দ্য ওয়াল ব্যুরো: পুজোর মুখে পেটপুজো নিয়ে এতটা চিন্তিত হতে হবে, তা বোধহয় ভাবতেও পারেননি ভোজনরসিক বাঙালি! নামীদামি রেস্তরাঁর ঝাঁ চকচকে ডাইনিং হল, কিন্তু আড়ালে যে অন্ধকার রয়েছে তাতেই স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তা যেমন বাড়ছে, পাল্লা দিয়ে কমছে ব্র্যান্ডের নামে উপর থাকা ভরসা। এবার সেই তালিকায় নাম উঠে এল ট্যাংরার বিখ্যাত 'বিগ বস' রেস্তরাঁর।
কলকাতার অন্যতম জনপ্রিয় রেস্তরাঁর ফ্রিজ থেকে অন্তত ৫০০ কেজি বাসি মাছ, মাংস বাজেয়াপ্ত করেছে কলকাতা পুরসভা।
পুরকর্মীদের দাবি, ফ্রিজের অস্বাস্থ্যকর ও খোলা পরিবেশে যত্রতত্র ফেলে রাখা হয়েছিল এসব মাংস। মাংস বা মাছ কবে ফ্রিজে ঢোকানো হয়েছিল, তার কোনও তারিখ বা লেবেল ছিল না। ফলে পুজো ও উৎসবের মুখে দাঁড়িয়ে জনস্বাস্থ্যের কথা ভেবে কোনও ঝুঁকি না নিয়ে সেই বিপুল পরিমাণ মাছ-মাংস বাজেয়াপ্ত করে সঙ্গে সঙ্গে ধাপায় ফেলার জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি খাবারের মান ও বিষক্রিয়া নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কড়া বার্তার পরেই যেন চৈতন্য ফিরেছে প্রশাসনের। রাজ্য জুড়ে খাবারের মান বজায় রাখতে এবং জাল বা পচা খাবারের কারবার রুখতে অল-আউট অ্যাকশনে নেমেছে রাজ্য খাদ্য দফতর ও স্থানীয় পুরপ্রশাসন।
মঙ্গলবারই বাদুড়িয়া ও মধ্যমগ্রামের একের পর এক নামী রেস্তরাঁয় হানা দিয়ে উদ্ধার হয়েছিল দিনের পর দিন জমিয়ে রাখা পচা মাংস। জেলায় জেলায় হোটেলের হেঁশেলের সেই সব গা-ঘিনঘিন করা ছবি দেখে আঁতকে উঠছিলেন মানুষ। সল্টলেক, শক্তিগড় থেকে শুরু করে পর্যটন কেন্দ্র দিঘাতও লাগাতার অভিযান চালিয়েছেন ফুড সেফটি আধিকারিকেরা।
সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলা কোনওভাবেই সহ্য করা হবে না, সরকারের এই 'জিরো টলারেন্স' (Zero Tolerance) নীতি মেনে এবার তিলোত্তমার বুকেও নামল পুরসভার দল।
অন্য দিকে, উত্তরবঙ্গ ও পাহাড়ে এখন পর্যটনের ভরা মরসুম। রিসর্টগুলিতে ছুটির মেজাজে ভিড় জমিয়েছেন শত শত পর্যটক। এই সুযোগে পর্যটকদের নিম্নমানের খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে কি না, তা দেখতে জলপাইগুড়ির লাটাগুড়ির একাধিক রিসর্টে চলে আকস্মিক অভিযান। বুধবার গরুমারা অভয়ারণ্য সংলগ্ন লাটাগুড়ির বেশ কয়েকটি রিসর্টে মহকুমাশাসকের (SDO) নেতৃত্বে বিশাল প্রশাসনিক দল রান্নাঘর ও ফুড স্টোরে হানা দেয়। কয়েকটি রিসর্টের রান্নাঘর থেকে উদ্ধার হয় মেয়াদউত্তীর্ণ (Expired) ও পচা খাদ্যসামগ্রী। অনিয়মের কারণে লাটাগুড়ির ৩টি রিসর্টকে কড়া ভাষায় সতর্ক করেছে প্রশাসন।
একই সময়ে হুগলির ভদ্রেশ্বরে বিধি ভেঙে ব্যবসা চালানো ও চরম নোংরা পরিবেশের জন্য একটি বেকারি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সেখানে পরিদর্শনে গিয়ে আধিকারিকদের চোখ তো কার্যত কপালে উঠার জোগাড়! পাউরুটি তৈরি হচ্ছে যেখানে, তার চারপাশে ভনভন করছে মাছি, কারিগরদের কারও হাতে গ্লাভস নেই, আর চাল-দেওয়াল জুড়ে ঝুলছে ঝুল আর ময়লা। পরিস্থিতি দেখে ফুড সেফটি আধিকারিকরা সাফ জানিয়ে দেন, সম্পূর্ণ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন না করা পর্যন্ত এই বেকারি আর খোলা যাবে না। এর পাশাপাশি এলাকার একটি বিখ্যাত মিষ্টির দোকান ও তার কারখানাতেও চলে তল্লাশি, সেখান থেকেও উঠে এসেছে চরম অস্বাস্থ্যকর ছবি।
অভিজাত ও নামীদামি রেস্তরাঁ কিংবা বেকারির রান্নাঘরের এই সব কঙ্কালসার চেহারা দেখে স্তম্ভিত আমজনতা। প্রশ্ন উঠছে একটাই, সাধারণ মানুষ তবে খাবারের জন্য বিশ্বাস করবেন কাকে? পুজোর সময় রেস্তরাঁগুলিতে এমনিই খাবারের মান পড়ে যায় বলে অভিযোগ শোনা যায় কান পাতলেই। তবে এবার পুজোর মুখে পুরসভার এই খানাতল্লাশিতে কি ছবিটা কিছুটা পাল্টাতে চলেছে, সেটাই এখন দেখার। বলাই বাহুল্য, হোটেল-রেস্তরাঁগুলি থেকে এই পচা-বাসি খাবার উদ্ধার হওয়ায় উস্কে উঠছে কিছু বছর আগের 'ভাগাড়ের মাংস' ঘটনার স্মৃতি।

