত্মিক বিশ্বাস এবং ভক্তির প্রতীক। তাঁর কথায়, প্রয়াত মা জীবনের প্রায় ১৫ থেকে ১৮ বছর ধরে ভগবান রামের নাম লিখে গিয়েছিলেন। সেই ভক্তির উত্তরাধিকার থেকেই তৈরি হয়েছিল এই বিশেষ 'রামচরিতমানস'। তিনি জানান, তাঁদের পরিবার দীর্ঘদিন ধরেই রামজন্মভূমি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। এমনকি আন্দোলনের সময় কন্যাকুমারী থেকে পাঠানো প্রথম ইটও নাকি তাঁর শ্বশুরবাড়ি থেকেই গিয়েছিল। লক্ষ্মীনারায়ণনের কথায়, 'আমরা রামের পরিবার বলেই নিজেদের মনে করি।'
অবসর গ্রহণের পর নিজের উপার্জনের একটি বড় অংশ ভগবান রামের উদ্দেশে উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলেও জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য, সরকারি পেনশনেই তাঁর সাধারণ জীবনযাত্রা চলে যায়। তাই ঈশ্বর যে সম্পদ দিয়েছেন, তা আবার ঈশ্বরের কাজেই ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন।
২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে তিনি এবং তাঁর স্ত্রী সরস্বতী রামমন্দির ট্রাস্টকে এই সোনার আবরণ দেওয়া 'রামচরিতমানস' উপহার দেন। প্রায় ১৪৭ কেজি ওজনের এই গ্রন্থটি সোনা, রুপো এবং তামা দিয়ে তৈরি। এতে রয়েছে ৫২২টি সোনার আবরণ দেওয়া পৃষ্ঠা এবং গোস্বামী তুলসীদাসের রচিত 'রামচরিতমানস'-এর ১০ হাজার ৯০২টি শ্লোক।
লক্ষ্মীনারায়ণনের দাবি, প্রথম কয়েক মাস এই বিশেষ গ্রন্থটি মন্দিরে প্রদর্শিত হত এবং প্রতিদিন ভক্তরা সেটি দর্শন করতেন। 'প্রতিদিন পুজো হত, মানুষ দেখতেন। তখন আমি খুব আনন্দ পেতাম। কিন্তু হঠাৎ একদিন সেটি সরিয়ে দেওয়া হল,' বলেন তিনি। প্রথমে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, গ্রন্থটি গর্ভগৃহের কাছেই রাখা হবে। পরে জানানো হয়, অন্যত্র রাখা হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই প্রতিশ্রুতিও রক্ষা হয়নি বলে অভিযোগ তাঁর। প্রায় পাঁচ মাস প্রদর্শনের পর আচমকাই সেটি উধাও হয়ে যায় বলে দাবি করেছেন প্রাক্তন আমলা।
এরপর থেকেই উত্তর খোঁজা কঠিন হয়ে দাঁড়ায় বলে অভিযোগ তাঁর। তিনি জানান, বহুবার অযোধ্যায় গিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তাদের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু প্রতিবারই দেখা করা কঠিন হয়ে উঠেছে। কোনও স্পষ্ট জবাবও মেলেনি। তাঁর দাবি, তিনি কখনও প্রচার চাননি। শুধু স্বচ্ছতা চেয়েছেন। কারণ এটি কোটি কোটি ভক্তের বিশ্বাসের বিষয়। তাঁর কথায়, 'আমি কোনও সম্মান বা প্রচার চাইনি। শুধু জানতে চেয়েছি, ভক্তদের নিবেদন ঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে কি না।'
সম্প্রতি মন্দির ঘিরে অনুদান-কেলেঙ্কারির খবর প্রকাশ্যে আসার পর পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে বলে দাবি করেছেন তিনি। লক্ষ্মীনারায়ণনের কথায়, 'মানুষ আমাকে প্রশ্ন করতে শুরু করেছে, আমার দান করা রামচরিতমানস নিরাপদ তো? এই প্রশ্ন আমাকে খুবই বিচলিত করেছে।' তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী, রাজ্যের শীর্ষ আধিকারিক এবং মন্দির প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত একাধিক ব্যক্তির কাছেও আবেদন করেছেন। তাঁর একটাই দাবি ছিল - কোথায় কী রাখা আছে, সবকিছুর হিসেব প্রকাশ্যে আসুক।
স্থানীয় স্তরে সাড়া না পেয়ে পরে তিনি বিষয়টি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছেও তোলেন। হায়দরাবাদের একটি অনুষ্ঠানে সঙ্ঘ প্রধান মোহন ভাগবতের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎও হয়। লক্ষ্মীনারায়ণনের দাবি, ভাগবত অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে তাঁর বক্তব্য শুনেছিলেন এবং সাহায্যের আশ্বাসও দিয়েছিলেন। কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোনও অগ্রগতি হয়নি বলেই অভিযোগ তাঁর।
শেষ পর্যন্ত তাঁর দাবি - স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতা। তিনি চান, তাঁর দান করা সোনার 'রামচরিতমানস' কোথায় রয়েছে, তার স্পষ্ট তথ্য সামনে আসুক এবং সেটিকে ফের আগের জায়গায় রাখা হোক। তাঁর কথায়, 'আমি ভক্তি থেকে এই দান করেছি। শুধু জানতে চাই, এর কী হল এবং ভক্তদের নিবেদন ঠিকভাবে রক্ষা করা হচ্ছে কি না।'

