পশ্চিমবঙ্গে এবারের নির্বাচনে (West Bengal Election 2026) তৃণমূলের মুখে 'জয়বাংলা' স্লোগান নিয়ে বিতর্কের কারণ সকলের জানা। 'জয় বাংলা' শুধু বাংলার বন্দনা নয়, এর সঙ্গে বিজয়ের স্মৃতি, কৃতিত্ব জড়ে আছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে 'জয় বাংলা' ছিল মুক্তি যোদ্ধাদের প্রেরণার উৎস। ওপারের বাঙালির সেই স্বাধীনতা তথা মুক্তিযুদ্ধ দমনে পাকিস্তানি শাসকেরা কত সেনা মোতায়েন করেছিল, তা খানিকটা অনুমান করা যায় মুক্তিযুদ্ধ শেষে আত্মসমর্পণকারী পাক সেনার সংখ্যা থেকে।
সেই সংখ্যা ছিল ৯৩ হাজার। ধরে নেওয়া যায়, যুদ্ধের নয় মাসে আনুমানিক এক লাখ পাক সেনা লড়াইয়ে অংশ নিয়েছিল।
সেখানে পশ্চিমবঙ্গে ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে শুধু কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন হয় ২৪০৭ কোম্পানি। জওয়ান, অফিসার মিলিয়ে সংখ্যাটা দু লাখ ৪০ হাজারের কাছাকাছি। দু দফার ভোটের হিসাবে গোটা রাজ্যে মোতায়েন ছিল চার লাখ ৮০ হাজার আধা সেনা। এর সঙ্গে ছিল লক্ষাধিক রাজ্য পুলিশ। এসব দেখে ভিন রাজ্যের সাংবাদিক বন্ধু এবং বাংলাদেশের এক পরিচিত ব্যক্তি ফোনে আমাকে একই প্রশ্ন করেছেন, পশ্চিমবঙ্গে কি ভোটযুদ্ধ হচ্ছে, নাকি যুদ্ধ হচ্ছে?
ইন্টারনেট আর সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে সব ঘটনা-দুর্ঘটনাই গোটা বিশ্ব প্রত্যক্ষ করে। বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর উগ্রবাদী শক্তির আওয়ামী লিগ সমর্থক আর সংখ্যালঘুদের উপর তালিবানি নৃশংসতায় হত্যা, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার ঘটনায় আমি এপারের বহু মানুষকে গোটা বাংলাদেশি জাতিকে অসভ্য, বর্বর, জানোয়ার বলে নিন্দা করতে শুনেছি। ঘটনাগুলি যে মুষ্টিমেয়র কাজ সেটা তারা বিবেচনা রাখেননি। আসলে মানুষ এত বিচার-বিশ্লেষণের ধার ধারে না। ভোটের পশ্চিমবঙ্গে গলি থেকে রাজপথে আধা সেনার উপস্থিতি দেখে দেশে, দেশের বাইরে অনেকের এমন ধারণা হয়েছে, যে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ স্বভাবগতভাবে হিংস্র প্রকৃতির। তারা সর্বদা গৃহযুদ্ধে মেতে আছে। আমার ধারণা, এই ভাবমূর্তির পরিবর্তন সহজ হবে না।
বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশকে কেন্দ্র করে আগামীকাল সোমবার, এই সময় পশ্চিমবঙ্গ-সহ পাঁচ রাজ্যের পরিস্থিতি বেশ উত্তেজনাপূর্ণ থাকবে। অভিজ্ঞতা বলে, প্রত্যাশিত, স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াই পশ্চিমবঙ্গের জন্য ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে নির্বাচন পরবর্তী প্রতিহিংসার জেরে। ভোট বৈতরণী পেরতে এবারের নির্বাচনে যে মাত্রায় সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানো হয়েছে তা ভয়াবহ, নজিরবিহীন, যার রেশ ভোট পরবর্তী হিংসায় বিশেষ মাত্রা নিতে পারে। দলীয় রাজনীতি ছাপিয়ে ধর্মীয় পরিচয় মুখ্য হয়ে ওঠা অসম্ভব নয়। আশাকরি, এই আশঙ্কা মিথা প্রতিপন্ন হবে। তাতে কতিপয় ব্যতিরেকে বেশিরভাগেরাই খুশি হবেন।
এবাবের বিধানসভা নির্বাচনের আরও একটি বিশেষ দিক হল, এই প্রথম কোন ভোটে একই সঙ্গে ভোটদানের হার এবং ভোট দিতে না পারা মানুষের সংখ্যা—দুটোই রেকর্ড ছাপিয়ে গিয়েছে। বিধানসভায় দু-দফা মিলে ভোটদানের হার ৯২.৯৩ শতাংশ, বিগত ভোটের তুলনায় যা আট-দশ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে, সম্পূর্ণ উল্টো ছবি ভোটার সংখ্যায়। ২০২৪-এর লোকসভা ভোটের সময় রাজ্যে ভোটার ছিলেন সাত কোটি ৬০ লাখের কাছাকাছি। এসআইআর পর্বের পর এবার তা কমে হয় ছয় কোটি ৮২ লাখ। অর্থাৎ বিগত লোকসভা নির্বাচনের তুলনায় বিধানসভা নির্বাচনে মোট ভোটার ছিল ১০.৯৪ শতাংশ কম। সেখানে ভোটদানের হার সম্পূর্ণ উল্টো। প্রায় এক কোটির কাছাকাছি কম ভোটার থাকা সত্ত্বেও ২০২১-এর বিধানসভা এবং ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের তুলনায় এবার প্রায় ৩০ লাখ ভোট বেশি পড়েছে। এই বাড়তি ভোটের সিংহভাগ যে দিকে গিয়েছে তাদের ভূমিধস বিজয় অসম্ভব নয়।
আশ্চর্যের হল, যোগ-বিয়োগ করে দেখা যাচ্ছে, শেষ পর্যন্ত নিজেদের বৈধ ভোটার দাবি করা যে মানুষ এবার ভোট দিতে পারলেন না সেই সংখ্যাও আনুমানিক ৩০ লাখ। এই ভোটারের ভাষা, ধর্ম, জাত ও দলীয় পরিচয়কে উহ্য রেখেও বলা যায়, এত মানুষের ভোটাধিকারের বিষয়টি নিষ্পত্তি না করে হওয়া নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া কঠিন হতে পারে।
আমি ইতিপূর্বে দ্য ওয়াল-এর ভিডিও এবং অন্যত্র আলোচনায় বলেছি, সব প্রতিষ্ঠানের একটি-দুটি বিশেষ উদ্দেশ্য বা লক্ষ্যকে সামনে রেখে দায়িত্ব পালন করে। নির্বাচন কমিশনের লক্ষ্য হওয়ার কথা, ন্যায্য ভোটারের ভোটদান নিশ্চিত করা। এবার দেখা গেল, তালিকাভূক্ত ভোটারকেও নথির লম্বা তালিকা ধরিয়ে দিয়ে তাদের বৈধতা প্রমাণ করতে বলা হল। কমিশনের এত বড় একটি সিদ্ধান্তের জন্য দেশবাসী প্রস্তুত ছিল না। বিশেষ করে ভোট দোরগোড়ায় থাকা রাজ্যগুলির মানুষের বিপন্নতা উপেক্ষা করার নয়। সোমবার ফল ঘোষণার পর বিজয়ী পক্ষের উল্লাসে সেই মানুষগুলির ক্ষোভ, অসন্তোষ শতগুণ বে়ড়ে গেলেও তা চাপা পড়ে থাকবে। কারণ দিন দিন সহ-নাগরিকদের প্রতি বৈরিতা এবং বিরূপ মনোভাব সমাজকে গ্রাস করছে। রাষ্ট্রের কোনও মানদণ্ডে কেউ বৈধতা হারালে প্রতিবেশী, বৃহত্তর সমাজ তাঁকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে নিয়ে দেশ বিরোধী, বিদেশি তকমা সেঁটে দিচ্ছে।
আমার ধারণা, ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে ভোটাধিকার সংক্রান্ত উদীয়মান বিবাদ, বিতর্ক পশ্চিমবঙ্গের গণ্ডি ছাপিয়ে গোটা দেশের ইস্যু হয়ে উঠবে। বিষয়টি শেষ পর্যন্ত শীর্ষ আদালতের সাংবিধানিক বেঞ্চ পর্যন্ত যাওয়া অসম্ভব নয়। ভোটাধিকার মৌলিক, নাকি সাংবিধানিক অধিকার, সেই বিবাদ ছাপিয়ে আইনি লড়াই চলতে পারে। সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদে নির্বাচন কমিশনকে প্রদত্ত ক্ষমতা সীমাহীন বলে যে ধারণার নির্মাণ করা হচ্ছে তা নিয়েও আইনি পর্যালোচনা জরুরি। প্রশ্ন উঠেছে, সংবিধানে যে সমানাধিকারের কথা উল্লেখ আছে তা কি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলির ক্ষেত্রে প্রদত্ত নয়?
এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উচ্চ ও শীর্ষ আদালতের ভূমিকা নিয়েও আইনি এবং সাংবিধানিক পর্যালোচনা জরুরি হয়ে পড়েছে। ভারতের হাই কোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা সদলবলে তাদের সম্পত্তি সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশে আপত্তি তুলেছিলেন। নিজেদের তথ্য জানার অধিকার আইনের পরিধির বাইরে রাখার সুরক্ষা কবচ দাবি করেছিলেন। বিচারপতি নিয়োগের পূর্ণ ক্ষমতা নিজেদের রাখতে সংসদে তৈরি আইনকে অসাংবিধানিক বলে বাতিল করে দিয়েছেন। অথচ, নির্বাচন কমিশন সংক্রান্ত অধিকাংশ মামলায় হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট সাংবিধানিক সুরক্ষার কথা বলে ইসিআইয়ের সিদ্ধান্তে সিলমোহর দিয়ে আসছে। যদিও কোনও ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানই বিচারালয়ের আইনি মূল্যায়নের বাইরে থাকতে পারে না।
বিধানসভা নির্বাচনে ভোটাদানের রেকর্ডের সম্ভাব্য কারণ হিসাবে অনেকেই মনে করছেন, রাজনীতি এবং ভোট থেকে শতহাত দূরে থাকা মানুষও এবার বুথে গিয়েছিলেন নাগরিকত্ব বাঁচাতে। বহু মানুষের মনে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে, ভোট না দিলে আগামী দিনে নাগরিকত্ব নিয়ে সমস্যায় পড়তে হতে পারে। সেই কারণে কেউ কেউ আবার মনে করছেন, এর একমাত্র সমাধান হল ভোটদানকে বাধ্যতামূলক করে দেওয়া। অর্থাৎ ভোট না দিলে সাজার মুখে পড়তে হবে, এই মর্মে আইন করা হোক। যাতে শতভাগ ভোটদান নিশ্চিত করা যায়।
ভারতের সংবিধানে ভোটদান এবং ভোট না দেওয়া, দুটি অধিকারের কথাই বলা আছে। অর্থাৎ কেউ স্বেচ্ছায় ভোট বয়কট করলে রাষ্ট্রযন্ত্রের হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। অবশ্যই মাওবাদী বা অতীতে নকশালদের মতো ভোট বয়কটের নামে কাউকে ভোটাধিকার প্রয়োগে বাধা দেওয়ার সুযোগ সংবিধান ও আইনে নেই। কিন্তু পিইউসিএল মামলায় সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে দেয় ভোট না দেওয়াও একটি অধিকার।
সেই রায়ের বিপরীতে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে নরেন্দ্র মোদী রজ্যের পঞ্চায়েত ও পুরসভায় ভোটদান বাধতামূলক করে আইন সংশোধন করেন। তাতে বলা আছে, কেউ ভোট না দিলে নির্বাচনী আধিকারিক কারণ দর্শানোর নোটিস ধরাতে পারেন। সেই আইনের বিধান এখনও অক্ষরে অক্ষরে মানা হচ্ছে না, সেটা ভিন্ন কথা। তাই বলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনের ক্ষেত্রে আগামী দিনে একই পথে এগবেন না, কে বলতে পারে?

