দ্য ওয়াল ব্যুরো: উদ্বোধনের পর থেকে অযোধ্যার শ্রী রাম জন্মভূমি মন্দির (Shri Ram Janmabhoomi Temple) নিয়ে বিতর্কের অবকাশ ছিল না বললেই চলে। কিন্তু এখন ভক্তদের দেওয়া দান সামগ্রী ও কোটি কোটি টাকা চুরির এক মারাত্মক অভিযোগ ঘিরে নজিরবিহীন বিতর্কের মুখে পড়েছে এই ঐতিহাসিক পুণ্যভূমি। কোটি কোটি টাকা নয়ছয়ের এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই গঠন করা হয়েছে সিট (SIT)।
ইতিমধ্যেই গ্রেফতার করা হয়েছে আটজনকে এবং উদ্ধার হয়েছে লক্ষ লক্ষ টাকা ও সোনা।
এই কেলেঙ্কারি সামনে আসার পরেই নজিরবিহীন পদক্ষেপ করেছে 'শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্ট' (Ayodhya Ram temple security monitoring new rules)। টাকা গোনার প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ নিশ্ছিদ্র করতে এবং ভক্তদের বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে একগুচ্ছ কঠোর নিয়ম চালু করা হয়েছে মন্দির চত্বরে (Ayodhya Ram Mandir restricted access)।
কী কী বদল এল রাম মন্দিরের অন্দরে?
তদন্তকারীদের মতে, এই চুরি কোনও বাইরের লোক এসে বা বাক্স ভেঙে করেনি। দানবাক্স থেকে টাকা খুলে যখন তা গণনার জন্য আনা হত, তখনই চলত এই নয়ছয়। তাই এবার টাকা গোনার ঘর এবং অতি সংবেদনশীল এলাকাগুলির নিরাপত্তা এক ধাক্কায় বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে:
পকেটহীন বিশেষ গাউন (Pocketless Gowns): 'ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস'-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, দান সামগ্রী ও টাকা গোনার দায়িত্বে থাকা কর্মীদের জন্য বিশেষ এক ধরনের পোশাক বা গাউন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যাতে কোনও পকেট থাকবে না। এর ফলে জামাকাপড়ের ভেতর টাকা বা গয়না লুকিয়ে রাখার সমস্ত রাস্তা বন্ধ করা সম্ভব হবে।
বাধ্যতামূলক শারীরিক তল্লাশি (Mandatory Frisking): টাকা গোনার ঘরে ঢোকার আগে এবং কাজ শেষে বেরোনোর সময় প্রত্যেক কর্মী, আধিকারিক এমনকি নিরাপত্তা কর্মীদেরও মেটাল ডিটেক্টর ও কড়া শারীরিক তল্লাশির (Frisking) মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
মোবাইল ও ওয়ালেট নিষিদ্ধ: টাকা গোনার ঘরে ঢোকার আগে কর্মীদের মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ, চাবির রিং, ব্যাগ বা অন্য কোনও ব্যক্তিগত সামগ্রী লকারে জমা রাখতে হবে। কোনও অবস্থাতেই এগুলি ভেতরে নিয়ে যাওয়া যাবে না।
গণনাকক্ষে প্রবেশাধিকার সীমিত: এবার থেকে কেবল সেই সমস্ত নির্দিষ্ট ও অনুমোদিত আধিকারিক বা কর্মীরাই ওই উচ্চ-নিরাপত্তা বলয়ে প্রবেশ করতে পারবেন, যাঁদের নাম আগে থেকে ট্রাস্ট ও প্রসাশনের তরফে খতিয়ে দেখে সবুজ সংকেত বা বিশেষ 'ক্লিয়ারেন্স' দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, ঘরের ভেতরে কে কখন ঢুকছেন এবং কার কী ভূমিকা—তা আগের চেয়ে অনেক বেশি সূক্ষ্ম ও কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা শুরু হয়েছে।
সিসিটিভি ব্যাকআপে বড় বদল: আগে মন্দিরের সিসিটিভি ফুটেজ ৪৫ দিন পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে যেত। কিন্তু চুরির ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ দেখেছে, বহু মাস ধরে এই চক্র সক্রিয় ছিল। তাই এবার সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণের সময়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ট্রাস্ট।
এযাবৎ ট্রাস্টের অ্যাকশন ও তদন্তের গতিপ্রকৃতি
রাম মন্দিরে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭৫ লক্ষ টাকা দান হিসেবে জমা পড়ে। উৎসবের দিনগুলিতে এই অঙ্ক কোটি ছাড়িয়ে যায়। মন্দিরে প্রায় ৪০টি দানবাক্স রয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ধৃতেরা অফিশিয়াল খাতায় নাম তোলার আগেই ক্যাশ এবং গয়না সরিয়ে ফেলত।
এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত অবিনাশ শুক্লা, লবকুশ মিশ্র, অনুক্ল্প মিশ্র, মণীশ কুমার যাদব, করুণেশ পাণ্ডে, রমাশঙ্কর মিশ্র, রাম শঙ্কর যাদব ওরফে তিনু যাদব এবং সুভাষ শ্রীবাস্তব নামের আটজনকে গ্রেফতার করে জেল হেফাজতে পাঠানো হয়েছে। ধৃত অবিনাশ শুক্লার পুলিশ রিমান্ড চলাকালীন তাঁর কাছ থেকে ২০ লক্ষাধিক টাকা নগদ এবং সোনার চেন উদ্ধার করেছে পুলিশ।
জিজ্ঞাসাবাদের মুখে ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাই!
তদন্তের স্বার্থে এবং কোনো অভ্যন্তরীণ গাফিলতি বা 'ইনসাইডার কলিউশন' ছিল কি না তা জানতে বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাই (Champat Rai) এবং ট্রাস্টের অন্যতম সদস্য অনিল মিশ্রকে দীর্ঘক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। এছাড়া ওই ঘরের দায়িত্বে থাকা সুপারভাইজার ও সিকিউরিটি কর্মীদের ডিউটি রোস্টার এবং হাজিরা খাতা পরীক্ষা করছে পুলিশ। যদিও পুলিশ স্পষ্ট করেছে যে, ট্রাস্টের শীর্ষ কর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করার মানে এই নয় যে তাঁরা অপরাধী, বরং গোটা ব্যবস্থার তদারকিতে কোথায় ফাঁক ছিল, তা বুঝতেই এই পদক্ষেপ।
আপাতত এই কড়া ব্যবস্থার মাধ্যমে রাম মন্দিরের দান ব্যবস্থার ওপর আমজনতার বিশ্বাস ফিরিয়ে আনাই প্রধান লক্ষ্য ট্রাস্টের।

