দ্য ওয়াল ব্যুরো: ডিজিটাল ইন্ডিয়া বা উন্নয়নের হাজারো ঢাকঢোলের মধ্যেও ভারতের এক করুণ ছবি ফুটে উঠল উত্তরাখণ্ডে। ২০১৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় নদীগর্ভে তলিয়ে গিয়েছিল একটি আস্ত সেতু। তারপর দীর্ঘ ৮ বছর কেটে গেলেও টনক নড়েনি প্রশাসনের (PWD Uttarakhand bridge construction delay)। একটা সেতুর অভাবে প্রতিদিন সাক্ষাৎ মৃত্যুর সঙ্গে লড়তে হচ্ছে একশোরও বেশি স্কুল পড়ুয়াকে (Uttarakhand students use trolley to reach school)।
ফলে এখনও প্রতিদিন একটি ম্যানুয়ালি অপারেটেড বা হাত দিয়ে টানা ট্রলিতে চেপে উত্তাল রামগঙ্গা নদী পার হতে হচ্ছে উত্তরাখণ্ডের বাগেশ্বর জেলার স্কুল পড়ুয়াদের।
স্থানীয় বাসিন্দাদের বারবার দাবি সত্ত্বেও সেতুটি (Bageshwar Pithoragarh Ramganga river bridge) নতুন করে তৈরি করা হয়নি। ফলে বাগেশ্বর জেলার প্রত্যন্ত গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা পড়শি জেলা পিথোরাগড়ের স্কুলে যাওয়ার জন্য এই বিপজ্জনক পথই বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে। নাচনী এলাকার বিশিষ্ট সমাজকর্মী সুন্দর সিং বাথিয়াল এই চরম দুরাবস্থার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি জানান, গ্রাম থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ হেঁটে নদীপাড়ে পৌঁছয় এই পড়ুয়ারা। বর্ষায় যখন নদী ফুঁসছে, তখন সন্তানদের একা ছাড়তে পারেন না বাবা-মায়েরা। তাঁরাও সঙ্গে যান এবং নিজেদের হাতে দড়ি টেনে ট্রলি পারাপার করিয়ে ছেলেমেয়েদের ওপারে স্কুলে পাঠান।
জানা গিয়েছে, পিডব্লিউডি (PWD)-র তরফে এই বিপজ্জনক ট্রলিটি দেখভাল বা পরিচালনা করার জন্য এখনও কোনও কর্মী নিয়োগ করা হয়নি। গ্রামবাসীদের নিজেদেরই হাতে করে এই লোহার ট্রলিটি টানতে হয়। সুন্দর সিং বাথিয়াল জানান, এই চরম অব্যবস্থার কারণে গত আট বছরে এই ট্রলি ব্যবহার করতে গিয়ে অন্তত দুজনের মৃত্যু হয়েছে এবং আরও ছয়জন গুরুতর জখম হয়েছেন। ফলে বর্ষাকাল এলেই বুক দুরুদুরু কাঁপতে থাকে বাবা-মায়েদের। কখন কী দুর্ঘটনা ঘটে যায়, সেই আশঙ্কায় দিন কাটে তাঁদের।
গ্রামের মানুষ জানান, শীতকালে যখন নদীর জল কমে যায়, তখন তাঁরা নিজেদের উদ্যোগে কাঠ দিয়ে একটি অস্থায়ী সেতু তৈরি করে নেন। কিন্তু বর্ষা নামলেই সেই কাঠের সেতু জলের তোড়ে ভেসে যায় এবং জুলাই-অগস্টের এই ভরা মরসুমে ট্রলি ছাড়া গতি থাকে না। বাগেশ্বরের পিডব্লিউডি-র প্রাদেশিক ডিভিশনই এই ট্রলিটি নদী পারাপারের জন্য বসিয়েছিল, কিন্তু সেটির নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার দায় নেয়নি তারা।
বাগেশ্বর জেলার ভকুনা গ্রামের বাসিন্দা দেওয়ান সিং কার্কির দুই সন্তানই নদীর ওপারে জিআইসি নাচনী স্কুলে পড়াশোনা করে। প্রতিদিনের এই যাতায়াত নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়ে দেওয়ান সিং বলেন, "বর্ষা আসতেই রামগঙ্গার জলস্তর হু হু করে বাড়ছে। আমাদের প্রতিদিন কাজ ফেলে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে নদীর পাড়ে আসতে হচ্ছে। ট্রলিতে ওঠা এবং নামার সময় ওদের হাত শক্ত করে ধরে রাখতে হয়। একা একা ওই ট্রলিতে চড়তে বাচ্চারা ভীষণ ভয় পায়।"
একই সুর বাগেশ্বরের খেতি গ্রামের বাসিন্দা মোহন সিংয়ের গলাতেও। তাঁর মেয়ে পিথোরাগড়ের নাচনী এলাকার জ্ঞানদীপ পাবলিক স্কুলে পড়ে। মোহন সিংয়ের কথায়, "বর্ষার মরসুমে এই ট্রলি চড়ে নদী পার হওয়াটা আমাদের পরিবারের কাছে একটা যন্ত্রণা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর আমরা আমাদের সন্তানদের জীবন বাজি রাখছি। সরকারের উচিত অন্য সব কাজ ছেড়ে এই সেতুটি দ্রুত তৈরি করা। ২০১৮ সালের বন্যার আগে তো এখানে একটা আস্ত কংক্রিটের সেতু ছিলই, সেটা নতুন করে গড়তে এত বছর সময় লাগে?"
সরকারি স্তরে ফাইল বন্দি হয়ে থাকা লাল ফিতের ফাঁস যে কবে খুলবে, তা অবশ্য স্পষ্ট নয়। পিডব্লিউডি-র আধিকারিকরা জানিয়েছেন, ওই নির্দিষ্ট জায়গায় ১১০ মিটার স্প্যানের একটি নতুন সেতু তৈরি করার জন্য একটি বিশদ প্রকল্প রিপোর্ট বা ডিপিআর (DPR) তৈরি করা হয়েছে।
বাগেশ্বরের পিডব্লিউডি-র প্রাদেশিক ডিভিশনের এক ইঞ্জিনিয়ার কৃষ্ণ পিপলিয়া এই বিষয়ে সাফাই দিয়ে বলেন, "সেতু তৈরির প্রস্তাবটি বর্তমানে উচ্চপর্যায়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। সরকার থেকে সবুজ সংকেত এবং তহবিল মঞ্জুর হয়ে এলেই অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে এই সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করে দেওয়া হবে।" তবে সেই সরকারি সিলমোহর কবে পড়বে এবং কবে পাহাড়ি এলাকার এই ছোট ছোট পড়ুয়ারা একটা নিরাপদ সেতু পাবে, সেই উত্তর এখনও মেলেনি।

