দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারতের বর্ষা নিয়ে নতুন করে দুশ্চিন্তা বাড়ছে আবহাওয়াবিদদের মধ্যে। কারণ, প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনোর (El Nino) প্রভাব জোরালো হওয়ার আশঙ্কার মধ্যেই এবার সঙ্গ নাও দিতে পারে ভারত মহাসাগর। ১৯৯৭ সালে শক্তিশালী এল নিনোর ধাক্কা সামলে স্বাভাবিকের চেয়েও বেশি বৃষ্টি পেয়েছিল দেশ (Indian monsoon), আর তার নেপথ্যে ছিল ভারত মহাসাগরের বিশেষ ভূমিকা।
কিন্তু ২০২৬ সালে (monsoon forecast 2026) সেই পরিস্থিতি নেই বলেই ইঙ্গিত দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। ফলে বর্ষা, কৃষি উৎপাদন থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম- সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কেন খলনায়ক 'এল নিনো'?
সাধারণত প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব থেকে পশ্চিমে বয়ে চলা হাওয়া গরম জলকে ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু কয়েক বছর পরপর এই হাওয়া দুর্বল হয়ে পড়লে গরম জল উল্টো অভিমুখে, অর্থাৎ দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলের দিকে চলে যায়। প্রশান্ত মহাসাগরের এই অস্বাভাবিক উষ্ণ হয়ে ওঠার চেনা নামই হল 'এল নিনো'।
গ্রীষ্মকালে ভারতের ভূখণ্ড প্রচণ্ড উত্তপ্ত হলে ভারত মহাসাগর থেকে জলীয় বাষ্পপূর্ণ বাতাস দেশের দিকে ছুটে আসে, যা বর্ষা ডেকে আনে। কিন্তু এল নিনো এই বাতাসের গতিপথকে ভারত থেকে দূরে, প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে ঘুরিয়ে দেয়। ফলে মেঘ ও বৃষ্টির চাকা থমকে যায়। তথ্য বলছে, ১৯৫১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে হওয়া প্রায় ৬০ শতাংশ এল নিনোর বছরগুলিতেই ভারতে গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেশ কমে গিয়েছিল।
ভারতের নিজস্ব 'রক্ষাকবচ'
এল নিনো এলেই যে খরা হবে, তা নয়। অনেক সময় ভারতের ত্রাতা হয়ে ওঠে ভারত মহাসাগর নিজেই। একে বলা হয় 'ইন্ডিয়ান ওশেন ডাইপোল' বা আইওডি (IOD)।
পজিটিভ আইওডি (Positive IOD): যখন পূর্ব আফ্রিকার উপকূলবর্তী পশ্চিম ভারত মহাসাগর উত্তপ্ত হয় এবং ইন্দোনেশিয়ার দিকের পূর্ব অংশ শীতল থাকে। এই পরিস্থিতি এল নিনোর নেতিবাচক প্রভাবকে রুখে দিয়ে ভারতে বাড়তি বৃষ্টির জোগান দেয়।
নেগেটিভ আইওডি (Negative IOD): এর উল্টো পরিস্থিতি বর্ষাকে আরও দুর্বল করে। ২০০২ এবং ২০১৫ সালের মতো এল নিনো ও নেগেটিভ আইওডির যুগলবন্দি ভারতের জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ খরা ডেকে এনেছিল।
১৯৯৭ বনাম ২০১৫: দুই ভিন্ন ছবি
ইতিহাসের পাতায় ১৯৯৭ এবং ২০১৫- উভয় বছরই শক্তিশালী এল নিনো এবং পজিটিভ আইওডি-র সাক্ষী ছিল। কিন্তু ফারাক ছিল শক্তির। ১৯৯৭ সালে আইওডি এত তীব্র ছিল যে এল নিনোকে হারিয়ে ভারতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি দিয়েছিল। অন্যদিকে, ২০১৫ সালে আইওডি দুর্বল থাকায় এল নিনো জয়ী হয় এবং দীর্ঘমেয়াদী গড় বৃষ্টিপাতের মাত্র ৮৬ শতাংশ বৃষ্টি হয়, যা দেশজুড়ে চাষবাস ও জলাশয়গুলোকে শুকিয়ে দিয়েছিল।
২০২৬ সালের অশনি সঙ্কেত
চলতি ২০২৬ সালে ভারত মহাসাগরের এই রক্ষাকবচ পুরোপুরি স্তব্ধ। গত ২৪ মে-র হিসেব অনুযায়ী, আইওডি সূচক দাঁড়িয়েছে মাইনাস ০.৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। আবহাওয়া মডেলগুলো জানাচ্ছে, আগামী শীতের আগে এই সূচক নিরপেক্ষই থাকবে। অর্থাৎ, জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মূল বর্ষার মরসুমে ভারতের পাশে দাঁড়ানোর মতো ক্ষমতা এবার ভারত মহাসাগরের নেই। ফলে এল নিনোর চোখরাঙানিতে আগামী দিনগুলো বেশ উদ্বেগের হতে চলেছে।

