দ্য ওয়াল ব্যুরো: লিভারপুল ছাড়ার পর ফুটবল কোচিংয়ে তাঁর প্রত্যাবর্তন নিয়ে দীর্ঘ গুঞ্জন ছিল ফুটবল মহলে। অবশেষে সেই সব জল্পনার অবসান ঘটল। ২০৩০ সালের বিশ্বকাপ পর্যন্ত জার্মানির নতুন হেড কোচ হিসেবে নিযুক্ত হলেন ৫৯ বছর বয়সি য়ুর্গেন ক্লপ!
সদ্যসমাপ্ত বিশ্বকাপে চূড়ান্ত হতাশাজনক পারফরম্যান্স।
প্যারাগুয়ের কাছে পেনাল্টি শ্যুটআউটে হেরে জার্মানি শেষ ৩২-এর পর্যায় থেকে বিদায় নেয়। এই অভাবনীয় বিপর্যয়ের পর পরই পদত্যাগ করেন প্রাক্তন কোচ হুলিয়ান নাগেলসমান। তাঁর শূন্য জায়গাতেই এবার জার্মান ফুটবল টিমের দায়িত্ব নিচ্ছেন অভিজ্ঞ এই জার্মান কোচ।
২০২৪ সালে শুধুমাত্র 'শক্তি ফুরিয়ে যাওয়া' এবং ক্লান্তির কারণ দেখিয়ে লিভারপুলের দায়িত্বত্যাগ। ৯ বছরের বর্ণময় অধ্যায়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, প্রিমিয়ার লিগ-সহ মোট ৬টি ট্রফি জিতে নেন ক্লপ। এরপর ছ'মাসের বিরতি নিয়ে তিনি রেড বুলের গ্লোবাল হেড অফ ফুটবল হিসেবে কাজ শুরু। তখন তিনি নিজেই জানিয়েছিলেন, ক্লাব ফুটবলে ম্যানেজার হিসেবে ফেরার কোনও ইচ্ছে আপাতত তাঁর নেই। তবে এবার সরাসরি নিজের দেশের জাতীয় দলের গুরুভার কাঁধে তুলে নিলেন তিনি। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর উয়েফা নেশনস লিগে নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে ম্যাচ দিয়ে তাঁর কোচ হিসেবে পথচলা শুরু হবে। কোচিং স্টাফে থাকছেন পেপ লিন্ডার্স (যিনি সম্প্রতি পেপ গুয়ার্দিওলার বিদায়ের পর ম্যাঞ্চেস্টার সিটি ছেড়েছেন), পিটার ক্রাভিৎস এবং বোরুশিয়া ডর্টমুন্ডে তাঁর অধীনে খেলা সভেন বেন্ডার। এ ছাড়া আগামী জানুয়ারিতে আন্দ্রেয়াস রেটিগের জায়গায় স্পোর্টিং ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব নেবেন পের মার্তেসেকার, যিনি গত মরশুমের শেষে দীর্ঘ ৮ বছর পর আর্সেনালের অ্যাকাডেমি ম্যানেজারের পদ ছেড়েছেন।
সমালোচকদের উদ্দেশে বার্তা
শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় দলের দায়িত্ব নেওয়ার দিনেই সংবাদমাধ্যম ও সমালোচকদের বড় বার্তা দিয়েছেন ক্লপ। সাফ বক্তব্য, তাঁর বা তাঁর পরিবারের সঙ্গে বিন্দুমাত্র খারাপ আচরণ করা হলে তিনি পদত্যাগ করতে এক মুহূর্তও পিছপা হবেন না। ক্লপ বলেন, 'জাতীয় দলকে আরও উন্নত ও শক্তিশালী একটি দলে পরিণত করাই আমার প্রধান লক্ষ্য। আশা করি, আমার দল গঠনের জন্য প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের পুল আরও বড় হবে। আমি যা করছি, আপনাদের বিরুদ্ধে গিয়ে করছি না, বরং আপনাদের জন্যই করছি। এই দায়িত্ব পাওয়াটা আমার কাছে এক বিশাল সম্মানের বিষয়।'
পারিশ্রমিক ও সমালোচনা নিয়ে মন্তব্য, 'আমি এই কাজের জন্য দারুণ পারিশ্রমিক পাব। কিন্তু আগামীকাল যদি য়ুর্গেন ক্লপের পারফরম্যান্স জঘন্য হয়, তবে আমি নিজেই সরে যাব। আর জার্মান ফুটবল সংস্থা যদি বলে কাজটা এখানেই শেষ করতে, তবে সেটাই চূড়ান্ত। আর আপনারা যদি খারাপ আচরণ করেন এবং আমার পরিবারকে শান্তিতে থাকতে না দেন, তবে আমি চলে যাব। মুখ ফিরিয়ে নেব। আমি জানি অন্য দেশে কোচদের আরও বাজেভাবে আক্রমণ করা হয়। তবে আমি এই কাজটা ভালোবাসলেও দরকারে ছেড়ে দিতে প্রস্তুত। জাতীয় দলের পর আর কোনও কেরিয়ার আমি চাই না। এটাই আমার কোচিং জীবনের চূড়ান্ত প্রাপ্তি। আমি আমার সবটুকু উজার করে দেব এবং আমার কাছে সেরা সহকারী কোচিং দল রয়েছে।'
প্রত্যাশা নিয়ে বাস্তববাদী ক্লপ
জার্মানির দায়িত্ব নিলেও বিশ্বকাপ জয় যে রাতারাতি সম্ভব নয়, সে কথাও খুব স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দিয়েছেন বাস্তববাদী ক্লপ। ফুটবলপ্রেমীদের আকাশছোঁয়া প্রত্যাশার পারদ কমানোর চেষ্টা করে তাঁর বক্তব্য, 'আমি দায়িত্বে আছি মানেই যে আমরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হব, এমনটা একেবারেই নয়। সাফল্যের অর্থ হলো পারফরম্যান্সের সঙ্গে প্রত্যাশার তুল্যমূল্য বিচার। আমাদের এখন নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি করতে হবে।'
দলের গুণগত মান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, 'অনেকেই প্রশ্ন করেন আমরা কি ফ্রান্সের মতো ভালো দল? উত্তর যদি না হয়, তবে সেটা সবসময় সত্যি নয়। আমাদের কি দেম্বেলে, বারকোলা বা এমবাপের মতো খেলোয়াড় আছে? উত্তর হলো না, আমাদের দলে এমন কেউ নেই। কিন্তু তবুও আমরা তাদের হারাতে পারি। আমরা আর্জেন্তিনা, স্পেন, ইংল্যান্ড বা ফ্রান্সের মতো খেলতে চাই না। আমরা জার্মানির নিজস্ব স্টাইলে, তীব্র গতির এবং ঝাঁঝালো ফুটবল খেলতে চাই। এই মুহূর্তে আমাদের আগে আরও ১১টি দল রয়েছে। আমরা কি এখন এক নম্বর দল? না, আমি সেটা মেনে নিচ্ছি। আমরা তাদের হারাতে পারি, কিন্তু তার জন্য খুব ভালো ফুটবল খেলতে হবে।'
ইতালির প্রস্তাব ফেরালেন গুয়ার্দিওলা
ক্লপ যখন জার্মানির দায়িত্ব নিলেন, তখন ফুটবল বিশ্বের আরেক হাই-প্রোফাইল কোচ পেপ গুয়ার্দিওলা ইতালির জাতীয় দলের আকর্ষণীয় প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন। ম্যানচেস্টার সিটিতে ১০ বছরের অত্যন্ত সফল অধ্যায় শেষ করে বর্তমানে তিনি ফুটবল থেকে দূরে ছুটিতে রয়েছেন। ইতালিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট জিওভান্নি মালেগো জানান, গুয়ার্দিওলার সঙ্গে তাঁদের বিস্তারিত কথা হয়েছিল এবং তাঁর আকাশছোঁয়া বেতনের জন্য 'বিশেষ ছাড়' দেওয়ারও প্রস্তুতি ছিল। তা ছাড়া তাঁকে তাঁর নিজের মতো করে কাজ করার স্বাধীনতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু স্প্যানিশ কোচ কিছু সময় নিয়ে ভেবে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি আপাতত তাঁর পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী বিশ্রাম নিতে, ঘুরতে এবং পরিবারের সঙ্গে আরও সময় কাটাতে চান। ইতালির টেকনিক্যাল ডিরেক্টর পাওলো মালদিনির বক্তব্য, তাঁরা প্রথমে দলের প্রাক্তন তারকা কার্লো অ্যান্সেলোত্তিকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ব্রাজিলের দায়িত্ব ছাড়তে নারাজ।
টানা তিনটি বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জন করতে না পারা ইতালি এখন খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে নতুন কোচের সন্ধানে মরিয়া। গুয়ার্দিওলা প্রস্তাব ফেরানোর পর, ইতালির পরবর্তী কোচের দৌড়ে এখন সবার চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন দলের প্রাক্তন তারকা প্লেমেকার ও বর্তমানে দুবাই-ভিত্তিক ইউনাইটেড এফসি-র হেড কোচ আন্দ্রে পির্লো।

