শুভঙ্কর চক্রবর্তী
আইপ্যাকের পর এবার ইমপাতেও 'ফাইল রহস্য' ঘিরে তুমুল চর্চা। কোথায় গেল গুরুত্বপূর্ণ ফাইল? তাতে এমন কী তথ্য ছিল, যা নিয়ে শুরু হয়েছে এত বিতর্ক? বৃহস্পতিবার ইমপার সাধারণ সভাকে কেন্দ্র করে দিনভর উত্তেজনার মাঝেই শোনা গেল পিয়া সেনগুপ্তকে ঘিরে'ফাইল চোর' স্লোগানও। দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত ইমপা অফিসে ঠিক কী কী ঘটেছে, রইল ঘটনাক্রমে।
বাংলা চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন ইমপা (Eastern India Motion Pictures Association)-র অন্দরমহল গত কয়েক দিন ধরেই উত্তপ্ত। তবে বৃহস্পতিবার যা ঘটল, তা কার্যত নজিরবিহীন বলেই মনে করছেন ইন্ডাস্ট্রির একাংশ। সাধারণ সভা শুরুর আগেই উত্তেজনা, বচসা, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ, বচসা, ধস্তাধস্তি, অসুস্থ হয়ে পড়া সদস্য— সব মিলিয়ে কার্যত রণক্ষেত্রের চেহারা নেয় ইমপা অফিস।
বৈঠকের আগেই অশান্তির সূত্রপাত
২২ মে সমস্ত সদস্যদের নিয়ে সাধারণ বৈঠকের ডাক দিয়েছিলেন ইমপা সভাপতি পিয়া সেনগুপ্ত। দুপুর থেকেই সংগঠনের অফিসে জড়ো হতে শুরু করেন প্রযোজক, পরিবেশক এবং ইন্ডাস্ট্রির বিভিন্ন সদস্যরা। উপস্থিত ছিলেন গোপাল মদনানি, এনা সাহা, অনুপ সেনগুপ্ত, সমীরণ দাস-সহ অনেকে। অন্যদিকে বিরোধীপক্ষের হয়ে উপস্থিত ছিলেন শতদীপ সাহা, রতন সাহা, মিলন ভৌমিক এবং কৃষ্ণ দাগা।
কিন্তু বৈঠক শুরু হওয়ার আগেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পিয়া সেনগুপ্তর অভিযোগ, যাঁরা বৈধ সদস্য নন, তাঁরাও সভায় ঢুকে পড়েন। শুধু তাই নয়, তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয় বলেও দাবি করেন তিনি। পিয়ার কথায়, 'আমার সঙ্গে অভব্য আচরণ করা হয়েছে। এমনকি তেড়ে আসাও হয়েছে। আমি প্রশাসনের কাছে যাব। অনেক সহ্য করেছি, আর নয়।'
রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকেই চাপ বাড়ছিল
রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকেই ইমপা-র অন্দরেও শুরু হয় টানাপড়েন। একাংশ প্রযোজক ও পরিবেশকের অভিযোগ ছিল, সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রভাববলয়ে চলে গিয়েছে। সেই সময় থেকেই পিয়া সেনগুপ্তর পদত্যাগের দাবি তুলতে শুরু করেন বিরোধী শিবিরের সদস্যরা। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন শতদীপ সাহা।
নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর ইমপা অফিসে 'গঙ্গাজল ছিটিয়ে শুদ্ধিকরণ'-এর ঘটনাও শিরোনামে উঠে এসেছিল। সেই ঘটনার পর থেকেই বিরোধ আরও প্রকট হয়। পিয়ার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও তোলা হয়েছিল। পাশাপাশি, প্রাক্তন ফেডারেশন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাস-এর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। যদিও পিয়া বরাবরই সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
'আমি কী সুবিধা নিয়েছি, জানানো হোক'
বৃহস্পতিবারের উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন পিয়া সেনগুপ্ত। প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলেন, 'আমি কী সুবিধে নিয়েছি, আমায় জানানো হোক।' তাঁর দাবি, পরিকল্পিতভাবে তাঁকে অপমান এবং চাপে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে বিরোধীপক্ষের দাবি, তাঁরা শুধু স্বচ্ছতা এবং নতুন নির্বাচনের দাবিই তুলেছেন। শতদীপ সাহার বক্তব্য, সাধারণ সভার আলোচনার নথি বা মিনিটস অফ মিটিং (MOM) লিখে রাখার অনুরোধ করা হলেও ইমপা সম্পাদক আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় তা করতে অস্বীকার করেন। ফলে মিটিং ছেড়ে সকলে বেরিয়ে এলেও, তাঁকে আটকে রাখা হয়। শতদীপের দাবি, এটা সম্পাদকের কাজ। তিনি তা করতে অস্বীকার করেন।
'ফাইল রহস্য' ঘিরে নতুন বিস্ফোরণ
দিনের শেষে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে একটি 'ফাইল'কে কেন্দ্র করে। সন্ধ্যার পর থেকেই সংগঠনের অন্দরে শুরু হয় ফাইল গায়েব হয়ে যাওয়ার অভিযোগ। কে সেই ফাইল সরাল? তাতে কী তথ্য ছিল? এই প্রশ্ন ঘিরেই শুরু হয় নতুন জল্পনা।
ইমপা অফিসের ভিতরে 'ফাইল চোর' স্লোগান উঠতেও শোনা যায়। পিয়া সেনগুপ্ত দাবি করেন, গুরুত্বপূর্ণ ওই ফাইল বিরোধীপক্ষের সদস্যরা আটকে রেখেছিলেন। যদিও বিরোধীপক্ষ এই অভিযোগ মানতে নারাজ। তবে পিয়ার স্পষ্ট দাবি, 'আপনারা তো ছিলেন, আমার হাতে কোনও ফাইল দেখেছেন কি?'
ঘটনার জেরে একসময় কার্যত অচল হয়ে পড়ে গোটা বৈঠক। উত্তেজনা এমন জায়গায় পৌঁছয় যে পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। পরে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় এবং পিয়া সেনগুপ্ত— দু'জনকেই সেখান থেকে বের করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। আশিসবাবু শ্বাসকষ্টে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। প্রকাশ্যে তিনি জানান, তাঁর শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। অন্যদিকে পিয়াও শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফলে সেখান থেকে তাঁদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
নতুন নির্বাচন? অস্থায়ী সভাপতির নাম ঘোষণা
বিরোধীপক্ষের দাবি, খুব শিগগিরই নতুন নির্বাচন করা হবে। ততদিনের জন্য অস্থায়ী সভাপতি হিসেবে রতন সাহার নাম ঘোষণা করা হয়েছে। যদিও এই সিদ্ধান্ত কতটা সাংগঠনিকভাবে বৈধ, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
ফলে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— ইমপা-র ভবিষ্যৎ কোন পথে? দীর্ঘদিনের এই সংঘাত কি প্রশাসনিক বা সরকারি হস্তক্ষেপ ছাড়া মেটানো সম্ভব? সে উত্তর সময় দেবে।

