সৈয়দ ইফতেখার হোসেন
এ বছর ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের ঠিক বাহাত্তর ঘন্টা আগে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে একটা চরম অসম বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো তা নিয়ে দেশের নানা মহলে বেশ আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে । এই চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি দেখতে ৫ মে তিন সদস্যের একটি মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করে গেলেন ।
৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে এই চুক্তিতে বাংলাদেশের পক্ষে সই করেন অন্তর্বর্তিকালীন সরকারের নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা খলিলুর রহমান। এর একদিন পরেই বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচন ছিল। এই চুক্তির প্রাতিষ্ঠানিক নাম 'শুল্ক বিষয়ক যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি'। যদিও এই চুক্তি প্রত্যেক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এক তরফা সুবিধা দিয়ে বাংলাদেশকে দেউলিয়া করার একটি প্রামাণ্য দলিল মাত্র। এই চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশকে মানতে হবে ১৩১ শর্ত আর যুক্তরাষ্ট্রকে মাত্র ছয়টি। এই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্র যে পরিমাণের সুযোগ সুবিধা পাবে সেই তুলনায় বাংলাদেশের প্রাপ্তি যতসামান্য বা শূন্য। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানিতে এক শতাংশ কর রেয়াত পাবে মাত্র। বিশ শতাংশ হতে উনিশ। ট্রাম্প প্রশাসন বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের উপর শুল্ক একক ভাবে বৃদ্ধি করে বলবত শুল্কের সঙ্গে ৩৭ শতাংশ যোগ করে যা পরবর্তীকালে দেশটির উচ্চ আদালত বাতিল করে দেয়। বাংলাদেশ বছরে যুক্তরাষ্ট্রে সাড়ে নয় বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে আর আমদানি করে দুই দশমিক তিন বিলিয়ন ডলারের পণ্য।
বর্তমান সময়ে যখন এই চুক্তি নিয়ে এত সমালোচনা চলছে তখন ড. ইউনুসের অবৈধ ও অসাংবিধানিক অন্তর্বর্তিকালীন সরকারের যতজন উপদেষ্টা ছিলেন সকলেই বলছেন এই চুক্তি সম্পর্কে তারা কিছু জানতেন না। সুতরাং বলতে হয় দেশ বেচার এই যে চুক্তিটা হলো সেটি সম্পর্কে একমাত্র ড. ইউনুস ও তাঁর নিরাপত্তা উপদেষ্টাই জানতেন। অন্তত ইউনুসের সভাপারিষদের কথা শুনলে তাই মনে হয়।
সকলকে অবাক করে দিয়ে সেই নিরাপত্তা উপদেষ্টা বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এমন নিয়োগ শুধু অবৈধই নয় অনৈতিকও বটে। তবে তাঁর কার্যকলাপে এটি প্রমাণ করে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ সংরক্ষণ করার জন্য তাদের নির্দেশেই বর্তমান সরকারে অন্তর্ভূক্ত হয়েছেন। সচেতন মানুষের ধারণা এই সব দেশ বিরোধী কাজ করবেন বলে তারেক রহমান যুক্তরাষ্ট্রকে মুচলেকা দিয়ে দেশে এসেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দায়িত্ব নিয়ে ঘোষণা করেছিলেন বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারকে ক্ষমতাচ্যূত করার জন্য তার পূর্ববর্তী সরকার ঊনত্রিশ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। পরে জানা গেছে ভারত হয়ে এসেছে আরও একত্রিশ মিলিয়ন ডলার। এই বিশাল পরিমাণের অর্থ বাংলাদেশের বিভিন্ন সুশীল সমাজের সদস্য ও তাদের অঙ্গ সংগঠনের পকেটে গেছে। তারা যুক্তরাষ্ট্র ডিপ স্টেটের অংশ। এই ব্যক্তিদের প্রায় সকলেই ড. ইউনুসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িত ছিলেন। শেখ হাসিনা সরকারকে উৎখাত করতে যুক্তরাষ্ট্র যে বিপুল পরিমাণের অর্থ ব্যয় করেছে এটি ছিলো বাংলাদেশে তাদের বিনিয়োগ যা নানা ধরণের চুক্তির মাধ্যমে তারা সুদে আসলে উসুল করে নেবে।
সম্প্রতি বোয়িং ক্রয়ের চুক্তি দিয়ে তা তারা শুরু করেছে। চুক্তি করার আগে চৌদ্দটি বোয়িং বিমান ক্রয়ের বাজেট ছিল পঁয়ত্রিশ হাজার কোটি টাকা। তবে যে চুক্তি হল তার পরিমান পঁয়তাল্লিশ হাজার কোটি টাকা। প্রশ্ন এই বাড়তি টাকা কার পকেটে যাবে?
বোয়িং উড়োজাহাজ ক্রয়ের জন্য বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর। তিনি দেশে দেশে সরকার উৎখাত বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ডোনাল্ড লু'র স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনে। সব চেয়ে বড় প্রশ্ন বিমানের বর্তমান ফ্লিটে যতগুলি বড় বিমান আছে সে গুলির জন্য পর্যাপ্ত রুট নেই সেখানে এত সব বিমান কোথায় চলবে? অনেক বছর ধরে ঢাকা-নিউয়র্ক, ঢাকা-রোম রুট বন্ধ। টোকিও রুটও বন্ধ হয়েছে। এই চিন্তা কি সরকারের নীতি নির্ধারকদের আছে?
এই চুক্তি নিয়ে কিছু তামাদি সুশীল আর ভুতপূর্ব বাম ছাড়া আর কেউ তেমন একটা উচ্চবাচ্য করে না। সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে নির্দলীয় সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা আলোচনা করেন। দেশের গণমাধ্যমগুলি এই চুক্তির ব্যাপারে অনেকটা নীরব। এই চুক্তির কোন মেয়াদ নেই । তবে কোন একটি পক্ষ চাইলে তা ষাট দিনের নোটিশে বাতিল করে দিতে পারে । মালয়েশিয়া ও ইউরোপিয় ইউনিয়ন ভুক্ত দেশগুলি ও যুক্তরাজ্যও সম্প্রতি তা করেছে ।
দুটি দেশের মধ্যে নানা বিষয়ে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি হওয়াটা একটি স্বাভাবিক বিষয়। হতে পারে তা বাণিজ্যিক বা নিরাপত্তা জনিত কিংবা আর্থিক সহায়তা। আবার যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন আর ফ্রান্স পূর্বে অলিখিত চুক্তি করেছিল আফগানিস্তান, লিবিয়া আর ইরাকে ক্ষমতাসীন নির্বাচিত দলকে ক্ষমতাচ্যুত করে সেই দেশগুলি দখল করার জন্য। তারা তাদের এই জনবিরোধী ও নাজায়েজ চুক্তি বাস্তবায়নে শুধু সফলই হয়নি তারা এই সব দেশের সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানকেও সকল আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করে হত্যাও করেছে। তাদের এমন পরিকল্পনা থেকে ভাগ্যক্রমে শেখ হাসিনা বেঁচে গেছেন।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ প্রথম ভারতের সঙ্গে ১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ একটি চুক্তি করে। এই চুক্তিটিতে স্বাক্ষর করেন তৎকালীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ভারতের পক্ষে সেই দেশের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী। এই চুক্তিটির নাম ছিল 'ভারত বাংলাদেশ মৈত্রী, সহযোগিতা ও শান্তি চুক্তি' । এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর তা বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে গৃহীত হয় । মনে রাখতে হবে তখন পর্যন্ত বাংলাদেশে বাহাত্তরের সংবিধান গৃহীত হয়নি । দেশ পরিচালিত হচ্ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রকে সামনে রেখে যা বর্তমানে জাতীয় সংসদের অনেক সদস্য বাতিল বা সংশোধন করতে চান । বাহাত্তরের সংবিধান রচিত ও গৃহীত হলে তার ১৪৫-ক ধারায় বলা হয়েছে 'বিদেশের সহিত সম্পাদিত সকল চুক্তি রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করিতে হইবে, এবং রাষ্ট্রপতি তাহা সংসদে পেশ করিবার ব্যবস্থা করিবেন। তবে শর্ত থাকে যে জাতীয় নিরাপত্তার সহিত সংশ্লিষ্ট অনুরূপ কোন চুক্তি কেবলমাত্র সংসদের গোপন বৈঠকে পেশ করা হইবে'। বুঝতে হবে বিষয়টি সব সময় অনুমোদনের বিষয় নয় বরং অবহিত করণের বিষয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে খলিল যে চুক্তিটি করে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে বন্ধক রেখে এসেছেন তা সংসদে উত্থাপন করা তো দূরে থাক তা তিনি বা ড. ইউনুস রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করার প্রয়োজনও বোধ করেননি।
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যখন ইন্দিরা গান্ধীর এই চুক্তিটি হয় তখনও বাংলাদেশের বাতাসে লাশ আর বারুদের গন্ধ । এখনকার ভারত আর তখনকার ভারতের মধ্যে বিস্তর ফারাক। তখন ভারত একটি স্বল্পোন্নত দেশ। ফি বছর দেশটির কোন কোন অঞ্চলে খাদ্যাভাব দেখা দেয়। এই সময়ে তাদের ঘাড়ের উপর বাংলাদেশ হতে যাওয়া প্রায় এক কোটি শরণার্থির বোঝা । এই বোঝার ভার বহন করা একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ । পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য ভারত সরকার দেশের সকল মানুষের উপর বাড়তি করের বোঝা চাপিয়ে দেয় যা ১৯৭৪ পর্যন্ত বলবৎ ছিল । যারা আজ 'দিল্লি না ঢাকা' করে তারা কি এই খবর জানে?
বঙ্গবন্ধু আর ইন্দিরা গান্ধির মধ্যে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মেয়াদ ছিল ত্রিশ বছর যা ২০০২ সালে শেষ হয়ে গিয়েছে । এই সময়ের মধ্যে বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার পর জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসেছেন। তারপর জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, বেগম খালেদা জিয়া দেশ শাসন করেছেন কেউই এই চুক্তি বাতিল করার প্রয়োজন মনে করেন নি অথচ এই চুক্তি স্বাক্ষর করার পরপরই নব গঠিত জাসদ সহ নানা রংয়ের বামপন্থী দল, একাধিক সুশীল ব্যক্তি চারিদিকে এই চুক্তিকে 'গোলামির চুক্তি' আখ্যা দিয়ে তা অনতিবিলম্বে বাতিল করার জন্য চারদিকে মাঠ গরম করার চেষ্টা করে ।
১৯৭২ সালে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে বারোটি ধারা ছিল । এই ধারার গুলোর মধ্যে ছিল শান্তি, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংষ্কৃতিক, প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য এক সাথে কাজ করার অঙ্গিকার, জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির সম্মূখিন হলে একে অন্যকে সহায়তা করা, জোট নিরপেক্ষ পররাষ্ট্র নীতি মেনে চলা, একে অপরের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান জানানো ইত্যাদি । এমন সব উন্মুক্ত ও প্রকাশিত ধারা সমূহকে নিয়েও শ্রেফ বঙ্গবন্ধুর শাসনকালকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য উল্লেখিত বিরোধী চক্রগুলি লুঙ্গিতে মালকোচা মেরে মাঠে নেমে পরে অথচ গত ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে দেশ বিরোধী চুক্তি দেশে সংসদ নির্বাচন হওয়ার বাহাত্তর ঘন্টা আগে ইউনুস সরকার করে নিল তা নিয়ে বর্তমান সরকারের কোন রা নেই ।
অন্যদিকে খলিলুর রহমান বলেছেন তারা এই চুক্তি করার আগে বিএনপি ও জামায়াতকে তা অবহিত করেছেন যদিও জামায়াত তা অস্বীকার করেছে। বিএনপি এই বিষয়ে কোন মন্তব্য করেনি। ধরে নেওয়া যেতে পারে এই চুক্তিতে বিএনপি'র কোন আপত্তি নেই বা ছিল না ।
শেখ হাসিনার শাসনকালে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাস এই দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইসেরয়ের ভূমিকায় ছিলেন । মেয়াদের শেষের দিকে তাঁর মূল কাজ ছিল শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার অন্যতম নিয়ামক ভূমিকা পালন করা যা তিনি সফলতার সঙ্গে পালন করেছেন আর উত্তরসূরি ব্রেন্ট ক্রিস্টান এসেছেন বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় বসানো বাবদ সকল পাওনা করায় গণ্ডায় বুঝে নিতে। অন্তত তার কথাবার্তা আর কাজেকর্মে তাই মনে হওয়াটা স্বাভাবিক। তাঁর মেয়াদকালে তিনি বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি করদ বা অঙ্গ রাজ্যে পরিণত করে ছাড়বেন তাতে কোন সন্দেহ নেই।
এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিতে কি আছে তার দু'একটা উদাহরণের দিকে তাকানো যাক । এখন থেকে বাংলাদেশ অন্য কোন দেশ থেকে তেল ক্রয় করতে হলে আপনাকে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন লাগবে । বাংলাদেশ নিজের অর্থে যে কোন দেশ থেকে তেল ক্রয় করবে তার জন্য কেন যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন লাগবে? সম্প্রতি বাংলাদেশ রাশিয়া হতে তেল আমদানি করতে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন চেয়ে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশ আর যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্য । এই সংস্থার সদস্য দেশগুলি সেই নব্বইয়ের দশকে একমত হয়েছে যে সদস্য দেশগুলির সকল সদস্য নিজেদের মধ্যে অবাধে বাণিজ্য করতে পারবে। একটি দেশ কি আমদানি বা রপ্তানি করবে তা তাদের নিজস্ব ব্যাপার। সংশ্লিষ্ট দেশ গুলি তাদের নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য শুল্ক নির্ধারণ করতে পারবে, চাইলে অশুল্ক বাধাও বলবত করতে পারবে । কোন দেশ প্রকাশ্যে বলতে পারবে না অমুক দেশের পণ্য তারা বর্জন করবে । একজন ক্রেতা তার নিজের অর্থে কোন দেশের পণ্য বা সেবা ক্রয় করবেন তা তার নিজের সিদ্ধান্ত ।
বাংলাদেশ তো যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৪ টি বোয়িং ক্রয়ের জন্য চুক্তি করেছে। অন্যদিকে শেখ হাসিনা সরকার ফ্রান্স থেকে এয়ারবাস ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল । এই ব্যাপারে কথা বলতে ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী ম্যাঁক্রো দিল্লি হয়ে ঢাকা সফর করেছিলেন । যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই চুক্তির ফলে ফ্রান্স ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন উষ্মা প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক সহ অনেক পণ্যের গন্তব্যস্থল ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দেশগুলি ও যুক্তরাজ্য । এমনও হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র হতে বোয়িং ক্রয়ের কারণে এই সব দেশগুলো বাংলাদেশের পন্যের উপর বাড়তি শুল্ক বসিয়ে দিতে পারে ।
বাংলাদেশে সফররত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রী সাংবাদিকদের জানালেন এই রকম চুক্তি আরো অনেক দেশের সাথে আছে। তিনি উদাহরণ হিসেবে ইন্দোনেশিয়াকে নিয়ে আসলেন। তাঁর জানা থাকা উচিৎ ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া বিশ্বের আনুমানিক আশি থেকে নব্বই ভাগ সয়াবিন উৎপাদন করে। তারা তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে সয়াবিন তেল কিনতে বাধ্য নয় যা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য । যুক্তরাষ্ট্র তো কোন সয়াবিন উৎপাদন করে না । তারা এই সব দেশ থেকে এই পণ্য ক্রয় করে বাংলাদেশের কাছে তিন বা চারগুণ দামে বিক্রয় করবে। এই চুক্তির কারণে বাংলাদেশ বছরে সাড়ে তিনি বিলিয়ন ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য, প্রতিবছর সাত লাখ টন হারে পাঁচ বছর ধরে গম (বাংলাদেশের শতভাগ চাহিদা), প্রতিবছর অন্তত দুই বিলিয়ন ডলারের সয়াজাত পণ্য, যার কথা আগে উল্লেখ করেছি. বাংলাদেশের সকল সামরিক সরঞ্জাম, নির্ধারত পরিমানের শুকরের মাংস সহ সকল ধরেন মাংস, ডিম ও পোল্ট্রি পণ্য এবং তুলা ক্রয় করতে বাধ্য । বাংলাদেশ অনেক কম দামে নিজ প্রয়োজনে ক্রয় করে ইউক্রেন, রাশিয়া, চিন, মালেয়শিয়, ইন্দোনেশিয়, থাইল্যন্ড আর ভারত থেকে । আরো ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে এই চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশি ওষধ কোম্পানিগুলি আগামীতে মার্কিন পেটেন্ট থাকা আর কোন জেনেরিক ঔষধ উৎপাদন করতে পারবে না । করলে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে এর পরিবর্তে অর্থ দিতে হবে । ফলে দেশের সাধারণ জনগণকে নিজ দেশে উৎপাদিত ঔষধ চার থেকে পাঁচগুণ চড়া দামে ক্রয় করতে হবে । বন্ধ হয়ে যাবে বিদেশে বাংলাদেশের ঔষধ রপ্তানি । আর অন্যদিকে বাংলাদেশের গর্বের তৈরি পোশাক শিল্পের কিছু দিনের মধ্যেই বিলুপ্তি ঘটবে বলে খোদ এই শিল্পের মালিকরাই বলছেন । আর যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিজস্ব স্বার্থে কোন দেশের উপর নিষেধাজ্ঞা দেয় তাহলে বাংলাদেশ সেই দেশের সঙ্গে কোন বাণিজ্য করতে পারবেনা । খলিলুর রহমান কি ভুলে গেছেন ইন্দোনেশিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের তাবেদার রাষ্ট্র বানাতে ১৯৬২ থেকে ১৯৬৫ সাল সময়কালে সেই দেশের জাতির জনক জাতীয়তাবাদি নেতা সূয়েকার্ণোকে উৎখাত করার জন্য প্রায় দশ লাখ নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছিল ।
সব শেষে এই কথাই বলতে হয় ড. ইউনুস আর সাঙ্গপাঙ্গরা দেশের ক্ষমতা দখল করেছিলেন বাংলা নামক দেশটির বিলুপ্তি ঘটানোর জন্য । তা তারা মোটামুটি অনেকটা করে গিয়েছেন । বর্তমান সরকারকে সেই পরিস্থিতি থেকে উঠে দাঁড়াতে হলে বেশ কিছু সাহসী পদক্ষেপ নিতে হবে । এই চুক্তির ভিতরেই আছে ষাট দিনের নোটিশে উভয় পক্ষের সম্মতিতে এই চুক্তির বিলুপ্তি ঘোষণা করা যাবে । তবে সরকারের আড়াই মাসের কর্মকাণ্ড দেখে তা যে তারা করবে তার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না । মনে হচ্ছে তারা ইউনুস সরকারের সম্প্রসারিত রূপ। বাণিজ্যমন্ত্রী যখন বলেন এই চুক্তি তারা উত্তরাধিকারী সূত্রে পেয়েছেন এবং তা তারা মানতে বাধ্য তখন দেশের মানুষ তাদের উপর খুব আস্তা রাখতে পারে না । এমন কথা তারেক রহমানের অন্যান্য সভা পারিষদরাও বলছেন । আশা করা যায় কোনটা গোলামীর চুক্তি আর কোনটা নয় তা দেশের মানুষ বুঝতে পারবেন। অনুধাবন করতে পারবেন আগামীতে তাদের জন্য কি অপেক্ষা করছে ।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক। মতামত ব্যক্তিগত।

