ধরা যাক, আপনি একজন প্রযোজক। আপনার হাতে একটি বাংলা ছবি। প্রথম প্রশ্নটাই হবে— এই ছবিটা টাকা তুলবে তো? এখান থেকেই পুরো সমস্যাটা বোঝা যায়। বাংলা সিনেমার সংকট আসলে কনটেন্ট বা দর্শকের অভাব দিয়ে শুরু হয় না— শুরু হয় অর্থনীতি দিয়ে। লাভের নিশ্চয়তা নেই বলেই সিদ্ধান্তগুলো বদলে যায়, আর সেই বদলই ধীরে ধীরে পুরো ইন্ডাস্ট্রির চরিত্র পাল্টে দেয়।
প্রথমেই বাজারের কথায় আসা যাক। বাংলা ছবির বাজার ছোট— এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। ভাষা এবং ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার কারণে দর্শকসংখ্যা স্বাভাবিকভাবেই সীমিত। জেলার বহু প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ বা অচল, ফলে রিলিজের পরিসরও সংকুচিত। এই বাস্তবতায় বড় বাজেটের ছবি বানিয়ে রিটার্ন আশা করা অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। এখানেই নতুন ভাবনার দরকার— বড় বাজেট নয়, কন্ট্রোলড বাজেট। অর্থাৎ ১০-১৫ কোটির অনিশ্চিত বিনিয়োগের বদলে ৩-৬ কোটির সুপরিকল্পিত প্রোডাকশন, যেখানে কনটেন্টই মূল সম্পদ। এতে রিস্ক কমবে, আর ব্রেক-ইভেনের সম্ভাবনাও বাড়বে। (Bengali cinema, Bengali film industry, Bengali movies business, Tollywood box office)
প্রতিযোগিতার বিষয়টা দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা হিসেবে দেখা হয়েছে, কিন্তু এটাকেও কৌশলে বদলানো যায়। মাল্টিপ্লেক্সে হিন্দি বা দক্ষিণী বড় ছবির দাপট থাকবেই। সেই জায়গায় সরাসরি লড়াই না করে বাংলা ছবিকে নিজের পজিশনিং ঠিক করতে হবে। সব দর্শকের জন্য নয়— নির্দিষ্ট দর্শকের জন্য ছবি বানানো। এতে স্ক্রিন কম হলেও টার্গেট অডিয়েন্স নিশ্চিত থাকে। ফলে কম শো থেকেও আয় সম্ভব। (Bengali cinema revival, Bengali film market, Bengali movie industry crisis, Bengali cinema future, Bengali film business model)
কোভিডের পর দর্শকের অভ্যাস বদলে গেছে— এটাও বাস্তব। এখন মানুষ হলমুখী হয় বেছে বেছে। কিন্তু এটাকে সংকট না ভেবে সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত। কারণ এর মানে, যদি একটা ছবি 'দেখতেই হবে' এই অনুভূতি তৈরি করতে পারে, তাহলে দর্শক আসবে। এই 'ইভেন্ট ভ্যালু' তৈরি করার জন্য গল্পের পাশাপাশি প্রেজেন্টেশন, ট্রেলার, প্রোমোশন— সবকিছুকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ছোট বাজেটের মধ্যেও স্মার্ট মার্কেটিং দিয়ে এই কাজ সম্ভব।
কনটেন্টের জায়গায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দরকার ধারাবাহিকতায়। মাঝে মধ্যে ভালো ছবি হচ্ছে, কিন্তু নিয়মিত নয়। এর ফলে দর্শকের মধ্যে একটা স্থায়ী ধারণা তৈরি হয়েছে যে গড় মানটাই নরমাল। এই ধারণা বদলাতে হলে নিয়মিত এমন গল্পে ছবি তৈরি করতে হবে, যেগুলো দর্শকের মধ্যে গভীরভাবে পৌঁছতে পারে। নতুন পরিচালক, নতুন লেখক, নতুন জঁর— এগুলোকে জায়গা দিলে কনটেন্টের বৈচিত্র্য বাড়বে। একই ধরনের গল্প ঘুরিয়ে ফিরিয়ে করলে স্বল্পমেয়াদে চললেও দীর্ঘমেয়াদে দর্শক হারাতে হয়।
অর্থনীতির কাঠামোটাও বদলানো প্রয়োজন। এখন একটা ছবির খরচ শুধু শুটিং নয়— ডিজিটাল প্রজেকশন, VPF, প্রচার— সব মিলিয়ে বাজেট অনেক বড় হয়ে যায়। কিন্তু আয় বাড়ছে না সেই হারে। এর সমাধান একটাই— মাল্টি-রেভিনিউ মডেল। অর্থাৎ বক্স অফিসের পাশাপাশি OTT, স্যাটেলাইট, আন্তর্জাতিক বিক্রি— সব মিলিয়ে আয় পরিকল্পনা করা। আগে যেটা অতিরিক্ত ছিল, এখন সেটাই মূল কৌশল হতে হবে।
ডিস্ট্রিবিউশনের ক্ষেত্রেও বড় ঘাটতি রয়েছে। অনেক বাংলা ছবি কলকাতা বা কয়েকটি শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে যায়। অথচ জেলার দর্শক এখনও বড় সম্ভাবনা। সঠিক নেটওয়ার্ক তৈরি করা গেলে বাজার নিজে থেকেই বড় হবে। একই সঙ্গে রিলিজ স্ট্র্যাটেজি আরও পরিকল্পিত হওয়া দরকার। এক সপ্তাহে একাধিক ছবি রিলিজ করে নিজেদের মধ্যেই প্রতিযোগিতা তৈরি করার বদলে সময় বেছে রিলিজ করলে প্রতিটা ছবির আয় বাড়তে পারে।
OTT এবং স্যাটেলাইট বাজার আগের মতো সহজ নয়, কিন্তু বন্ধও নয়। এখন প্ল্যাটফর্মগুলো বেছে কনটেন্ট নেয়। ফলে ভালো কনটেন্ট থাকলে বিক্রির সুযোগ এখনও রয়েছে। বরং শুরু থেকেই ডিজিটাল রাইটস মাথায় রেখে ছবি তৈরি করলে প্রযোজকের রিস্ক অনেকটাই কমানো যায়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়— দর্শকের বিশ্বাস ফেরানো। অনেক দর্শক এখন আগে থেকেই ধরে নেয় বাংলা ছবি মাঝারি মানের হবে। এই ধারণা বদলাতে সময় লাগবে, কিন্তু সেটা সম্ভব। তার জন্য ধারাবাহিকভাবে ভালো কাজ দরকার। এক-দুটো হিট নয়— নিয়মিত মান ধরে রাখতে পারলে দর্শক আবার হলে ফিরবে।
এই জায়গায় একটি আন্তর্জাতিক উদাহরণ প্রাসঙ্গিক— A24। তারা বড় স্টুডিওর মতো বিশাল বাজেটের ওপর নির্ভর না করে, নির্দিষ্ট দর্শককে লক্ষ্য করে কনটেন্ট তৈরি করে। তাদের ছবিগুলো সবসময় massy নয়, কিন্তু স্পষ্ট পরিচয় থাকে। ফলে থিয়েটারে সীমিত ব্যবসা করলেও পরে OTT, আন্তর্জাতিক বাজার এবং ব্র্যান্ড ভ্যালুর মাধ্যমে বড় রিটার্ন তৈরি হয়। এই মডেল দেখায়— ছোট বাজার মানেই ছোট ব্যবসা নয়, যদি পরিকল্পনা পরিষ্কার থাকে।
বাংলা সিনেমার ক্ষেত্রেও বিষয়টা একই। বাজার ছোট, প্রতিযোগিতা কঠিন— এগুলো বদলানো যাবে না। কিন্তু কনটেন্ট, মার্কেটিং এবং ডিস্ট্রিবিউশন— এই তিন জায়গায় কৌশল বদলানো পুরোপুরি সম্ভব। এখন পর্যন্ত সমস্যা ছিল মাঝামাঝি অবস্থান— না পুরোপুরি বাণিজ্যিক, না পুরোপুরি আলাদা। এই বিভ্রান্তি কাটাতে পারলেই ছবির পরিচয় স্পষ্ট হবে, আর ব্যবসাও বাড়বে।
সংক্ষেপে বললে, বাংলা সিনেমা শেষ পর্যায়ে নেই। বরং এটা একটা ট্রানজিশন ফেজ। পুরোনো মডেল কাজ করছে না, নতুন মডেল এখনও পুরোপুরি তৈরি হয়নি। যখন এই পরিবর্তনটা সম্পূর্ণ হবে— তখনই ব্যবসা ফিরে আসবে, এবং সেটা আগের চেয়েও স্থায়ীভাবে।

