দ্য ওয়াল ব্যুরো: বুধবার, রাত তখন ২টো। মধ্যগ্রামের (Madhyamgram) ভিভা সিটি হাসপাতালের ওয়েটিং লাউঞ্জে তখন বিজেপির অন্তত চল্লিশ জন বিধায়ক। কেউ থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে, কেউ উত্তেজিত। সেই সঙ্গে কম করে আরও একশ জনের বেশি নেতা-কর্মী। হাসপাতালের গেটের বাইরে থইথই করছে কর্মীদের ভিড়। পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনী ঘিরে রেখে গোটা এলাকা।
লাউঞ্জের চেয়ারে পা ছড়িয়ে বসেছিলেন শিলিগুড়ির বিজেপি বিধায়ক শঙ্কর ঘোষ (Shankar Ghosh)। দেখেই মনে হচ্ছে, শরীর ছেড়ে দিয়েছে। এখনও বিশ্বাসই করতে পারছেন না, এমনও হতে পারে!
শুক্রবার বিজেপির বিধায়ক দলের বৈঠকের জন্য কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহর কলকাতায় আসার কথা। শনিবার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বুধবার রাত ১০ টা নাগাদ বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর বিধানসভার এক্সিকিউটিভ অ্যাসিসট্যান্ট চন্দ্রনাথকে ফোন করে দু'দিনের সেই সব প্রোগ্রামের শিডিউল নিয়েই কথা বলছিলেন শঙ্কর ঘোষ।
শুভেন্দু প্রায় সারাক্ষণই কোনও না কোনও ফোনে থাকেন, বা ব্যস্ত থাকেন। তাই অনেক সময়ে তাঁকে আর ফোন না করে বিজেপি নেতারা চন্দ্রনাথের সঙ্গে কথা বলে নিতেন। চন্দ্রনাথও খুব এলেমের সঙ্গেই সবার সঙ্গে এই যোগাযোগ বা সমন্বয়ের কাজটি করতেন।
বুধবার রাত ১০টার পর তেমনই চন্দ্রনাথের সঙ্গে ফোনে কথা হচ্ছিল শঙ্কর ঘোষের। ফোনটা শঙ্কর ঘোষই করেছিলেন। শিলিগুড়ির বিজেপি বিধায়কের কথায়, 'হঠাৎ চন্দ্রর কথা জড়িয়ে গেল.. আর যেন এক সঙ্গে দু-তিনটে গলা শুনতে পাচ্ছিলাম। আমি বললাম, চন্দ্র তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে? চন্দ্র...ও চন্দ্র! আর সাড়া নেই'।
ফোনটা কেটে দিয়ে ফের চন্দ্রনাথকে রিং করেন শঙ্কর ঘোষ। অনেকক্ষণ রিং হয়। 'তার পর একজন ফোন ধরে বলেন, স্যারকে গুলি করে দিয়েছে। আমি বললাম, বলছ কী? কে? চন্দ্রর জ্ঞান আছে তো? বলল, বুঝতে পারছি না স্যার'।
শঙ্কর জানান, এর পরই তিনি শুভেন্দুকে ফোন করেন। শুভেন্দু ফোন না ধরায় কাঁপা কাঁপা হাতে টেক্সট মেসেজ করেন শঙ্কর। ততক্ষণে কলকাতা ছেড়ে কোলাঘাট পর্যন্ত পৌঁছে গেছেন শুভেন্দু অধিকারী। কাঁথিতে বাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন। মেসেজটা দেখেই শঙ্করকে ফোন করে বলেন, 'কী বলছেন কী শঙ্কর? কী বলছেন এটা?'
শঙ্করকে মধ্যগ্রামের দিকে রওনা হয়ে যেতে বলেন শুভেন্দু। জানান, তিনিও যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পৌঁছচ্ছেন।
বুধবার রাতে চন্দ্রনাথ রথকে এভাবে গুলি করে খুনের ঘটনা যেন বিজেপি নেতারা কেউই প্রথম বার শুনে বিশ্বাসই করতে পারেননি। ভবানীপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে শুভেন্দুর লড়াইয়ে যাবতীয় কোঅর্ডিনেশনের কাজটি করেছিলেন চন্দ্রনাথ। পূর্ব মেদিনীপুরে চণ্ডীপুরে তাঁর বাড়ি। ইদানীং মধ্যগ্রামের একটা ফ্ল্যাটে থাকতেন।
বুধবার বিধানসভার গাড়িতেই বাড়ি ফিরছিলেন চন্দ্রনাথ। সরকারি গাড়ি। হঠাৎ তাঁর গাড়ির পথ আটকায় দুষ্কৃতীরা। তার পর মোটরসাইকেল নিয়ে এসে আততায়ীরা গুলি করে ঝাঁধরা করে দেয় চন্দ্রনাথের বুক। পাঁচটা গুলি লাগে তাঁর বুকে। সম্ভবত তিনটে গুলি লাগে গাড়ির চালকেরও। এই গুলি লাগা অবস্থাতেই গাড়ি চালিয়ে ভিভা সিটি হাসপাতালে পৌঁছন চালক। আততায়ীরা যখন গুলি চালায় পিছনের সিটে বসে থাকা চন্দ্রনাথের সহযোগী মাথা নিচু করে বসে পড়েন, তাই বেঁচে যান।
শঙ্কর যখন এদিকে লাউঞ্জে বসে, তখনও ইমার্জেন্সিতে চন্দ্রনাথের নিথর দেহ থেকে গুলি বের করা চলছে। দুটো গুলি ততক্ষণে বের করা গেছে। কেউ বলে উঠলেন, নাইন এম এম!
কাছেই শুভেন্দু অধিকারীকে তখন ঘিরে রেখেছেন বিজেপি বিধায়করা। রাজেশ কুমার, রুদ্রনীল ঘোষ, তরুণজ্যোতি তিওয়ারি, সজল ঘোষ, স্বপন দাশগুপ্ত প্রমুখ। ছিলেন কেন্দ্রীয় প্রতি মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারও। রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধিনাথ গুপ্তাও ছিলেন।
ডিজি-কে দেখেই শুভেন্দু বলেন, 'এদের একটাও যেন পার না পায়। যত দ্রুত ধরতে হবে'। শুভেন্দুর মুখ চোখও বসে গেছে। দৃশ্যত বিধ্বস্ত। ডিজি তাঁকে বলেন, 'স্যার! দেখে বোঝা যাচ্ছে, ওরা রেইকি করে খুন করেছে। উনি যে এই রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফেরেন ওরা জানত। গাড়ির নাম্বারও জানত। খুব প্ল্যান করেই খুন করেছে।'
কিন্তু এই খুনের নেপথ্যে কে? শুভেন্দুকে ভয় পাইয়ে দিতেই কি এই খুন! বুধবার রাতে যে কথাগুলো মধ্যগ্রামের হাসপাতালে উঠে আসছিল, তার সবটাই রাগের কথা, ক্ষোভের কথা, চোয়াল শক্ত করা কথা। তবে সবাইকে যথাসম্ভব সংযত থাকতে বলেন শুভেন্দু। বলেন, 'পুলিশই তদন্ত করবে। কাউকে ছাড়া হবে না। কাউকে না'।

