দ্য ওয়াল ব্যুরো: বারুইপুরের পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে এক অভিযুক্ত ধর্ষক-খুনির পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হওয়ার ঘটনায় উত্তর প্রদেশ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সূত্রের খবর, বুধবার উত্তর প্রদেশেও দিনভর বারুইপুর নিয়ে আলোচনা চলে। এই আলোচনায় নয়া মাত্রা পায় রাজ্যের ফতেপুর এবং আম্বেদকর নগরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের দুটি ঘটনা।
ঘটনা দুটি ঘটে যথাক্রমে মঙ্গল ও বুধবার।
ভারতে এনকাউন্টার বা পুলিশ সহ বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে অপরাধীর মৃত্যুর ঘটনা নতুন নয়। গত শতকের সত্তরের দশকে পশ্চিমবঙ্গ সহ বেশ কয়েকটি রাজ্যে নকশালপন্থীদের দমন এবং পাঞ্জাবে খলিস্তানিদের বিরুদ্ধে অভিযানে বারে বারেই এনকাউন্টারে মৃত্যুর ঘটনা আলোচনায় এসেছে। তবে গত এক দশকে এই বিষয়ে আলোচনায় ঘুরে ফিরে নাম এসেছে উত্তর প্রদেশের।
২০১৭ সালে উত্তর প্রদেশে যোগী আদিত্যনাথ মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর পুলিশ এনকাউন্টারে অপরাধীর মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায়। এ নিয়ে মানবাধিকার কর্মীদের আপত্তি, বিরোধীদের অভিযোগ ইত্যাদি নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত মামলা গড়ায়। শীর্ষ আদালত একাধিক মামলায় উত্তর প্রদেশ সরকারের জবাব তলব করে।
বারুইপুরের ঘটনার পর যোগী রাজ্যে এনকাউন্টারে মৃত্যু নতুন করে আলোচনা উসকে দিয়েছে। সূত্রের খবর, যোগীর নয় বছরের শাসনে উত্তর প্রদেশে ১৭ হাজার চারটি এনকাউন্টার হয়েছে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয় ২৮৯ জন অপরাধী। পাল্টা অপরাধীদের হামলায় মারা যান ১৮ জন পুলিশ কর্মী। পুলিশের অভিযানে আহতের সংখ্যা ১১ হাজার ৮৩৪ জন। ৩৪ হাজার ২৫৩ অপরাধীকে পুলিশ গ্রেফতার করে। নিহত ও আহতদের মধ্যে খুনি, ধর্ষক, ডাকাত, মাফিয়া--সব ধরনের অপরাধী আছে। মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ প্রায়ই বলে থাকেন, 'এখন উত্তরপ্রদেশে কোনও মেয়ে-বোনের শ্লীলতাহানি করার সাহস কেউ পায় না।'
সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় গুণ্ডা দমন আইন পাস হয়েছে। যোগী আদিত্যনাথ মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরেই ওই রাজ্যে ব্রিটিশ আমলের গুণ্ডা দমন আইনে সময়োপযোগী পরিবর্তন এনে দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অভিযানের নির্দেশ দেন। প্রতিটি জেলায় গঠিত হয় গুণ্ডা দমন বিশেষ বাহিনী। এই পুলিশের কাজ দাগি অপরাধীদের গ্রেফতার করা।
যোগী সরকারের ওই অভিযান বড় আকারে আলোচনা আসে ২০২০-তে কানপুরে বিকাশ দুবে নামে এক কুখ্যাত অপরাধীর এনকাউন্টারে মৃত্যুর ঘটনায়। দুবেকে মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনী থেকে গ্রেফতারের আগে কানপুরে তার দলবল আট জন পুলিশ কর্মীকে হত্যা করে। পুলিশ তার ডেরায় হানা দিয়েছিল। উত্তরপ্রদেশ পুলিশ তখন দাবি করে দুবেকে মধ্যপ্রদেশ থেকে গাড়িতে কানপুরে আনার পথে সে এক পুলিশের পিস্তল কেড়ে নিয়ে গুলি চালাতে চালাতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। পুলিশের পাল্টা গুলিতে সে নিহত হয়।
উত্তর প্রদেশ পুলিশের দাবি, সরকারের কঠোর মনোভাবের সুফল পেতে শুরু করেছেন রাজ্যের মানুষ। উল্লেখযোগ্য হারে কমে গিয়েছে অপরাধ।
উত্তরপ্রদেশের পুলিশের ডিজি রাজীব কৃষ্ণ জাতীয় অপরাধ পঞ্জির (NCRB) পরিসংখ্যান উল্লেখ করে সংবাদ মাধ্যমের কাছে দাবি করেছেন যে, রাজ্যে অপরাধের হার এখন জাতীয় গড়ের চেয়ে কম। তিনি বলেন, 'এনসিআরবি-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাতীয় পর্যায়ে অপরাধের হার যেখানে প্রতি লাখে ২৫২.৩, সেখানে উত্তরপ্রদেশে এই হার ১৮০.২।'
তবে ওই রাজ্যের বিরোধীরা প্রথম থেকেই সংঘর্ষে মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছে। নিহত ও আহতদের জাত ও ধর্মীয় পরিচয় নিয়েও বিতর্ক আছে। সমালোচকদের বক্তব্য, ২০১৭ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় ৬৭ জন মুসলিম, ৪২ জন অ-যাদব ওবিসি, ২০ জন ব্রাহ্মণ, ১৮ জন ঠাকুর, ১৬ জন যাদব এবং ১৪ জন তফসিলি জাতিভুক্ত ব্যক্তি নিহত হয়েছেন।
সমাজবাদী পার্টির প্রধান তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদবের অভিযোগ, যোগী সরকার মুসলিম এবং ওবিসিদের প্রতি প্রতিহিংসাপরায়ণ আচরণ করছে।' রাজনৈতিক মহলের বক্তব্য, এই দুটি জনগোষ্ঠী ঐতিহ্যগতভাবে সমাজবাদী পার্টিকে সমর্থন করে এসেছে। অখিলেশ দাবি করেছেন যে, মিথ্যা মামলায় নিরপরাধ মানুষদের ফাঁসিয়ে প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করা হচ্ছে।'

