দ্য ওয়াল ব্যুরো: কালীঘাটে তৃণমূল বিধায়ক দলের বৈঠক ডাকা হয়েছিল। সেই বৈঠকে ক'জন যাবেন, তা নিয়ে দ্য ওয়ালেই সবার প্রথমে একটি প্রতিবেদন লেখা হয়। যার শেষ লাইনটাই ছিল, "ওই বৈঠক আচমকা, অপ্রত্যাশিত বা আকষ্মিক ভাবে বাতিল করে দিলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।" মজার ব্যাপার হল, এই লাইন, সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন অক্ষরে অক্ষরে মিলিয়ে দিয়ে রোববারের বৈঠক ভেস্তে গেল।
যার অন্যতম কারণ, এই বৈঠকে ৮০ জন বিধায়কদের মধ্যে মোটে ২০ জন বিধায়ক এসেছিলেন। বাকিরা নাকি জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা এলাকায় ব্যস্ত থাকার জন্য আসতে পারেননি।
এদিন বিকেলে কালীঘাটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) বাসভবনে তৃণমূল পরিষদীয় দলের বৈঠক ডাকা হয়েছিল। অর্থাৎ তৃণমূলের নির্বাচিত ৮০ জন বিধায়ককেই ডাকা হয় ওই বৈঠকে। কিন্তু সাকুল্যে ২০ জনের মতো বিধায়করা উপস্থিত হন। তখনই মোটামুটি দিয়ে দুইয়ে চার করা যাচ্ছিল যে, এই বৈঠক বুঝি ভেস্তেই যাবে। হলও তাই।
অবশ্য, বৈঠক স্থগিত হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে কুণাল ঘোষ বলেন, অনেক বিধায়ক দলীয় নেতৃত্বকে জানিয়েছেন যে তাঁরা দলের সঙ্গেই আছেন, তবে বর্তমানে নিজ নিজ এলাকায় বিভিন্ন সাংগঠনিক কাজে ব্যস্ত রয়েছেন। তাঁর কথায়, কেউ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর হামলার ঘটনার প্রতিবাদে মিছিল ও কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন, আবার কেউ মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার হওয়া দলীয় কর্মীদের আইনি ও সাংগঠনিক সহায়তা করতে ব্যস্ত। এই কারণে তাঁদের পক্ষে এলাকা ছেড়ে আসা সম্ভব হচ্ছে না। কুণাল ঘোষ আরও জানান, অনেকেই আগের দিন থেকেই দলের সঙ্গে যোগাযোগ করে বৈঠকটি অন্য কোনও দিনে করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। সেই অনুরোধের ভিত্তিতেই বৈঠকটি আপাতত সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে।
রাজনীতিতে কোনও কিছুই আগে থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তবু রবিবার সন্ধ্যায় যে ছবি সামনে এল, তাতে তৃণমূলের ভাঙনের ছবিটা স্পষ্ট। তবে এই রাজনৈতিক নাটকের শুরুটা হয়েছিল গতকাল। শনিবার থেকেই বাংলার রাজনীতিতে অশনি সঙ্কেত স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করেছিল।
শনিবার দলীয় আহত কর্মীদের দেখতে প্রথমে বেলেঘাটা এবং পরে সোনারপুরে যান অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। বেলেঘাটার কর্মসূচি তুলনামূলকভাবে নীরবেই হয়। সেখানে তাঁর সঙ্গে ছিলেন বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষ। তবে সোনারপুর সফরে ছবিটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তৃণমূলের কোনও পরিচিত নেতা বা মন্ত্রীকে তাঁর সঙ্গে দেখা যায়নি।
এক সময় তৃণমূলের যে কোনও কর্মসূচিতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে দলের একাধিক নেতা-মন্ত্রীকে সক্রিয়ভাবে উপস্থিত থাকতে দেখা যেত। কিন্তু শনিবার সোনারপুরে সেই ছবি অনুপস্থিত ছিল। এমনকি দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা তৃণমূলের কোনও গুরুত্বপূর্ণ নেতাকেও সেখানে দেখা যায়নি।
দলীয় সূত্রের দাবি, সোনারপুর সফরে অভিষেকের সঙ্গে থাকার জন্য ক্যামাক স্ট্রিটের অফিস থেকে একাধিক বিধায়ক ও সাংসদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। অভিষেক নিজেও কয়েকজন বিধায়ক ও সাংসদকে ফোন করেন বলে সূত্রের দাবি। কিন্তু অধিকাংশই বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে সফরে যোগ দেওয়া এড়িয়ে যান। কেউ ফোন বন্ধ রাখেন, আবার কারও মোবাইল নম্বরে কল ডাইভার্ট করা ছিল বলেও জানা গিয়েছে।
শুধু তাই নয়, সোনারপুরে অভিষেক হেনস্থার ঘটনার পর দলীয় কার্যালয় থেকে বেশ কয়েকজন বিধায়ককে ফেসবুকে ঘটনার নিন্দা জানিয়ে পোস্ট করার অনুরোধ করা হয়। তবে কুণাল ঘোষ ছাড়া অধিকাংশ বিধায়ক প্রকাশ্যে এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে আগ্রহ দেখাননি বলে সূত্রের দাবি।
বৈঠক ভেস্তে গেলেও কর্মীদের চাঙ্গা করতে বড় আন্দোলনের রূপরেখা ঘোষণা করেছে তৃণমূল। মুখপাত্র কুণাল ঘোষ সাফ জানিয়েছেন, আগামী ১ জুন (সোমবার) রাজ্যের প্রত্যেকটি পুর অঞ্চল এবং পঞ্চায়েত এলাকায় তীব্র প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করবে তৃণমূল কংগ্রেস।
কুণাল ঘোষ বলেন, সোনারপুরে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর নজিরবিহীন আক্রমণ হয়েছে। শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর আক্রমণ করা হয়েছে। এছাড়া নির্বাচন পরবর্তী সময়ে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে তৃণমূল কর্মীদের ওপর লাগাতার হামলা চালানো হচ্ছে। এই সমস্ত ঘটনার প্রতিবাদে ১ জুন রাজ্যের প্রতিটা কোণায় প্রতিবাদে নামবেন কর্মীরা।
শুধু বুথ বা অঞ্চল স্তরে আন্দোলনই নয়, বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে রাজ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে এবার সরাসরি রাস্তায় নামছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই। কুণাল ঘোষ জানিয়েছেন, আগামী ২ জুন কলকাতার রানি রাসমণি অ্যাভিনিউতে এক ধর্না কর্মসূচি করবেন তৃণমূল সুপ্রিমো। দলের তরফে জানানো হয়েছে, এই ধর্নায় একদিকে যেমন তৃণমূলের ওপর রাজনৈতিক হিংসার প্রতিবাদ জানানো হবে, তেমনই খোদ কলকাতার রাজপথে হকার উচ্ছেদ-সহ একাধিক জনস্বার্থবাহী ইস্যুকে সামনে রেখে সরব হবেন মমতা।

